বিদেশে উচ্চশিক্ষা: সুইডেনে স্কলারশিপ পাওয়ার উপায়
একসময় সুইডেন মূলত আইকিয়া বা নোবেল পুরস্কারের জন্য পরিচিত থাকলেও, বর্তমানে এটি উচ্চশিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার শিক্ষার্থীদের কাছে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার এই দেশটি দিন দিন আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
বিশ্বখ্যাত অনেক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের আশ্রয়স্থলের কারণে ক্যারিয়ার গঠনে হাজারো বিদেশি শিক্ষার্থীর কাছে স্বপ্নতুল্য দেশটি। শেনজেনভুক্ত দেশ সুইডেনে উচ্চশিক্ষার নানা সুযোগ আছে।
গত এক দশকে ইউরোপের আধুনিক ও উদ্ভাবনমুখী দেশ সুইডেন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে। প্রায় শতভাগ সাক্ষরতার এ দেশটি তার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে আকর্ষণীয় স্কলারশিপের সুযোগ প্রদান করে আসছে। ফলে বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থী ইতোমধ্যেই এসব সুযোগ কাজে লাগিয়ে সুইডেনে পড়াশোনা করার স্বপ্ন পূরণ করছে।
শুধু পড়াশোনাই নয়, ডিগ্রি সম্পন্ন করার পর সুইডেনে স্থায়ীভাবে কাজ করার সুযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি দেশটির শিক্ষাগত সনদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি থাকায় বিশ্বের অন্যান্য উন্নত দেশেও ক্যারিয়ার গড়ার পথ সুগম হয়। তাই আজকের আমরা জানব কীভাবে সুইডেনে স্কলারশিপ পাওয়া যায় এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় করণীয়গুলো কী।
উচ্চশিক্ষায় সুইডেনের স্কলারশিপ
অন্যান্য উন্নত দেশগুলোর তুলনায় সুইডেনে পড়ালেখার খরচ তুলনামূলক কম হলেও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর শিক্ষার্থীদের জন্য তা এখনও বেশ ব্যয়বহুল। তাই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য সুইডেনে উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে যাওয়া।
সুইডেন মূলত দুই ধরনের স্কলারশিপের সুযোগ দিয়ে থাকে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে: বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কলারশিপ সাধারণত প্রতি সেমিস্টারের টিউশন ফি-এর ওপর প্রদান করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে এই স্কলারশিপের পরিমাণ ও ধরন ভিন্ন হতে পারে, তবে সাধারণত এর বাইরে অতিরিক্ত সুবিধা থাকে না।
সুইডিশ সরকার কর্তৃক প্রদানকৃত: সরকারি স্কলারশিপে টিউশন ফি-এর পাশাপাশি আরও নানা সুবিধা অন্তর্ভুক্ত থাকে। এই স্কলারশিপটি “সুইডিশ ইনস্টিটিউট স্কলারশিপ” বা সংক্ষেপে এসআই স্কলারশিপ নামে পরিচিত। সুইডেনের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তিন বছর মেয়াদি স্নাতক এবং দুই বছর মেয়াদি স্নাতকোত্তর প্রোগ্রামের সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ইংরেজি ভাষায় পরিচালিত স্নাতকোত্তর প্রোগ্রামের সংখ্যা প্রায় নয়শত, যা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষভাবে আকর্ষণীয়।
এসআই (সুইডিশ ইনস্টিটিউট) স্কলারশিপটি মূলত স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের জন্য প্রযোজ্য। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা সর্বোচ্চ চারটি বিষয়ে স্নাতকোত্তরের জন্য আবেদন করতে পারেন। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য এই স্কলারশিপের আওতায় যেসব সুবিধা প্রদান করা হয়।
সুযোগ-সুবিধা:
সম্পূর্ণ টিউশন ফি মওকুফ
পুরো অধ্যয়নকাল জুড়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বহনের জন্য প্রতি মাসে প্রায় ১১,০০০ সুইডিশ ক্রোনা ভাতা
অসুস্থতা ও দুর্ঘটনার জন্য বীমা সুবিধা
নেটওয়ার্ক ফর ফিউচার গ্লোবাল লিডারসের সদস্যপদ, যা সুইডেনে অবস্থানকালে পেশাগত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সহায়তা করে
স্কলারশিপ শেষে এসআই অ্যালামনাই নেটওয়ার্কের সদস্য হওয়ার সুযোগ, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্যারিয়ার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বর্তমানে এই নেটওয়ার্কে ১৪০টিরও বেশি দেশের প্রায় ১৫ হাজারের বেশি সদস্য রয়েছে
সম্পূর্ণ অধ্যয়নকালীন সময়ে ভ্রমণের জন্য এককালীন প্রায় ১৫,০০০ সুইডিশ ক্রোনা অনুদান
স্কলারশিপ পাওয়ার যোগ্যতাসমূহ
সুইডেনে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন করতে হলে কিছু নির্দিষ্ট শিক্ষাগত ও ভাষাগত যোগ্যতা পূরণ করতে হয়। স্নাতক প্রোগ্রামের জন্য সাধারণত ১২ বছরের এবং স্নাতকোত্তর প্রোগ্রামের জন্য ১৬ বছরের শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকতে হয়। অন্যান্য দেশের মতো এখানে স্কলারশিপের ক্ষেত্রে সিজিপিএ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ভাষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রে, সুইডেনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রোগ্রামভেদে ইংরেজি ভাষায় দক্ষতার নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হয়। অনেক ইংরেজি-মাধ্যমের প্রোগ্রামে আই ই এল টি এস বা সমমানের ইংরেজি ভাষার পরীক্ষার স্কোর গ্রহণ করা হয়। তবে প্রয়োজনীয় স্কোর বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রোগ্রামভেদে ভিন্ন হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী শিক্ষার মাধ্যমে ইংরেজি ভাষায় পড়াশোনার প্রমাণ গ্রহণযোগ্য হতে পারে। তাই আই ই এল টি এস ছাড়াই আবেদন করা যাবে কি না, তা সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রোগ্রামের নির্দিষ্ট ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ রিকোয়ারমেন্টস দেখে নিশ্চিত হওয়া উচিত।
সুইডিশ ইনস্টিটিউট স্কলারশিপের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, প্রথমে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর প্রোগ্রামে ভর্তি নিশ্চিত করতে হবে, এরপরই এই স্কলারশিপের জন্য আবেদন করা যায়।
এসআই স্কলারশিপের জন্য প্রার্থীর কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে অন্তত ৩,০০০ ঘণ্টা, যা পূর্ণকালীন চাকরির হিসেবে প্রায় দেড় বছরের সমান। এখানে শুধু চাকরি নয়, ইন্টার্নশিপ, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ এবং নেতৃত্বমূলক কার্যক্রমও গণ্য হয়।
স্কলারশিপের জন্য আবেদন
সুইডেনে স্কলারশিপের জন্য আবেদন প্রক্রিয়া সঠিকভাবে অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিজিপিএ প্রমাণের জন্য সাধারণত ব্যাচেলর এবং মাস্টার্সের ট্রান্সক্রিপ্ট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক সত্যায়িত হার্ড কপি পাঠাতে হয়। এটি সরকারি ডাক বিভাগ বা ডিএইচএল এর মাধ্যমে নিরাপদে প্রেরণ করা যেতে পারে।
আরও দেখুন: সৌদি আরবের সোফা তৈরির কারখানায় নিহত ৭ জনের মরদেহ দেশে আসছে কাল
প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টসমূহ: বিশ্ববিদ্যালয় বা সুইডিশ ইনস্টিটিউট স্কলারশিপের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে যে ডকুমেন্টগুলো আপলোড করতে হয়।
১. ভাষাগত দক্ষতার সনদ (আইইএলটিএস স্কোর)
২. মোটিভেশন লেটার
৩. পাসপোর্টের কপি
৪. সিভি
৫. রেফারেন্স লেটার
সুইডেনে স্কলারশিপ পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আবেদন প্রক্রিয়াগুলোর প্রতি যত্নশীল হওয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কলারশিপের জন্য মাস্টার্স বা পিএইচডি প্রোগ্রামে ইন্টারভিউ থাকতে পারে, তাই ইন্টারভিউর জন্য যথাযথ প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।
সুইডিশ ইনস্টিটিউট স্কলারশিপে সাধারণত ইন্টারভিউ থাকে না। সেক্ষেত্রে আবেদনপত্রে থাকা সিভি, রেফারেন্স লেটার এবং মোটিভেশন লেটার যথাযথভাবে তৈরি করা এবং একে অপরের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।