নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্ণিল আয়োজনে আদিবাসী উৎসব
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা ও পরিবেশনা বিদ্যা বিভাগের আয়োজনে ও আদিবাসী শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় প্রথমবারের মতো আদিবাসী শিক্ষার্থীদের কেন্দ্র করে আয়োজিত হয়েছে ‘আদিবাসী উৎসব- ২০২৬’।
গতকাল বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে গারোদের ঐতিহ্যবাহী জুম নাচ, আদিবাসী গান ও নৃত্য পরিবেশনার মধ্য দিয়ে উৎসবের সূচনা হয়। নাট্যকলা ও পরিবেশনা বিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. ইসমত আরা ভূইয়া ইলার সভাপতিত্বে উৎসবের উদ্বোধন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন।
এ সময় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইমদাদুল হুদা। উৎসবে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা জাতীয় পদক-২০২৫ প্রাপ্ত উন্নয়নকর্মী, লেখক ও গবেষক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা, কবি ও সাহিত্যিক এবং বিরিশিরির পরিচালক পরাগ রিসিল ও প্রিংসন সাংমা। এ ছাড়া আদিবাসী সাংস্কৃতিক কর্মী, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় দর্শনার্থীরাও এতে অংশ নেন।
উদ্বোধনী আয়োজনের পর আদিবাসী শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে অতিথি ও শিক্ষকদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় আড্ডা। এরপর আমন্ত্রিত আদিবাসী অতিথিদের অনুভূতি বিনিময়ের জন্য আয়োজন করা হয় ‘বহমান আমারও পদচিহ্ন’ শীর্ষক বিশেষ পর্ব। এরপর অনুষ্ঠিত হয় আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী ঘিলা খেলা এবং মারমা রূপকথা নিয়ে গল্প বলার আয়োজন। বিকেলে আবৃত্তি সংগঠন শব্দকুঞ্জের পরিবেশনায় আবৃত্তি, আদিবাসী গান ও নৃত্য পরিবেশন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আদিবাসী শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া ড্রামা চেম্বারের পরিবেশনায় ‘নামের সুতো’ নাটক, বোতল নৃত্য এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ডান্স ক্লাবের পরিবেশনায় নৃত্য পরিবেশিত হয়।
মূলত নাট্যকলা বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের ‘ইভেন্ট ও প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট’ কোর্সের পরীক্ষার অংশ হিসেবে উৎসবটির আয়োজন করা হয়। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বাস্তবভিত্তিক অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জীবনধারা সম্পর্কে বৃহত্তর পরিসরে পরিচিতি তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এ বিষয়ে নাট্যকলা ও পরিবেশনা বিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং কোর্সটির তত্ত্বাবধায়ক মো. মাজহারুল হোসেন তোকদার বলেন, বিভাগের শিক্ষার্থীদের পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে এ আয়োজন করা হয়েছে। সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও আয়োজনসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের ওপর ভিত্তি করে তাদের পরীক্ষার নম্বর নির্ধারণ করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনধারা সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের ৫৪টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর খাদ্যাভ্যাস, গান, নৃত্য, পোশাক ও ঐতিহ্য তুলে ধরার মধ্য দিয়ে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে পরিচিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য শুধু একটি উৎসব আয়োজন নয়, বরং সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে একে অপরকে জানা, বোঝা ও সম্মান করার পরিবেশ তৈরি করা। আমরা চাই, এ আয়োজন আদিবাসী ও বাঙালিদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন তৈরিতে ভূমিকা রাখুক।
উৎসবকে কেন্দ্র করে আদিবাসী শিক্ষার্থীরা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও স্থানীয় খাবারের বিভিন্ন স্টল সাজান। উৎসবের মঞ্চ থেকে শুরু করে স্টলগুলোর সাজসজ্জায়ও ছিল আদিবাসী সংস্কৃতির ছোঁয়া। বাঁশ ও ধইঞ্চা দিয়ে সাজানো হয় পুরো আয়োজনস্থল। সন্ধ্যায় ষড়ঙ্গ ব্যান্ড ও নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় ব্যান্ড মিউজিক সোসাইটির সংগীত পরিবেশনা, আদিবাসী নৃত্য ও গানের মধ্য দিয়ে উৎসবের সাংস্কৃতিক আয়োজন আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। দিনব্যাপী এসব আয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ ও আদিবাসী সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী দর্শনার্থীরাও অংশ নেন।