মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর: তদন্তে ৩০টির বেশি সুপারিশ, বাস্তবায়িত হয়নি কোনোটিই
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বিধ্বস্তের এক বছর পেরিয়ে গেছে। ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিশন ফ্লাইট নিরাপত্তা, নগর পরিকল্পনা, ভবন নির্মাণ ও প্রশাসনিক তদারকিতে বড় ধরনের সংস্কারের সুপারিশ করেছিল। ঢাকার জনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে সামরিক বিমান প্রশিক্ষণ সরিয়ে নেওয়া, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নতুন স্থাপনা বন্ধ করা এবং বিমানবন্দর এলাকার কাছ থেকে স্কুল-হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠান সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাবও ছিল।
তবে এক বছর পরও এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। বরং তদন্ত কমিশনের সুপারিশের পরও দিয়াবাড়ি ক্যাম্পাসে নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে নথিতে দেখা গেছে।
২০২৫ সালের ২১ জুলাই বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এফটি-৭ বিজিআই প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমানটি মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের হায়দার আলী ভবনে বিধ্বস্ত হয়। এতে পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলাম, ২৮ শিক্ষার্থী, ৩ শিক্ষক, ৩ অভিভাবক ও ১ পরিচারিকাসহ মোট ৩৬ জন নিহত হন। আহত হন ১৭০ জনের বেশি মানুষ।
ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনার পর সাবেক সচিব এ কে এম জাফর উল্লাহ খানের নেতৃত্বে নয় সদস্যের তদন্ত কমিশন গঠন করে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। তিন মাসের বেশি সময় তদন্তের পর গত বছরের নভেম্বরে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। তবে প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
১৮৫ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনার তাৎক্ষণিক কারণ ছিল পাইলটের ভুল। তবে প্রাণহানি এত বেশি হওয়ার পেছনে বেবিচক, রাজউক ও স্কুল কর্তৃপক্ষের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতাও দায়ী বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাইলটের প্রশিক্ষণ ও তদারতিতে ঘাটতি
তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনাগ্রস্ত বিমানের পাইলটের উড্ডয়ন প্রশিক্ষণে ঘাটতি ছিল। তা গ্রাউন্ড সুপারভাইজার বা অফিসার কমান্ডিংয়ের যথাযথ ও পর্যাপ্ত তত্ত্বাবধানও ছিল না।
বিমানবাহিনীর তদন্তে অবশ্য বিমানের কোনো কারিগরি ত্রুটি পাওয়া যায়নি। ফ্লাইট ডাটা রেকর্ডারের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, উড্ডয়নের সময় ইঞ্জিন, হাইড্রলিক সিস্টেম ও কন্ট্রোল সিস্টেমে কোনো সতর্ক সংকেত পাওয়া যায়নি।
তবে বেস থেকে ফাইনালের দিকে বাঁক নেওয়ার সময় মাত্র চার সেকেন্ডের মধ্যে বিমানের ব্যাংক অ্যাঙ্গেল ৫৯ ডিগ্রি থেকে বেড়ে ৬৫ দশমিক ৩ ডিগ্রিতে পৌঁছে যায়। এরপর পাইলট কন্ট্রোল স্টিকে জোরালো টান দিলে বিমানের অ্যাঙ্গেল অব অ্যাটাক এক সেকেন্ডের মধ্যে ২৩ দশমিক ২০ ডিগ্রি থেকে বেড়ে ২৭ দশমিক ৩০ ডিগ্রিতে পৌঁছে যায়।
বিমানের ক্রিটিক্যাল অ্যাঙ্গেল অব অ্যাটাক ছিল ২৪ ডিগ্রি। সেটি অতিক্রম করায় বিমানটি স্টলড কন্ডিশনে চলে যায়। পাইলট পরে ব্যাংক অ্যাঙ্গেল কমিয়ে বিমানটি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করলেও সফল হননি। একপর্যায়ে বিমানটি উচ্চতা হারিয়ে মাইলস্টোনের ভবনে আছড়ে পড়ে।
একটি সিঁড়ি, শত শত শিক্ষার্থী
তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে মাইলস্টোনের ভবনটির নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। দুর্ঘটনার সময় তিনতলা ভবনটিতে শত শত শিক্ষার্থী ছিল। কিন্তু জরুরি বের হওয়ার জন্য ভবনটিতে ছিল মাত্র একটি সিঁড়ি। সেই সিঁড়ির সামনেই বিমানটি বিধ্বস্ত হয়।
ফায়ার সার্ভিসের নিয়ম অনুযায়ী, এ ধরনের ভবনে কমপক্ষে তিনটি জরুরি বহির্গমন পথ থাকা প্রয়োজন। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, অতিরিক্ত জরুরি বহির্গমন পথ থাকলে প্রাণহানি কমানো সম্ভব হতো।
দুর্ঘটনার পর গঠিত বিভিন্ন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনও পর্যালোচনা করেছে সরকারি তদন্ত কমিশন। এর মধ্যে বিমানবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও রাজউকের তদন্ত প্রতিবেদনও ছিল।
১৭ ভবনের মাত্র ৭টির অনুমোদন
তদন্তে মাইলস্টোন ক্যাম্পাসের ভবন নির্মাণ নিয়েও গুরুতর অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। ক্যাম্পাসের ১৭টি ভবনের মধ্যে মাত্র সাতটির বৈধ অনুমোদন ছিল। অন্য ভবনগুলো অনুমোদনহীন অথবা বিধিবহির্ভূতভাবে ব্যবহৃত হচ্ছিল।
স্কুল কর্তৃপক্ষ ইউনিয়ন পরিষদের অনুমোদনের কথা বললেও তার পক্ষে কোনো দালিলিক প্রমাণ দিতে পারেনি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজউক এসব অনিয়ম সম্পর্কে জানলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।
ক্যাম্পাসটি বিমানবন্দরের ‘অবস্ট্যাকল লিমিটেশন সারফেস’-এর মধ্যে অবস্থিত। এটি বিমান চলাচলের জন্য সংরক্ষিত আকাশসীমা। বেবিচকের নিয়ম অনুযায়ী, এ এলাকায় ভবনের উচ্চতা ও ভূমি ব্যবহারের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে।
মাইলস্টোন ক্যাম্পাস বিমানবন্দরের ‘ইনার হরিজন্টাল সারফেস’ ও ‘ইনার অ্যাপ্রোচ’ এলাকার মধ্যে পড়ে। সেখানে ভবনের উচ্চতা ১৫০ ফুটের বেশি হওয়ার কথা নয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বেবিচক উচ্চতা সীমা লঙ্ঘনকারী ৬৩০টি ভবনের বিষয়ে রাজউককে জানিয়েছিল। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তদন্তের পরও নতুন ভবনের উদ্যোগ
দুর্ঘটনার এক বছর না পেরোতেই দিয়াবাড়ি ক্যাম্পাসে নতুন সাততলা ভবন নির্মাণের অনুমতি চেয়ে রাজউকে আবেদন করা হয়েছে বলে নথিতে দেখা গেছে।
চলতি বছরের ৬ জুলাই মাইলস্টোন কলেজের অধ্যক্ষ জিয়াউল আলম রাজউকের উত্তরা কার্যালয়ে এ আবেদন করেন। তিনি দাবি করেছেন, প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিয়েই আবেদন করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রশ্ন পাঠানো হলেও তিন দিনেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।
মাইলস্টোনের প্রতিষ্ঠাতা ও উপদেষ্টা কর্নেল (অব.) নূরুন্নবী নতুন ভবনের আবেদনের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তবে রাজউক কর্মকর্তারা আবেদন পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
রাজউকের উত্তরা কার্যালয়ের অথরাইজড অফিসার এম এম এহসানুল ইমাম বলেন, বিমানবন্দরের কাছে যেকোনো ভবনের জন্য বেবিচকের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। মাইলস্টোনের সর্বশেষ আবেদনে বেবিচকের ছাড়পত্র নেই। নথি যাচাই করা হচ্ছে।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিলুর রহমান খান বলেন, এমন উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পুনরায় নির্মাণের অনুমতি দেওয়া তদন্ত কমিশনের সুপারিশের পরিপন্থী। দুর্ঘটনার পর কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে সক্রিয় হলেও পরে সব থেমে যায়।
৩০টির বেশি সুপারিশ, বাস্তবায়ন নেই
তদন্ত কমিশন ৩০টির বেশি সংস্কারের সুপারিশ করেছিল। এর মধ্যে ছিল কঠোর ভবন নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ, রাজউক ও বেবিচকের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নতুন স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ করা।
দীর্ঘমেয়াদে বিমানবন্দর এলাকার কাছ থেকে স্কুল ও হাসপাতালের মতো ঘনবসতিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান সরিয়ে নেওয়ার সুপারিশও করা হয়।
কারিগরি কমিটি ঢাকার ওপর এককভাবে ফাইটার জেট প্রশিক্ষণের চাপ কমানো এবং সামরিক বিমান ঘাঁটি জনবসতিহীন এলাকায় সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দেয়।
ঢাকার বাইরে জনবসতিহীন এলাকায় নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের সুপারিশও ছিল।
তদন্ত কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে কয়েকটি মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তৎকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ। তাঁর ভাষ্য, প্রতিবেদন পাওয়ার পর তৎকালীন উপদেষ্টা পরিষদে তা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।
তবে এক বছর পরও সুপারিশগুলোর বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
ক্ষতিপূরণ নিয়েও হতাশ পরিবার
দুর্ঘটনার পর সরকার নিহতদের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা এবং আহতদের ৫ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। অনেক পরিবার সেই অর্থ প্রত্যাখ্যান করে।
তদন্ত কমিশন নিহত শিশুদের পরিবারকে ১ কোটি টাকা এবং প্রাপ্তবয়স্ক নিহতদের পরিবারকে ৮০ লাখ টাকা করে দেওয়ার সুপারিশ করে। আহতদের জন্য উন্নত চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও দীর্ঘমেয়াদি সহায়তারও সুপারিশ ছিল।
তবে এক বছরেও এসব সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ নিহত ও আহতদের পরিবারের।
দুর্ঘটনায় নিহত সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জাবির ফারহানের বাবা হাবিবুর রহমান বলেন, শুনেছেন মাইলস্টোনে আরও ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আরেকটি দুর্ঘটনা ঘটার আগেই স্কুলটি ওই এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া উচিত।
তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়ায় প্রশ্ন
শিশুসহ এত প্রাণহানির পর গঠিত তদন্ত কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ করেনি সরকার। এতে নিহত ও আহতদের পরিবারগুলোর মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে।
দুর্ঘটনার দিন রাতে নিহতদের মরদেহ গুম করার অভিযোগও উঠেছিল। তবে তদন্ত কমিশন জানিয়েছে, নিহতদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে এমন অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি।
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর পরও তাই বড় প্রশ্নটি থেকেই গেছে—যে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, দুর্বল তদারকি, বিমানবন্দর নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন এবং প্রশিক্ষণ ঘাটতির কথা তদন্তে উঠে এসেছে, সেগুলো দূর করতে বাস্তবে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?
তদন্ত কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়িত না হলে ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্ঘটনা ঠেকানোর নিশ্চয়তা কোথায়—এখন সেই প্রশ্নই তুলছেন নিহত ও আহতদের পরিবার এবং নগর পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞরা।
এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন পাওয়ার পর সেটি নিয়ে তৎকালীন উপদেষ্টা পরিষদে আলোচনা করা হয়েছিল। কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে কয়েকটি মন্ত্রণালয়কে দায়িত্বও দেওয়া হয়েছিল।