পাঠ্যবইয়ের অনুশীলন অংশ পূরণ করান না শিক্ষকরা, বানান করেও পড়তে পারছে না অনেক শিক্ষার্থী
দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অনুশীলন অংশটুকু শ্রেণিকক্ষেই পূরণ করানোর জন্য শিক্ষকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে তা মানছেন না অধিকাংশ শিক্ষক। সম্প্রতি প্রাথমিকের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ৩৬টি পাঠ্যবইয়ের মান যাচাইয়ে মাঠ পর্যায়ে বিদ্যালয়ে বিদ্যালয়ে যান জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) কর্তকর্তারা। সেখানে এ বিষয়টি খুঁজে পাওয়া গেছে।
গত সপ্তাহে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মশালায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেছেন, ‘ভবিষ্যতে পাঠ্যবই এবং ওয়ার্কবুক আলাদা করা যেতে পারে। অনেক দেশে এই ব্যবস্থা রয়েছে এবং ইতিবাচক ফলও পাওয়া গেছে। বিষয়টি আমরা আরও গভীরভাবে পর্যালোচনা করব।’
একই অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে এনসিটিবির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, প্রাথমিকের বাচ্চারা রিডিং পড়তে না পারার একটি কারণ হলো—পাঠ্যবইয়ের অনুশীলন অংশটুকু শিক্ষার্থীদের পূরণ করান না। দেশের ২০ জেলার ৪৩টি স্কুলের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সবকটিতেই এই চিত্র দেখা গেছে। একজন শিক্ষার্থী প্রাথমিকে ৫ বছর ধরে নিয়মিত অনুশীলন করলে পরবর্তীতে গ্যাপটি থাকার কথা নয়। যেহেতু এখন তাদের ঘাটতি রয়েছে, তাহলে সেটি শিক্ষকদেরই ব্যর্থতা।
তবে শিক্ষাবিদরা মনে করেন, শুধু অনুশীলন না করানোর কারণেই শিক্ষার্থীরা রিডিং পড়তে পারছে না বিষয়টা এমনও নয়। অনেকগুলো কারণের মধ্যে এটিও একটি কারণ।
জানা গেছে, দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ‘রিডিং পড়তে না পারার’ বিষয়টি সম্প্রতি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিষ্ট্রার রুমিন ফারহানা। পরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ভুমিকা ও পাঠ্যবইয়ের মান নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। বিষয়টি যাচাইয়ে কাজ শুরু করে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। সংস্থাটির মাঠ পর্যায়ে যাচাইয়ে শিক্ষার্থীদের রিডিং পড়তে না পারার বিষয়টির কারণও খুঁজে পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, চলতি বছরের মে মাসেই শিক্ষার্থীদের রিডিং পড়ার মান বাড়াতেও শিক্ষকদের চিঠি দিয়েছেন স্ব স্ব জেলার প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা।
জানা গেছে, প্রাথমিকের মোট ৩৬টি পাঠ্যবইয়ের মান যাচাইয়ে মাঠ পর্যায়ে যান এনসিটিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এতে দেখা যায়, ঢাকা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, গাইবান্ধা, পঞ্চগড়, খাগড়াছড়ি, বান্দরবানসহ দেশের ২০টি জেলার মোট ৪৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীও পাঠ্যবইয়ের অনুশীলন পার্ট— ‘নিজে করি, দেখি পারি কিনা’ অংশটুকু পূরণ করে না এবং শিক্ষকরাও তা পূরণ করান না ও বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি।
শ্রেণিকক্ষেই অনুশীলন অংশটুকু শিক্ষার্থীদের পূরণ করানোর জন্য শিক্ষকদের নির্দেশনা দেয়া থাকলেও তা মানছেন না তারা। ক্লাসে শিক্ষকরা কিভাবে পড়াবেন সেই গাইডলাইন বা শিক্ষক সহায়িকা (নির্দেশিকা) প্রতিবছর প্রণয়ন করে এনসিটিবি এবং শিক্ষকদের একটি করে কপিও দেয়া হয়ে থাকে।
তবে দেশের ৬৪টি জেলার মাঠ পর্যায়ে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষকরা সেসব গাইডলাইন বইটিও পড়েন না এবং অনেক শিক্ষক বিষয়টিও জানেন না। এ কারণে আর্থিক খরচের অপচয় রোধে ২০২৫ ও ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষক নির্দেশিকার হার্ডকপি ছাপানো থেকে বিরত থাকে সংস্থাটি। তবে এ দু বছর অনলাইনে নির্দেশিকাটি দেয়া হয়েছে।
প্রতিটি পাঠ্যবই বা বিষয় সম্পাদনায় এনসিটিবির একজন গবেষণা কর্মকর্তা কাজ করে থাকেন। তবে জাতীয় সংসদে গত ১৮ জুন প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের রিডিং পড়ার বিষয়টি আলোচনার পর, শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা ও পাঠ্যবইয়ের সমস্যা চিহ্নিত করতে ও সমাধানে কাজ শুরু করেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রাথমিকের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ৩৬টি পাঠ্যবই ঘেঁটে দেখা গেছে, প্রতিটি বইয়ের অধ্যায় শেষে ‘অধ্যায় থেকে শিক্ষার্থীরা যে বিষয়টি শিখেছে বা পড়েছে, অনুশীলন করার জন্য ‘নিজে করি, দেখি পারি কিনা’ নামে একটি অংশ রাখা হয়েছে। এ অংশটুকু শিক্ষার্থীদের শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে পূরণ করাবেন বলে শিক্ষকদের নির্দেশনাও দেয়া রয়েছে এবং কিভাবে শিক্ষার্থীদের পড়াবেন সে ব্যাপারে ২২টি প্রশিক্ষণও তাদের দেয়া হয়ে থাকে বলে জানান এনসিটিবির কর্মকর্তারা।
এদিকে শিক্ষার্থীরা বাংলা, ইংরেজি রিডি পড়ার পাশাপাশি যোগ, বিয়োগ, গুণ এবং ভাগ না পারলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বেতন বন্ধের হুঁশিয়ারি দিয়ে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের চিঠি দেয় স্ব স্ব জেলার প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা। চিঠিতে শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন বাংলা ও ইংরেজি বইয়ের ৫ পৃষ্ঠা জোরে জোরে শব্দ করে পড়ানোর কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি গণিতের যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগ শেখানোর ওপর জোর দিতে বলা হয়েছে।
চলতি বছরের জুলাই মাসের মধ্যেই দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বাংলা ও ইংরেজি সাবলীলভাবে পড়তে পারার দক্ষতা নিশ্চিতে সম্প্রতি দেশের সব জেলার প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকে লক্ষ্য নির্ধারণ করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাখাওয়াৎ হোসেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, শিক্ষার্থীদের একটি পাঠ বা অধ্যায় পড়ানোর পর, শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষেই শিক্ষার্থীদের ‘অনুশীলন অংশটুকু’ পূরণ করাবেন। শিক্ষার্থীরা মূল পাঠ্যবইটিকে একটি খাতা হিসেবে বা প্র্যাকটিক্যাল হিসেবে ব্যবহার করবে, তা শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকরা বুঝাবেন এবং পূরণ করাবেন। এতে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের বিষয়টি মাথায় গেঁথে থাকবে। প্র্যাকটিক্যালি শিক্ষার্থীরা যখন গড়ে উঠে, তখন দেখা যাবে—৫ বছর পড়ার পর একজন শিক্ষার্থী রিডিং পড়া, লিখার ক্ষেত্রে ত্রুটি থাকবে না। শিক্ষকদের ব্যর্থতার কারণেই শিক্ষার্থীদের রিডিংয়ে দুর্বলতা তৈরি হচ্ছে, তবে আরও অনেক কারণও রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. হাফিজ আহমেদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘বাচ্চারা রিডিং পড়তে পারে না, বিষয়টার সঙ্গে আমি পুরোপুরি একমত না। কোনো বাচ্চা আছে তিন মিনিটে পড়ে ফেলে, আবার কোনো বাচ্চার পাঁচ মিনিট, আবারও কারো সাত মিনিট সময় লাগছে। শক্ত ওয়ার্ড বা যুক্তবর্ণ দেখলে কোনো কোনো বাচ্চা পড়তে পারে না। বিষয়টির ব্যাপারে আরও স্পেসিফিক তথ্য আসা দরকার।’
‘স্লো রিডার’ শব্দটা আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মাঠ পর্যায় থেকে যে তথ্য আসছে, সেটা আসলে কিভাবে রিচার্সটা হচ্ছে সেটা দেখতে হবে। আমাদের আরেকটা বেসিক প্রবলেম যেটা হয়, এনসিটিবির কারিকুলাম যেভাবে বাচ্চাদেরকে তৈরি করছে বা তৈরি করার কথা—আমি রিসার্চের যে ফ্রেমটা ইউজ করে দেখব, এই দুইটা বিষয় কি ভিন্ন ডিস্টিংগুইশ হচ্ছে কিনা। আমি একটা উদাহরণ দিচ্ছি—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার সময়, গত দুই বছর ইউনিভার্সিটি বলার চেষ্টা করছে, ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নটা ইন্টারমিডিয়েটের জন্য কার্যকরী—এটা নিয়ে কিন্তু স্টিল একটু ডাউট আছে। অর্থাৎ এখানে বাচ্চারা তৈরি হচ্ছে সৃজনশীল প্রক্রিয়াতে। ইউনিভার্সিটি ভর্তি পরীক্ষা হচ্ছে অন্যভাবে।’
তিনি আরও বলেন, রিডিং এবিলিটি অনুযায়ী শিক্ষকদের যেভাবে তৈরি করা হচ্ছে, আর কারিকুলাম অনুযায়ী বাচ্চাদের কাছ থেকে যেটা প্রত্যাশা করা হচ্ছে—এই বিষয়টা আগে বুঝতে হবে। যে অ্যানালাইসিসে বাচ্চাদের রিডিং দুর্বলতা চিহ্নিত করা হচ্ছে—এই অ্যানালাইসিসটা আগে যাচাই করতে হবে। আমি ধরে নিচ্ছি বাচ্চাদের গ্যাপ আছে, এটা আমার এক্সপেরিয়েন্স—আমরা বুঝি। এই রিচার্সের তথ্যটা আরও যাচাই-বাছাই করতে হবে। এটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে বিষয়টি নিয়ে যদি সরকার কোনো পদক্ষেপে যেতে চায়, তাহলে আরও অথেন্টিক রিসার্চ হওয়া দরকার।
ঢাাবির এই অধ্যাপক বলেন, এনসিটিবির গবেষকরা যে উদ্দেশ্যে পাঠ্যবইগুলো সম্পাদনা করছে, তাতে বাচ্চারা শিখবে। কিন্তু আমরা কিন্ডারগার্টেনে গিয়ে দেখি তার চেয়েও বেশি পড়ানো হচ্ছে—ওখানেও গ্যাপ রয়েছে। শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষের কাজগুলো কিভাবে করছেন—তা আরেকটু দেখা দরকার। আমরা দিন শেষে চাই বাচ্চারা শিখবে, সে তার লেভেলে যতটুকু লার্নিং আউটকাম অর্জন করার কথা, সেটা অর্জন করছে কিনা। বাচ্চাদের রিডিং বা অন্য গ্যাপগুলোর অনেক কারণ হতে পারে। শিক্ষক প্রশিক্ষণ, যোগ্যতা, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশসহ নানা বিষয় জড়িত রয়েছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিদ্যালয়) মো. লাল হোসেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘এক সপ্তাহ হয়েছে আমি এখানে যোগদান করেছি। প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের রিডিং পড়ার বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয় থেকে একটি চিঠিও পাঠানো হয়েছে, সে চিঠিগুলোও আমি দেখেছি। প্রাথমিকের শিক্ষকদের যেহেতু চিঠি দেওয়া হয়েছে, অপেক্ষা করছি কী আউটপুট আসে।’
তিনি বলেন, ‘পাঠ্যপুস্তকের অনুশীলন অংশটুকু কেন শিক্ষকরা পূরণ করাচ্ছেন না, সে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে। আর বাচ্চারা যেন ইংরেজি-বাংলার রিডিং পড়া ও যোগ-বিয়োগ ও গুণ-ভাগ করতে পারছে কিনা সে বিষয়ে যে চিঠিটি দেওয়া হয়েছে, তা দেখেছি, আমরা কাজ করছি। যেহেতু অল্প কয়েকদিন হয়েছে, বিস্তারিত আমাদের জনসংযোগ বিভাগ আরও ভালো বলতে পারবেন।’