২১ অক্টোবর ২০২৬, ২০:৪৯

মৃত ব্যক্তিকেও ভোটার তালিকায় রাখার অভিযোগ, স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন

কুআর লোগো  © টিডিসি সম্পাদিত

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের (কুআ) কার্যনির্বাহী পরিষদ নির্বাচন ২০২৬-এর ভোটার তালিকায় গুরুতর অনিয়ম ও নিরাপত্তা ত্রুটির অভিযোগ উঠেছে। তালিকায় মৃত ব্যক্তিকেও রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য ও অ্যালামনাই অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন। গত ১৮ অক্টোবর অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. এস‌এম রফিজুল হকের কাছে লিখিতভাবে এই অভিযোগ দায়ের করেছেন তিনি। এতে বাল্ক পেমেন্ট, সদস্য নবায়নে পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই না করা এবং নিরপেক্ষতা নিয়ে নানা প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন ড. মামুন।

অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন খুবির বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ডিসিপ্লিনের ১৯৯৬ ব্যাচের শিক্ষার্থী। বর্তমানে তিনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান। এর আগে তিনি স্কুল অব লাইফ সায়েন্সেসের ডিনের দায়িত্ব পালন করেছেন।

কুআর প্রধান নির্বাচন কমিশনার বরাবর দেওয়া আবেদনে বলা হয়েছে, স্বতন্ত্র গ্র্যাজুয়েটদের সম্মতি ব্যতিরেকে অননুমোদিত এককালীন (বাল্ক) অর্থপ্রদান, টু-ফ্যাক্টর বা ওটিপি যাচাইকরণ না থাকার ফলে একই তথ্য একাধিকবার ব্যবহৃত হওয়া এবং খসড়া প্রকাশের পর ভোটার নিবন্ধনের সময়সূচি পুনঃনির্ধারণের মতো বিষয়গুলোর কারণে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

অভিযোগপত্রে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ এবং বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশ যুক্ত করে অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মামুন লিখেছেন, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচনের মূল নীতি সমুন্নত রাখতে, চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পূর্বেই তাৎক্ষণিকভাবে এই বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে আমি নির্বাচন কমিশনের প্রতি বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।

বিশদ অভিযোগপত্রে অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মামুন লিখেছেন, অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ের বাইরে ডিসিপ্লিনের উদ্যোগে গ্র্যাজুয়েটদের সম্মতি ছাড়াই বাল্ক পেমেন্টের মাধ্যমে যেভাবে ভোটার করা হয়েছে এটা অনৈতিক এবং নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এই প্রক্রিয়ায় ৩০ সেপ্টেম্বর ভোটার করা হয়েছে এবং ১৬ অক্টোবরও একই কাজ করা হয়েছে। এটা করতে গিয়ে মৃত ব্যক্তির নামে পেমেন্ট করে ভোটার দেখানো হয়েছে।

তিনি লিখেছেন, এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন যে যুক্তি দেখিয়েছে তা অবিশ্বাস্য। তারা বলেছেন, ‘নির্বাচন কমিশন পর্যবেক্ষণ করেছে যে গতনতন্ত্রে কুআর সদস্যদের বার্ষিক চাঁদা প্রদানের কোনো সুস্পষ্ট পদ্ধতির উল্লেখ নেই।’ শুধুমাত্র এই কারণে যদি বাল্ক পেমেন্ট অনুমোদন করা হয় তাহলে নির্বাচনী বিধিমালায় উল্লেখ করেননি কেন? প্রকৃতপক্ষে এটা আইনত বৈধ হতে পারে না। এর মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন কিছু কিছু ডিসিপ্লিনকে একচেটিয়া সুযোগ দিয়েছে।

তিনি আরও লিখেছেন, বাল্ক ভোটার বাল্ক ভোটের সুযোগ তৈরি করেছে। আমরা দেখেছি যে কেউ অন্যজনের আইডি খুলে ভোটার করতে পেরেছে। এখানে ইমেইল বা মোবাইলে ওটিপির মাধ্যমে ভেরিফিকেশন সিস্টেম ছিল না। খসড়া ভোটার তালিকায় একই মোবাইল বা ইমেইলে একাধিক আইডির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সুতরাং বলাই যায় বাল্ক ভোটার করা হয়েছে নির্বাচনে একচেটিয়া বাল্ক ভোটের সুযোগ নেওয়ার জন্য।

জানা গেছে, কুআ নির্বাচনের খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয় গত ৩ অক্টোবর। তবে একদিন পর নতুন করে পুনঃতফসিল ঘোষণা করে ভোটার বানানো হয়েছে উল্লেখ করে অধ্যাপক মামুন লিখেছেন, এটি পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন। এতে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হয়েছে এবং নির্বাচন কমিশন তার নিরপেক্ষতা হারিয়েছে।

অভিযোগপত্রে ৫টি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা ও দাবিও তুলে ধরেন অধ্যাপক মামুন। এগুলো হলো—বাল্ক পে বা ম্যানুয়াল এন্ট্রির ভোটার বাতিল, বর্ধিত সময়ে ভোটার তালিকায় যুক্ত হওয়া সদস্যদের ভোটাধিকার স্থগিত, ডুপ্লিকেট ক্রেডেনশিয়াল ক্লিনিং, গ্রাজুয়েট ভেরিফিকেশন নিশ্চিতকরণ এবং ভোটগ্রহণ তৃতীয় পক্ষের কাছে অপর্ণ করা।

বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে তিনি লিখেছেন, সিস্টেমের বাইরে গিয়ে অসচ্ছ প্রক্রিয়ায় বা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে একযোগে ফি পরিশোধ করে হালনাগাদ করা আইডিগুলোর ভোটাধিকার স্থগিত করা হোক এবং কেবল স্বচ্ছ অনলাইন মাধ্যমে নিজস্ব উদ্যোগে ফি প্রদানকারীদের বৈধ ভোটার তালিকায় রাখা হোক। ভোটার বৃদ্ধির সময় প্রদান অনৈতিক হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই সময়েও বাল্ক পেমেন্ট গ্রহণ করা হয়েছে। এমনসময়ে যারা ভোটার হয়েছে তাদের ভোটাধিকার স্থগিত রাখতে হবে।

অধ্যাপক মামুন আরও লিখেছেন, একই মোবাইল নম্বর অথবা একই ইমেইল অ্যাড্রেস ব্যবহার করে একাধিক মেম্বারশিপ বা ভোটার আইডি নিবন্ধিত হয়ে থাকলে, তাৎক্ষণিকভাবে সেগুলো স্ক্রিনিং করে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হোক। একই সাথে খসড়া তালিকা থেকে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পূর্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তর বা সেন্ট্রাল ডেটাবেজের সঙ্গে ব্যাচের স্টুডেন্ট আইডি ও গ্র্যাজুয়েশন স্ট্যাটাস কঠোরভাবে যাচাই করা হোক।

প্রস্তাবনায় তিনি আরও লিখেছেন, অনলাইন ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়াটি কোন প্ল্যাটফর্ম বা কারিগরি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করবে তা দ্রুত জনসমক্ষে প্রকাশ করা হোক এবং স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে কোনো তৃতীয় পক্ষ প্রতিষ্ঠানকে এই দায়িত্ব অর্পণ করা হোক।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. এস‌এম রফিজুল হক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, মৃত ব্যক্তি ভোটার তালিকায় যুক্ত হওয়ার বিষয়টি আগের। এর মধ্যে অনেকবার এই তালিকা আপডেট করা হয়েছে। তবে তিনি বিস্তারিত কথা বলতে রাজি হননি। নির্বাচন কমিশনের মুখপাত্র ড. এ টি এম মাসুদ রেজার সঙ্গে কথা বলতে বলেন।

জানতে চাইলে কুআ নির্বাচন কমিশনের মুখপাত্র ড. এ টি এম মাসুদ রেজা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘উনি (ড. মামুন) যেটা প্রথম বুঝতেছেন না, আমরা অনেকবার ক্লিয়ার করছি—মেম্বার করা আর ভোটার করা আলাদা জিনিস। মেম্বার তো করবে এক্সিকিউটিভ কমিটি। ওনার যে কোশ্চেনগুলো আছে, এটা উৎস করা উচিত এক্সিকিউটিভ কমিটি থেকে। ওনারা আমাদেরকে দেবে যে এই কয়জন জেনারেল মেম্বার, আর এই কয়জন লাইফ মেম্বার। আমাদেরকে যেটা দিবে, আমরা সেটাকে প্রাথমিক যাচাই-বাছাই করব। অনেকেই ভুল করে। এগুলো আমরা দেখব। এর ভেতরে আমরা অলরেডি অনেকগুলো যাচাই-বাছাই করেছি। এভাবে আমরা ৯৬ জনকে ভোটার আইডি দেইনি।

মৃত ব্যক্তি ভোটার তালিকায় আসার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এই কথাটা এর আগেও একবার বলেছিলেন। তবে এটা ওনাকে বলা লাগেনি, আমরা ধরেছিলাম। আমরা দেখেছি যে এখানে বেশ কিছু নাম্বার আছে, যেগুলোতে এই নাম বা নাম্বারের এগেইন্সে তথ্য নাই। সেই হিসেবে গতবার ১০০-এর উপরে আইডিতে আমরা নোটিশ করেছিলাম।

ড. এ টি এম মাসুদ রেজা বলেন, সবচেয়ে বড় কথা, কুআর কনস্টিটিউশনে কোনো উপধারা বা বিধি তারা তৈরি করে নাই, নির্বাচনী বিধি। সেটা আমরা যথাসময়ে রিপোর্ট করব। কোথায় কোথায় অ্যানোমালিস আছে, সেগুলো আমরা রিপোর্ট করব।

তিনি আরও বরেন, কুআর সার্ভারে আমাদের নির্বাচন হচ্ছে না। আমাদের এটা আলাদা সার্ভার, আলাদা সিস্টেম। আমরা খালি ওনাদের থেকে ইমেইল আর নাম নিচ্ছি। অতএব, এখানে অনেকে কনফিউশন হতেই পারে।