১৩ জুন ২০২৬, ১১:২০

যুক্তরাষ্ট্রের ৬ ইউনিভার্সিটি থেকে ফুল ফান্ডেড পিএইচডি অফার পেলেন ববির ওবাইদুল্লাহ

মো. ওবাইদুল্লাহ সিয়াম   © টিডিসি ফটো

গ্র্যাজুয়েট রেকর্ড এক্সামিনেশনে (জিআরই) ৩৩৮ নম্বরের অবিশ্বাস্য স্কোর তুলে যুক্তরাষ্ট্রের ছয়টি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফুল ফান্ডেড পিএইচডি অফার পেয়েছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) লোক প্রশাসন বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী মো. ওবাইদুল্লাহ সিয়াম।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের এই কৃতি শিক্ষার্থী সবদিক বিবেচনা করে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়াতে’ পলিটিক্যাল সায়েন্স পিএইচডি প্রোগ্রামে ভর্তি হওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট থেকে উঠে এসে বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষার মঞ্চে তার এই সাফল্য ববি ক্যাম্পাসে ব্যাপক অনুপ্রেরণা ও আনন্দের সৃষ্টি করেছে।

মো. ওবাইদুল্লাহ সিয়াম বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। কিছুদিন শিক্ষকতা করার পরে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে আমেরিকায় পাড়ি জমান এবং ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন মিসিসিপি থেকে পলিটিক্যাল সায়েন্সে ৩.৯৪ সিজিপিএ নিয়ে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। 

মাস্টার্সের শেষ বর্ষে থিসিস প্রপোজাল ডিফেন্সের প্রস্তুতির পাশাপাশি তিনি জিআরই পরীক্ষার কঠিন প্রস্তুতি নেন এবং অভাবনীয় সাফল্য পান। এরপর গত নভেম্বর ও ডিসেম্বরের মধ্যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের প্রক্রিয়া শেষ করেন। পরবর্তী সময়ে ফল ২০২৬ সেশনের জন্য ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়া ছাড়াও ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলিনা অ্যাট চ্যাপেল হিল, ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব পিটসবার্গ এবং টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটিসহ মোট ছয়টি শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ফুল ফান্ডিংসহ পিএইচডি প্রোগ্রামের অফার দেয়।

ভর্তির আবেদনের শুরুর দিকটা অবশ্য সিয়ামের জন্য মোটেও সহজ ছিল না। ইউসি বার্কলে, ডিউক ইউনিভার্সিটি, ইমোরি ইউনিভার্সিটি ও রাইস ইউনিভার্সিটির মতো বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান থেকে ইন্টারভিউয়ের ডাক পেলেও তাকে একের পর এক রিজেকশন দেখতে হয়েছে। প্রায় ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রিজেকশন পাওয়ার পর অবশেষে তার প্রথম অ্যাকসেপ্টেন্স লেটার বা ভর্তির চূড়ান্ত প্রস্তাব আসে। তার শিক্ষকেরা জানিয়েছিলেন, ফান্ডিং ক্রাইসিস বা অর্থায়নের সংকট থাকলেও সিয়ামের ৩৩৮ জিআরই স্কোরের কারণে তারা নিশ্চিত ছিলেন যে সিয়াম ফুল ফান্ডিং পাবেনই। এই পুরো যাত্রাকে তারা মেধা বা প্রতিভার চেয়ে সিয়ামের কঠোর পরিশ্রম ও শৃঙ্খলার ফসল হিসেবেই দেখছেন।

নিজের এই দীর্ঘ লড়াই ও সাফল্য নিয়ে মো. ওবাইদুল্লাহ সিয়াম বলেন, 'এই ডিগ্রির জন্য আমি স্ত্রী, মা, পরিবার এবং আপনজনদের ছেড়ে অনেক দূরে ছিলাম। অনেক কিছু স্যাক্রিফাইস করেছি। চাকরি ছেড়ে দিয়ে নতুন স্বপ্নের পথে পা বাড়িয়েছিলাম। পথটা মোটেও সহজ ছিল না। একাকিত্ব, অনিশ্চয়তা, মানসিক চাপ, আর অসংখ্য চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।' 

তিনি আরও বলেন, 'তবে আল্লাহর অশেষ রহমত, পরিবারের দোয়া, স্ত্রীর ধৈর্য ও ভালোবাসা, এবং শিক্ষকদের সহযোগিতায় আজকের এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। এই অর্জন শুধু আমার একার নয়। এটি আমার পরিবার, আমার প্রিয়জন এবং যারা দূর থেকে আমাকে সাহস দিয়েছেন সবার ভালোবাসা ও দোয়ার ফল।'

নিজের ভবিষ্যৎ গবেষণা ও অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে সিয়াম বলেন, 'আমার গবেষণা মূলত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, পররাষ্ট্রনীতি, পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা (Great Power Competition), ভূরাজনীতি , মাইগ্রেশন , হেলথ পলিসি এবং রাজনৈতিক অর্থনীতিকে ঘিরে আবর্তিত। একই সঙ্গে আমি গবেষণা পদ্ধতি বিশেষ করে Quantitative Analysis, Causal inference, Text-as-data এবং মিক্সড-মেথডস নিয়ে নিজের দক্ষতাকে আরও শানিত করতে চাই।' 

তিনি বলেন, 'ইউনিভার্সিটি অফ ভারজিনিয়ার চমৎকার একাডেমিক পরিবেশ আমার এই লক্ষ্য ও গবেষণাকে আরও অর্থবহ করে তুলবে বলে আমি বিশ্বাস করি। বাংলাদেশের মতো একটি প্রেক্ষাপট থেকে উঠে এসে বিশ্বের এমন প্রভাবশালী গবেষণা-প্রতিষ্ঠান্তুলোতে পড়ার সুযোগ পাওয়াটা আমার জন্য একসময় দূরের স্বপ্ন মনে হতো। অনেক সময় নিজের প্রস্তুতি নিয়ে সংশয় এসেছে, পথটি কঠিন মনে হয়েছে। কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝেছি, বড় স্বপ্নের জন্য বড় অহংকার নয়, বরং প্রয়োজন অসীম ধৈর্য, কঠোর শৃঙ্খলা এবং বিনয়।'

ভর্তির প্রক্রিয়ার দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে তিনি আরও বলেন, 'মাস্টার্সের শেষ বছরের দিকে, যখন আমি থিসিস প্রপোজাল ডিফেন্সের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, ঠিক সেই সময়েই আমার GRE প্রস্তুতি নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। সেপ্টেম্বর মাসে GRE দিলাম। এরপর অক্টোবর থেকে শুরু হলো বিশ্ববিদ্যালয় লিস্টিং, আর নভেম্বর থেকে আবেদন করা শুরু করি, কারণ বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেডলাইন ছিল ডিসেম্বরের ১ তারিখের কাছাকাছি। আবেদন প্রক্রিয়া চলেছে প্রায় ডিসেম্বর ১৫ পর্যন্ত।' 

শুরুর দিকের ধাক্কার কথা জানিয়ে সিয়াম বলেন, 'ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে জানুয়ারির মধ্যে আমি বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইন্টারভিউ অফার পাই, যেমন UC Berkeley, Duke University, Emory University, Rice University সহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এরপরও একের পর এক রিজেকশন আসতে থাকে। প্রায় ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রিজেকশন পাওয়ার পর আমার প্রথম অ্যাকসেপ্টেন্স আসে। সেই মুহূর্তের অনুভূতি আসলে ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। এত পরিশ্রমের পর যখন একটার পর একটা রিজেকশন পাচ্ছিলাম, তখন মনে হচ্ছিল হয়তো আমার কোথাও কোনো ঘাটতি আছে, হয়তো কোনো ভুল হয়েছে, কিংবা হয়তো আমার প্রোফাইল যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আল্লাহ উত্তম পরিকল্পনাকারী। সেই সময়টাই আমাকে ধৈর্য, তাওয়াক্কুল এবং নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে শিখিয়েছে। রিজেকশনগুলো কষ্টের ছিল, কিন্তু সেগুলোই আমাকে আরও শক্ত করেছে।'

দীর্ঘ এই পথচলায় যারা তাকে রেকমেন্ডেশন লেটার বা সুপারিশপত্র লিখে দিয়েছেন, বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে সাহস জুগিয়েছেন এবং গোপনে শুভকামনা জানিয়েছেন, তাদের সবার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তিনি।