ছয় মাস ধরে তালাবদ্ধ বালিকা বিদ্যালয়, অনিশ্চয়তায় ২০০ শিক্ষার্থী
ময়মনসিংহের নান্দাইলে ১০ বছর ধরে শিক্ষা কার্যক্রম চালানোর পর হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেছে মাফরুহীন খান চৌধুরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়। ছয় মাস ধরে তালাবদ্ধ প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ২০০ শিক্ষার্থীর পড়াশোনা অনিশ্চয়তায় পড়েছে। বিদ্যালয়টি দ্রুত আবার চালুর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় লোকজন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১০ বছর ধরে সফলভাবে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল বিদ্যালয়টি। পূর্বঘোষণা ছাড়াই চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে এটি হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে বিদ্যালয়টির প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী এবং সেখানে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।
বিদ্যালয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সাবেক সংসদ সদস্য খুররম খান চৌধুরী নিজের মেয়ের নামে ৫০ শতক জমির ওপর প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছিলেন। এটি সরকারিভাবে পাঠদানের অনুমতিসহ স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ছিল। এমপিওভুক্ত হওয়াও ছিল কেবল সময়ের ব্যাপার। করোনায় আক্রান্ত হয়ে ২০২১ সালের ১৭ জুলাই মারা যান প্রতিষ্ঠাতা খুররম। এর পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটিতে চরম অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়।
এদিকে খুররম খানের মৃত্যুর পর তার মেয়ে মাফরুহীন চৌধুরী (যার নামে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত) প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নেন। অভিযোগ উঠেছে, এমপিওভুক্ত করার প্রলোভন দেখিয়ে এবং নতুন শিক্ষক নিয়োগের কথা বলে তিনি কর্মরত শিক্ষক ও চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে অন্তত ৫০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। একপর্যায়ে কর্মরত শিক্ষকদের বেতন-ভাতা না দেওয়ায় বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে যায়।
বিদ্যালয়ের পাশেই বসবাসরত দুই শিক্ষিকা শিউলি আক্তার ও বিলকিস আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তারা দুজন নিজেদের জমি বিক্রি করে শুরুতেই প্রায় ১২ লাখ টাকা দিয়েছিলেন।
এভাবে টাকা দেন আরও পাঁচজন। এরপরও গত ১০ বছরে তারা প্রতিষ্ঠানটি থেকে কোনো কানাকড়িও পাননি।
ওই দুই শিক্ষক বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিনা বেতনে চাকরি করার পর এমপিওভুক্তির স্বপ্ন দেখিয়ে টাকা নেওয়ার পরও কোনো কাজ না হওয়ায় শিক্ষক ও স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। তাদের দাবি, নতুন নিয়োগ দেওয়ার কথা বলে টাকা দেওয়া ভুক্তভোগীদের চাপের মুখে পড়ে বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক সাদিয়া আক্তার সম্প্রতি এলাকা থেকে আত্মগোপন করেছেন।
বিদ্যালয়ের পাশের বাসিন্দা সোহেল মিয়া নামের একজন অভিভাবক বলেন, ‘স্কুলটি ভালোই চলছিল। শিক্ষার্থীও ছিল অনেক। কিন্তু হঠাৎ করে এভাবে কেন বন্ধ হলো তা এখনো বোধগম্য নয়। তবে আমরা মনে করি সঠিক তদন্ত করে প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় চালু করার ব্যবস্থা করা হোক।’
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) বিদ্যালয়টিতে গিয়ে দেখা যায়, মূল ফটকে তালা লাগানো। অন্য পথ দিয়ে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করলে দেখা যায় সব কক্ষেই তালা ঝুলানো। শ্রেণিকক্ষের সামনে জন্মেছে লম্বা ঘাস। এ সময় কাছে আসেন শহীদ নামের স্থানীয় এক বাসিন্দা।
নিজেকে বিদ্যালয়টির দপ্তরি পরিচয় দিয়ে শহীদ বলেন, ‘এইহানো জীবনডাই শেষ করলাম। কুলুর বলদের মতো কাম কইর্যা গেলাম। কিন্তু আইজ কিছুই পাইলাম না। এমন একটা ইস্কুলও বন্ধ অইয়া যায়?’
বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক সাদিয়া আক্তার জানান, বিদেশে অবস্থানরত বিদ্যালয়ের পরিচালক মাফরুহীন চৌধুরী শিক্ষক ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘এমপিওভুক্ত হবে ও নতুন নিয়োগ দেওয়া হবে- এমন কথা বলে আমার কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নিয়েছেন মাফরুহীন। এ কারণে পাওনাদাররা আমার খোঁজ করেন। এ অবস্থায় আমি গাঢাকা দিয়েছি। আমার নামে দুটি মামলা হয়েছে। আমি এ ঘটনার বিচার চাই।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নান্দাইল উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মফিজুল ইসলাম বলেন, ‘এভাবে বিদ্যালয় বন্ধ হওয়া ঠিক না। ১০ বছর ধরে চলমান বিদ্যালয়টি কেন বন্ধ হলো খোঁজ নেওয়া হবে। সেই সঙ্গে অচিরেই বিদ্যালয়টি চালু করার চেষ্টা করা হবে।’