০১ আগস্ট ২০২৬, ১৮:৩৩

দেড় বছরেই গ্র্যান্ড মাস্টার; ইংরেজি, বাংলা, আরবিতে বিস্ময়কর দক্ষতা খাগড়াছড়ির বিস্ময় শিশুর

খাগড়াছড়ির বিস্ময় শিশু শেহেজাদ ও তার পরিবার  © টিডিসি ছবি

যে বয়সে অধিকাংশ শিশু স্পষ্ট করে নিজের নামটুকুও বলতে শেখে না, সেই বয়সেই ইংরেজিতে বিভিন্ন বস্তু, প্রাণী, ফল, ফুল, যানবাহন ও দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিস সহজেই চিনে বলে দিত ছোট্ট মোহাম্মদ শেহেজাদ বিন খলিল। শুধু ইংরেজিই নয়, একই সঙ্গে বাংলা, আরবি বর্ণমালা, ইংরেজি বর্ণমালা, ইংরেজি সংখ্যা, কবিতা আবৃত্তি এবং পবিত্র কোরআনের সূরা ইয়াসিন পাঠেও বয়সের তুলনায় বিস্ময়কর দক্ষতা দেখিয়ে মাত্র ১৮ মাস বয়সেই অর্জন করেছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

এই অসাধারণ মেধার স্বীকৃতিস্বরূপ খাগড়াছড়ির শিশু মোহাম্মদ শেহেজাদ বিন খলিল এশিয়া বুক অব রেকর্ডস-এর মর্যাদাপূর্ণ ‘Grand Master’ (গ্র্যান্ড মাস্টার) স্বীকৃতি অর্জন করেছে। তবে সন্তানের ওপর অপ্রয়োজনীয় প্রচারের চাপ না দিতে পরিবার বিষয়টি দীর্ঘদিন প্রকাশ করেনি। বর্তমানে শেহেজাদের বয়স আড়াই বছর হওয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমের সামনে আনা হয়েছে তার এই ব্যতিক্রমী অর্জনের গল্প।

২০২৩ সালের ৫ অক্টোবর খাগড়াছড়িতে মো. ইব্রাহিম খলিল ও তানিয়া আক্তার দম্পতির ঘর আলো করে জন্ম নেয় শেহেজাদ। জন্মের কয়েক মাসের মধ্যেই তার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, অসাধারণ স্মৃতিশক্তি এবং দ্রুত শেখার আগ্রহ বাবা-মাকে বিস্মিত করে। তখন থেকেই তারা সন্তানের মেধা বিকাশে ভিন্নধর্মী একটি পদ্ধতি অনুসরণ করেন।

প্রচলিত মুখস্থনির্ভর শিক্ষা নয়, বরং খেলাধুলা, ছবি, খেলনা এবং ঘরের বাস্তব জিনিসপত্র দেখিয়ে আনন্দের মধ্য দিয়ে তাকে নতুন নতুন শব্দ শেখানো শুরু হয়। মাত্র ছয় মাস বয়স থেকেই ইংরেজি ভাষার সঙ্গে পরিচয় ঘটে তার। ধীরে ধীরে ঘরের প্রায় সব জিনিস, ফল, ফুল, পশু-পাখি, যানবাহনসহ অসংখ্য বিষয়ের নাম ইংরেজিতে বলতে শেখে সে। পাশাপাশি বাংলা ভাষাতেও গড়ে ওঠে তার সমান দক্ষতা।

শুধু ভাষা শেখাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি তার অগ্রগতি। অল্প বয়সেই বাংলা, ইংরেজি ও আরবি বর্ণমালা, ইংরেজি সংখ্যা, কবিতা আবৃত্তি এবং সূরা ইয়াসিন পাঠে যে দক্ষতা সে দেখিয়েছে, তা পরিবারকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মূল্যায়নের কথা ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে।

পরে শেহেজাদের বাবা-মা Asia Book of Records Kids Programme-এ আবেদন করেন। মূল্যায়নের অংশ হিসেবে ইংরেজিতে কথা বলার আটটি ভিডিও জমা দেওয়া হয়। এশিয়ার বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগীদের সঙ্গে দীর্ঘ যাচাই-বাছাই ও মূল্যায়নের পর বিচারকরা মাত্র ১৮ মাস বয়সেই তাকে ‘গ্রান্ড মাস্টার’ স্বীকৃতিতে ভূষিত করেন।

শেহেজাদের বাবা মো. ইব্রাহিম খলিল বলেন, ছেলের বয়স যখন মাত্র ছয় মাস, তখন থেকেই আমরা খেলাধুলার মধ্য দিয়ে ইংরেজি ভাষার সঙ্গে পরিচয় করাতে শুরু করি। কোনো ধরনের চাপ বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছিল না। ছবি, খেলনা ও বাস্তব জিনিস দেখিয়ে শব্দ শেখানো হতো। ওর শেখার আগ্রহ ও স্মৃতিশক্তি দেখে আমরা নিজেরাই অবাক হয়ে যাই। পরে আন্তর্জাতিক মূল্যায়নের জন্য আবেদন করি। মাত্র ১৮ মাস বয়সেই সে এশিয়া বুক অব রেকর্ডসের ‘গ্র্যান্ড মাস্টার’ স্বীকৃতি অর্জন করে।

তিনি আরও বলেন, আমরা ইচ্ছা করেই বিষয়টি তখন প্রকাশ করিনি। কারণ ১৮ মাস বয়সে মিডিয়ার অতিরিক্ত চাপ সন্তানের ওপর দিতে চাইনি। এখন ওর বয়স আড়াই বছর। তাই আমরা মনে করেছি, সময় এসেছে সবাইকে বিষয়টি জানানোর। ভবিষ্যতে তাকে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা এবং আরও বড় বড় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিতে চাই।

শেহেজাদের মা তানিয়া আক্তারের কাছে সন্তানের এই অর্জনের চেয়েও বড় বিষয় তার মানবিক বিকাশ। তিনি বলেন, আমি চাই আমার সন্তান সবার আগে একজন ভালো মানুষ হয়ে উঠুক। এই স্বীকৃতি শুধু আমাদের পরিবারের নয়, বাংলাদেশেরও সম্মান। আমরা চাই, সে ভবিষ্যতেও দেশের জন্য আরও বড় অর্জন নিয়ে আসুক।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, শেহেজাদের শেখার পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল আনন্দভিত্তিক। কখনো জোর করে পড়ানো হয়নি, কোনো প্রতিযোগিতামূলক চাপও দেওয়া হয়নি। বরং খেলতে খেলতেই নতুন শব্দ, নতুন ধারণা এবং নতুন বিষয় সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। শিশুমনকে স্বাধীনভাবে বিকশিত হওয়ার পরিবেশই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় কৌশল।

মাত্র দেড় বছর বয়সে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের মতো ঘটনা বাংলাদেশে খুবই বিরল। আর সেই বিরল অর্জনের গল্পের নায়ক এখন খাগড়াছড়ির ছোট্ট শেহেজাদ। বয়স এখন আড়াই বছর। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর শুভেচ্ছা ও অভিনন্দনে ভাসছে সে ও তার পরিবার। খাগড়াছড়ির মানুষও এই অর্জনকে জেলার গর্ব এবং দেশের জন্য সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল বার্তা হিসেবে দেখছেন।