২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:৩৪

কুবি ছাত্রী ফারজানার মৃত্যু ঘিরে ধোঁয়াশা: সুষ্ঠু তদন্তের দাবি শিক্ষার্থীদের

নিহত ছাত্রী ফারজানা  © সংগৃহীত

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) ফার্মেসি বিভাগের স্নাতকোত্তর ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফারজানা ইসলামের মৃত্যু ঘিরে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। নারায়ণগঞ্জে স্বামীর ভাড়া বাসা থেকে তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় স্বামীসহ সাতজনের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনা ও নির্যাতনের অভিযোগে এজাহার দিয়েছেন তার বাবা। অন্যদিকে, ফারজানার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তার সহপাঠীরা।

গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাতে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার ভুঁইগড় এলাকার আব্দুল হামিদ রোডে স্বামীর ভাড়া বাসার একটি কক্ষ থেকে ফারজানার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

ফারজানার মৃত্যুর পর হাতে লেখা একটি চিঠি সামনে আসে। এতে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের আচরণ, পারিবারিক বিরোধ এবং মানসিক কষ্টের কথা তুলে ধরেছেন বলে জানা গেছে। চিঠিতে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে তিনি লিখেছেন, ‘এর চেয়ে বেশি সহ্য করা আমার পক্ষে আর সম্ভব না।’

চিঠিতে স্বামীর বিরুদ্ধে অবহেলা ও অপমানজনক আচরণের অভিযোগও তুলে ধরেছেন ফারজানা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দুটি বড় অস্ত্রোপচারের সময় স্বামীর পরিবারের কেউ তার খোঁজ নেননি। অথচ স্বামীর মায়ের ছোট অস্ত্রোপচারের পর তাকে দেখতে যাওয়ার প্রত্যাশা করা হয়েছিল। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে চিঠিতে তিনি লেখেন, ‘উঠতে বসতে খাবারের খোঁটা আজকে যে আমাকে ফকিন্নি বললো কারণ আমি তার টাকায় খায়, এর চেয়ে বেশি সহ্য করা আমার পক্ষে আর সম্ভব না।’

এ ছাড়া শাশুড়ি, স্বামীর বড় বোন ও পরিবারের অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগ করেছেন তিনি। মৃত্যুর পর নিজের বাড়িতে দাফন করা এবং স্বামীকে তার মরদেহ স্পর্শ করতে না দেওয়ার ইচ্ছার কথাও চিঠিতে উল্লেখ রয়েছে। শেষাংশে মা ও পরিবারের সদস্যদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন ফারজানা।

তবে চিঠিটির সত্যতা এখনো যাচাই করা হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ। ফতুল্লা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) গাজী সুমন মাহতাব বলেন, চিঠিটি পরীক্ষা করতে পাঠানো হবে। আগের লেখার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে। নিহত ফারজানার পায়ের নিচে চিঠিটি পাওয়া গিয়েছিল বলেও জানান তিনি।

অন্যদিকে, ফারজানার ভাই আরিফুল ইসলাম দাবি করেন, চিঠিটি সাম্প্রতিক সময়ের নয়; এটি আগের কোনো সময়ের লেখা। চিঠিটি এখনো প্রমাণিত নয়। এ বিষয়ে প্রশাসন তাদের ১২ ঘণ্টা পর জানিয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

আরিফুল ইসলাম আরও বলেন, ঘটনার দিন সন্ধ্যায় তার বোনের সঙ্গে কথা হয়েছিল। তখন ফারজানাকে স্বাভাবিক মনে হয়েছে। সারারাত জেগে পড়াশোনা করার জন্য তিনি চিপস কিনে এনেছিলেন। তার পরীক্ষা ছিল। ওই দিন তাদের বাবা-মাও ঢাকায় আরিফুলের বাসায় এসেছিলেন। তারাও ফারজানার সঙ্গে কথা বলেছেন এবং সে স্বাভাবিকভাবেই কথা বলেছে বলে দাবি করেন তিনি। আরিফুলের অভিযোগ, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।

ফারজানার মৃত্যুর ঘটনায় গত রবিবার (২৫ অক্টোবর) দুপুরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা মডেল থানায় এজাহার দাখিল করেন তার বাবা মো. রফিকুল ইসলাম। এতে ফারজানার স্বামী নাজমুল ইসলামসহ সাতজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

এজাহারে রফিকুল ইসলাম অভিযোগ করেন, ২০২৩ সালের নভেম্বরে নাজমুল ইসলামের সঙ্গে তার মেয়ের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে বিভিন্ন সময়ে যৌতুকের দাবিতে ফারজানাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো। এ নিয়ে আগে পারিবারিকভাবে সমঝোতার চেষ্টা করা হলেও বিরোধের স্থায়ী সমাধান হয়নি। একপর্যায়ে আদালতে একটি সিআর মামলাও করেন বলে এজাহারে উল্লেখ করেছেন তিনি।

এজাহারের বিবরণ অনুযায়ী, ঘটনার দিন সন্ধ্যার পর পারিবারিক বিষয় ও আগের মামলা নিয়ে ফারজানার সঙ্গে তার স্বামীর কথা-কাটাকাটি হয়। এ সময় স্বামী তাকে কটূক্তি করেন এবং আত্মহত্যা করে মরতে বলেন বলে অভিযোগ করেছেন তার বাবা। এসব নির্যাতন ও প্ররোচনার কারণেই তার মেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন রফিকুল ইসলাম।

ফতুল্লা থানার উপপরিদর্শক গাজী সুমন মাহতাব বলেন, এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। ফারজানার স্বামীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

ঘটনার পর ফারজানার স্বামী নাজমুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়ার কথা জানিয়েছিল পুলিশ। ফতুল্লা থানার উপপরিদর্শক গাজী সুমন মাহতাবের অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে ফারজানাকে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়।

ফারজানার পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকে তিনি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এ নিয়ে আগে নারী নির্যাতনের একটি মামলাও করা হয়েছিল। পরে পারিবারিক সমঝোতার ভিত্তিতে মামলাটি প্রত্যাহার করা হয় বলে দাবি করেছেন স্বজনেরা।

এদিকে, ফারজানার মৃত্যুর আগের দিন তার স্নাতকোত্তর প্রথম সেমিস্টারের ‘অ্যাডভান্সড ফার্মাসিউটিক্যাল টেকনোলজি’ কোর্সের প্রেজেন্টেশন এবং পরদিন মিডটার্ম পরীক্ষা ছিল বলে জানিয়েছেন তার ব্যাচমেট সোহানুল ইসলাম সরকার। কোর্সটির কোড পিএইচএআরএম-৬১০৩।

ফারজানার মৃত্যুতে গভীর শোক ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা। ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্‌ঘাটন, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন তারা।