সাবিন রাইজিং স্টার অ্যাওয়ার্ড পাচ্ছেন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী সেঁজুতি সাহা
টিকার মাধ্যমে বিশ্ব স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায় তিন বিজ্ঞানীকে সাবিন অ্যাওয়ার্ডস-২০২৬ প্রদান করছে আন্তর্জাতিক অলাভজনক সংস্থা সাবিন ভ্যাক্সিন ইনস্টিটিউট। এই তালিকায় স্থান পেয়েছেন বাংলাদেশের অনুজীববিজ্ঞানী সেঁজুতি সাহা। উদীয়মান বিজ্ঞানী বা নতুন নেতৃত্বের জন্য তিনি অর্জন করছেন ‘২০২৬ রাইজিং স্টার অ্যাওয়ার্ড’। আগামী ১২ মে ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস ভবনে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁর কাছে পদক তুলে দেওয়া হবে।
এ বছর কোভিড-১৯ মহামারির গতিপথ বদলে দেওয়া ও বিশ্বজুড়ে নতুন ধরনের ওষুধের প্রাপ্যতা বৃদ্ধিতে নিরলস প্রচেষ্টার জন্য ‘অ্যালবার্ট বি. সাবিন গোল্ড মেডেল’ পাচ্ছেন অধ্যাপক উগুর শাহিন ও অধ্যাপক ওজলেম ত্যুরেজি। আর সেঁজুতি সাহা তাঁর পুরষ্কারটি পাচ্ছেন জিনতত্ত্বভিত্তিক বিশ্লেষণ ব্যবহার করে বিশ্বের সবচেয়ে বড় টাইফয়েড টিকা কর্মসূচির বাস্তবায়নে সহায়তার স্বীকৃতি স্বরূপ।
মূলত টিকার মাধ্যমে বিশ্ব স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন এই বিজ্ঞানীরা। করোনা মহামারি মোকাবিলা থেকে শুরু করে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ— সব ক্ষেত্রে রয়েছে তাঁদের অসামান্য ভূমিকা।
এর আগে গত সোমবার সাবিন ভ্যাকসিন ইনস্টিটিউটের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। অ্যালবার্ট বি. সাবিন গোল্ড মেডেল ১৯৯৩ সাল থেকে এবং রাইজিং স্টার অ্যাওয়ার্ড ২০২০ সাল থেকে দেওয়া হচ্ছে। এবারের পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানটি সরাসরি অনলাইনে সম্প্রচার করা হবে।
উল্লেখ্য, সেঁজুতি সাহা চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (সিএইচআরএফ) উপনির্বাহী পরিচালক। তিনি জাতীয় পর্যায়ের বড় টিকাদান উদ্যোগগুলোর জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক তথ্য ও প্রমাণ তৈরি করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের ২০২৫ সালের টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন (টিসিভি) কর্মসূচি। এটি ইতিমধ্যে ৪ কোটির বেশি শিশুর কাছে পৌঁছেছে।
এ ছাড়া সেঁজুতি সাহা দেশে একটি উন্নত জিনোম গবেষণাগার গড়ে তুলতে সহায়তা করেছেন। এ গবেষণাগারে হাজার হাজার রোগ-জীবাণুর জিনোম সিকোয়েন্স করা হয়েছে, যা দ্রুত রোগ শনাক্ত করতে এবং ক্লেবসিয়েলা ও আরএসভির মতো রোগের টিকা তৈরিতে সাহায্য করছে। সেঁজুতি সাহার কাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, দেশে বৈজ্ঞানিক নেতৃত্ব গড়ে তোলা ও নতুন প্রজন্মের গবেষকদের দিকনির্দেশনা দেওয়া।
এ বিষয়ে ড. সেঁজুতি সাহা বলেন, এই পুরস্কার আমার কাছে অত্যন্ত অর্থবহ, কারণ এটি বাংলাদেশের একটি অসাধারণ কমিউনিটির বহু বছরের পরিশ্রমের প্রতিফলন। এটি দেখায় যে মানুষ একসঙ্গে কাজ করলে পৃথিবীর যেকোনো জায়গা থেকেই উচ্চমানের বিজ্ঞান সম্ভব।
সাবিন ভ্যাকসিন ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অ্যামি ফিনান বলেন, সেঁজুতি সাহা নতুন প্রজন্মের বৈজ্ঞানিক নেতৃত্বের উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি শুধু গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ নন, বরং তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে শক্তিশালী টিকানীতি গড়ে তুলতেও কাজ করছেন।
সাবিন অ্যাওয়ার্ডস অনুষ্ঠানটি সরাসরি অনলাইনে সম্প্রচার করা হবে। ১৯৯৩ সাল থেকে অ্যালবার্ট বি. সাবিন গোল্ড মেডেল এবং ২০২০ সাল থেকে রাইজিং স্টার অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হচ্ছে— যা ড. সাবিনের ‘সবার জন্য টিকা’ নিশ্চিত করার উত্তরাধিকারকে উদযাপন করে।
শাহিন-ত্যুরেজি দম্পতি
অধ্যাপক শাহিন ও ত্যুরেজি, যারা ব্যবসায়িক ও জীবনসঙ্গী— তাঁরা যুগান্তকারী কোভিড-১৯ টিকা উদ্ভাবন এবং কয়েক দশক ধরে উন্নয়ন করা উদ্ভাবনী প্রযুক্তির মাধ্যমে ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার জন্য এই পুরস্কার পাচ্ছেন। কোভিড-১৯ মহামারির শুরুতে তাঁরা মূলত ক্যানসার চিকিৎসার জন্য তৈরি প্রযুক্তি ব্যবহার করে খুব অল্প সময়ে তাদের প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য পরিবর্তন করে একটি কার্যকর টিকা তৈরি করেন, যা বিলিয়ন মানুষের জীবন রক্ষা করতে সহায়তা করেছে।
বিশ্বজুড়ে মানুষের স্বাস্থ্য উন্নয়নের লক্ষ্যে তাঁরা বর্তমানে যক্ষ্মা, এইচআইভি এবং ম্যালেরিয়ার মত গুরুত্বপূর্ণ রোগের বিরুদ্ধে একই প্রযুক্তির ভিত্তিতে নতুন টিকা উন্নয়নে কাজ করছেন। পাশাপাশি, আফ্রিকায় একটি টেকসই ও শক্তিশালী টিকা ব্যবস্থা গড়ে তুলতেও তাঁরা তাঁদের দল ও অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করছেন।
এক যৌথ বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, ২০২৬ সালের সাবিন গোল্ড মেডেল পেয়ে আমরা গভীরভাবে সম্মানিত। আলবার্ট সাবিনের বিশ্বাস— বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার তখনই অর্থবহ, যখন তা মানুষের কাছে পৌঁছে। এটি আমাদের জন্য দীর্ঘদিনের অনুপ্রেরণা। আমরা বিশ্বাস করি, উদ্ভাবনী ওষুধ তাঁদের কাছেই পৌঁছানো উচিত, যাঁদের এটি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। এই পুরস্কার আমাদের বিশ্বজুড়ে দল ও অংশীদারদের যৌথ প্রচেষ্টার স্বীকৃতি।”
অ্যামি ফিনান বলেন, শাহিন ও ত্যুরেজি টিকার ভবিষ্যৎ বদলে দিয়েছেন এবং দেখিয়েছেন কীভাবে বৈজ্ঞানিক উদ্যোক্তারা গবেষণাকে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যে রূপান্তর করতে পারেন। জীবনরক্ষাকারী টিকা দ্রুত তৈরি এবং সবার জন্য প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার জন্য তাঁদের অবদান অসাধারণ।