ইবিতে হলে প্রবেশে ‘অঘোষিত সান্ধ্য আইন’, ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা; গুজব বলছে প্রশাসন
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) আবাসিক হলে শিক্ষার্থীদের প্রবেশের ক্ষেত্রে আবারও সান্ধ্যকালীন আইন আরোপ করা হয়েছে। শারদীয় দুর্গা পূজার ছুটি শেষে গত শনিবার ক্যাম্পাস খোলার দিন থেকেই এই আইন কার্যকরে কড়াকড়ি আরোপ করে প্রশাসন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট কর্তৃক অনুমোদিত ‘কোড অব কন্ডাক্ট’ অনুযায়ী সান্ধ্যকালীন আইনের কোন অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।
জানা গেছে, ইবিতে ছাত্রদের জন্য হলে প্রবেশের সুনির্দিষ্ট কোনো নিয়মের কথা বলা না হলেও ছাত্রীদের জন্য সন্ধ্যা নামার মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যে হলে প্রবেশের নির্দেশনা দিয়েছে প্রক্টরিয়াল বডি। তবে এই সান্ধ্যকালীন আইন জারির বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পূর্বে কোনো লিখিত নির্দেশনা বা শিক্ষার্থীদের কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক নোটিশ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ক্যাম্পাস খোলার দিন সন্ধ্যার পর যথারীতি বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আড্ডারত অবস্থায় প্রক্টরিয়াল বডির এক সদস্য ক্যাম্পাসের শহিদ মিনার আড্ডারত শিক্ষার্থীদের ডেকে একত্রিত করেন এবং সান্ধ্যকালীন আইন কার্যকরের কথা জানান। এ সময় ছাত্রীরা তাৎক্ষণিকভাবে এই সিদ্ধান্তের আপত্তি জানালেও কর্তৃপক্ষ তাদের কথায় কোনো কর্ণপাত করেননি। এ সময় উপস্থিত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এক সহকারী প্রক্টরের বাগবিতণ্ডা হয়।
এদিকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সান্ধ্য আইনের ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কোড অব কন্ডাক্ট’-এ কোন নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। গত ২৪-৫-১৯৮৭ তারিখে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের ২৮তম সভায় অনুমোদিত শিক্ষার্থীদের আচরণবিধির ১৪ নং ধারার ‘ক’ দফায় আবাসিক হল সম্পর্কিত নিয়মাবলীতে বলা হয়েছে, ‘হলে বসবাসকারী শিক্ষার্থীদের নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত রাত ৮টার মধ্যে এবং বছরের বাকি সময় রাত ৯টার মধ্যে নিজ নিজ রুম বা হলে থাকতে হবে এবং হাউজ টিউটরের অনুমতি ছাড়া সকাল ৫টার আগে হল ত্যাগ করা যাবে না।’
এ ছাড়া একই ধারায় ‘খ’ দফায় বলা হয়েছে, ‘হলের প্রতিটি হাউজ একটি 'গেট বুক' (gate book) রক্ষণাবেক্ষণ করবে, যেখানে গেট বন্ধ হওয়ার পর ফিরে আসা শিক্ষার্থীদের নাম, ফেরার সময় এবং তারা কোথায় গিয়েছিল তা রেকর্ড করা হবে। হাউজ টিউটর সন্তুষ্ট না হলে কৈফিয়ত তলব করতে পারেন। নিয়মিত দেরিতে ফিরে আসা শিক্ষার্থীদের বিষয়টি প্রভোস্টের কাছে উপযুক্ত ব্যবস্থার জন্য উপস্থাপন করা হবে।’
হঠাৎ করে এই আইন কার্যকর করার পর থেকেই পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। ক্যাম্পাসের নারী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কোনো ধরনের পূর্ব ঘোষণা বা আলোচনা ছাড়াই নিরাপত্তার অজুহাত দিয়ে শুধুমাত্র ছাত্রীদের ওপর এমন বৈষম্যমূলক আইন চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ক্যাম্পাসে নানা ধরনের অনিয়ম ও বিভিন্ন সমস্যা থাকলেও প্রশাসন সেগুলোর প্রতিকারে নজর না দিয়ে কেবল মেয়েদের হলবন্দী করার বিষয়ে অতিমাত্রায় তৎপর বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা। এই ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ক্ষোভ জানিয়েছেন শিক্ষার্থী ও ছাত্রনেতারা।
ফোকলোর বিভাগের শিক্ষার্থী পুষ্প লিখেছেন, বিষয়টা অনেকটা এমন রাস্তায় ফোন নিয়ে বাহিরে বের হলে ছিনতাই তো হবেই! আমরা ছিনতাইকারীকে কেনো ধরবো? আপনিই বরং ঘর থেকে বের হবেন না। যেই প্রশাসন ১ বছরেরও বেশি সময় আগে ক্যাম্পাসে খুন হওয়া সাজিদ আব্দুল্লাহর খুনের বিচার করতে পারলো না, যেই প্রশাসন সাদিয়া ম্যামের খুনের বিচার করতে পারলো না, সেই প্রশাসনের কেনো মনে হয় আমরা এখনো তাদের কাছে নিরাপত্তার আশা রাখি? যেই দায়িত্বরত ব্যাক্তির মুখ থেকে এমন কথা বের হয় তার তো নিজ দায়িত্বে ‘আমি ছাত্র ছাত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ’ এই মর্মে স্বাক্ষর করে পদত্যাগ করা উচিত।
ক্ষোভ ঝেড়ে তিনি বলেন, ‘যেই মেয়ে ৪ টা পর্যন্ত ক্লাস করার পর ২-৩ টা টিউশনি করে রুমে ঢুকতে ৭টা বাজে তাকে আপনি ৮:৩০ পর্যন্ত ক্যাম্পাসের বাইরে বসায় রেখে দায়মুক্ত থাকবেন ভাবলেন কি করে? আপনারা এতোই সফল প্রশাসন যে সেই মেয়ে আপনার ক্যাম্পাসের চেয়ে বাইরে বেশি নিরাপদ? লজ্জা লাগে না এমন বেকুবের মতো যুক্তি দিতে? এখন শুনলাম রাতের বাস নাকি মেইন গেটেও দাঁড়াতে দিবেন না যেনো মেইন গেট থেকে কোনো ছাত্রী বাসে উঠতে না পারে। আমি বুঝি না আপনাদের কেনো মনে হয় সব সমস্যার সমাধান মেয়েদের ৬ টায় হলে, মেসে ঢুকায় দিলেই হবে? আপনারা বরং সামনে এসে বলেন, মা রে, বাবা রে আমরা তোমাদের নিরাপত্তা দিতে ব্যার্থ। তোমরা নিজেদের স্বার্থেই ঘর থেকে বের হইয়ো না।’
শাখা ছাত্রদলের আহবায়ক কমিটির সদস্য ইসমাম তন্দ্রা লিখেছেন, ‘ক্যাম্পাস কি শুধু ছেলেদের? মেয়েদের স্বাধীনতা কি নিরাপত্তার অজুহাতে কেড়ে নেওয়া হবে? ক্যাম্পাসে মুক্তভাবে চলাফেরা করতে, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে কিংবা নিজেদের মতো করে সময় কাটাতে আমাদের বারবার বাধার মুখে পড়তে হবে কেন? প্রশাসনের কাছে আমাদের স্পষ্ট প্রশ্ন—মেয়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যদি আপনাদের দায়িত্ব হয়, তাহলে সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পেরে মেয়েদের চলাফেরার স্বাধীনতা সীমিত করার যুক্তি কোথায়? আমরা নিরাপত্তা চাই, কিন্তু নিরাপত্তার নামে বন্দিত্ব চাই না।’
প্রশাসনের প্রতি প্রশ্ন রেখে বলেন, প্রশাসন কি সত্যিই মেয়েদের প্রয়োজন ও সমস্যাগুলো নিয়ে ভাবে?ক্যাম্পাসে মেয়েদের জন্য প্রয়োজনীয় স্যানিটারি প্যাড কিনতে যদি শেখপাড়ায় যেতে হয়, তাহলে ক্যাম্পাসে একটি ফার্মেসি বা প্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা নেই কেন? মেয়েদের ওয়াশরুমগুলো যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না কেন? অন্তত সাবান ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায় না কেন? মেয়েদের নিরাপত্তা কি শুধু তাদের কোথায় যাওয়া উচিত আর কোথায় যাওয়া উচিত নয়—সেই নিয়ম তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ?
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে শাখা ছাত্রশক্তি জানিয়েছে, ‘শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যকে আমরা শ্রদ্ধা জানাই তবে সন্ধ্যা ৬টার এই সময়সীমা নারী শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক ও স্বাধীন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে তাঁদের স্বাভাবিক চলাচল সীমিত করা কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। বরং ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা এবং বহিরাগতদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। এসময় নারী শিক্ষার্থীদের হলে প্রবেশের সময়সীমা রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত নির্ধারণ এবং বয়রা কত নিয়ন্ত্রণ করতে সব প্রবেশপত্রে পরিচয়পত্র যাচাই বাধ্যতামূলক করার দাবি জানিয়েছে ছাত্রশক্তি।’
ছাত্র ইউনিয়ন ইবি সংসদের সভাপতি নুরে আলম সিদ্দিকী লিখেছেন, ‘মেয়েদের জন্য সান্ধ্যকালীন আইন জারির নিন্দা জানাচ্ছি। ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা দিতে পারছেন না এটা আপনাদের ব্যর্থতা। এজন্য জোরপূর্বক কোন আইন চাপিয়ে দিতে পারেন না। আপনারা আবার বলতে পারেন অধিকাংশ নারী শিক্ষার্থী এই আইন চায়। যদি কোন নারী শিক্ষার্থী মনে করে তিনি বাইরে অনিরাপদ তাহলে তিনি বের হবেন না, এটার জন্য তো আইন দরকার নাই। তাছাড়া একজন শিক্ষার্থী ৯টা থেকে ৪টা পর্যন্ত ক্লাস করে ক্লান্ত হয়ে হলে যায়। একটু বিশ্রাম নিয়ে সন্ধ্যায় বের হয় মানসিক শান্তির জন্য। আপনারা সেটাতেও বাধা দিচ্ছেন তাহলে কি একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর জীবন কি শুধু ক্লাস আর হলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ? তাদের হলে ক্যান্টিন নাই, হঠাৎ অসুস্থ হলে প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থা নাই। এছাড়াও হাজারো সমস্যা হতে পারে যেগুলোর কোন সমাধান আপনারা করতে পারেন না। শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন বিবেচনা না করেই এই ধরনের আইন করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।’
তবে এই বিষয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের অবস্থান জানতে শাখা ছাত্রশিবির সভাপতি ইউসুফ আলীর সাথে যোগাযোগ করার একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া ছাত্রশিবির সেক্রেটারি রাশেদুল ইসলাম রাফির সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি হোয়াইট অ্যাপে প্রশ্নটি লিখিত আকারে জানাতে বলেন। তবে লিখিত জানানোর পরেই তার কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
জানতে চাইলে প্রভোস্ট কাউন্সিলের সভাপতি এবং খালেদা জিয়া হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. আয়নুল হক আকন্দ বলেন, ‘টিউশনি করে আসতে বা বাজারে যেয়ে ফিরতে দেরি হওয়ায় কোন মেয়ে ঢুকতে পারেনি, দীর্ঘক্ষণ গেটে দাঁড়িয়ে ছিল- এমন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে জানান। এমছাড়া ঢালাওভাবে এভাবে বলার সুযোগ নেই। তবে শিক্ষার্থীরা যদি সান্ধ্য আইন বা এই নিয়ম-কানুন যদি না চায়, তাহলে কর্তৃপক্ষের কাছে বলতে পারো যে স্যার, আমরা এটা চাই না। এটাতে হল কর্তৃপক্ষ কিছু করতে পারবে না। আর কোড অব কন্ডাক্টের ব্যাপারে আপনি প্রশাসনের সাথে কথা বলেন।’
এ বিষয়ে এক অনুষ্ঠানে ইবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, ‘সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের লক্ষ্য করেছি যে, সান্ধ্য আইন নামে একটি আইন বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে অথবা হতে যাচ্ছে, এই মর্মে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা করা হয়েছে। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে বলছি, এই মর্মে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন এখনো পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করে নাই, কোনো চিন্তাই করে নাই। যে প্রচারগুলো হয়েছে, এটি একটি গুজব।’
তিনি আরও বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মাঝে বিভ্রান্তি তৈরি করার চেষ্টায় অনেক গুজব নিউজ পরিবেশন করা হয়। আমি আশা করব, একজন শিক্ষার্থী হিসেবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্যায়ের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে, এই নিউজগুলোর সত্যতা, এর ডকুমেন্ট এবং এর ভিত্তি এটি নিশ্চিত না হয়ে এই জাতীয় কার্যক্রমের সাথে শিক্ষার্থীরা সম্পৃক্ত হবে না—এটিই শিক্ষার্থীদের প্রতি আমার আহ্বান।’