১১ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:৪৩

কুবির হলে এক রুমে থাকেন ৮-১০ জন, অনাবাসিক ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়   © টিডিসি ফটো

টিউশনের আয় কিংবা বাড়ি থেকে পাওয়া অর্থের বড় একটি অংশ চলে যায় মেসভাড়া, খাবার ও যাতায়াতের পেছনে। ক্যাম্পাসের বাইরে থাকলে নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তা, আর হলে উঠতে পারলেও মিলছে না স্বস্তির আবাসন। চারজনের জন্য নির্ধারিত কক্ষে থাকতে হচ্ছে ৮ থেকে ১০ জনকে। কারও ঠাঁই হচ্ছে মেঝেতে, কারও ভাগে জুটছে না পড়ার টেবিলটুকুও। এই চিত্র কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকটের। 

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ২০ বছর পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ শিক্ষার্থীর জন্য আবাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়নি। ফলে আবাসন সংকটের চাপ সামলাতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের বাড়তি অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি ব্যাহত হচ্ছে পড়াশোনা, ঘুম ও স্বাভাবিক জীবনযাপন।

জানা গেছে, বর্তমানে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৬ হাজার ৪৮৪ জন। এর বিপরীতে পাঁচটি আবাসিক হলে আসন রয়েছে এক হাজার ২৩৯টি। অর্থাৎ মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ১৯ দশমিক ১১ শতাংশের জন্য আবাসন ব্যবস্থা রয়েছে। আবাসন নেই ৫ হাজার ২৪৫ জন শিক্ষার্থীর। অর্থাৎ, ৮০ দশমিক ৮৯ শতাংশ শিক্ষার্থী অনাবাসিক।

রেজিস্ট্রার দপ্তরের তথ্যমতে, পাঁচটি আবাসিক হলে নির্ধারিত আসনের বিপরীতে অবস্থান করছেন ১ হাজার ৫৬২ জন শিক্ষার্থী। অর্থাৎ, আসনের তুলনায় অতিরিক্ত ৩২৩ জন শিক্ষার্থী হলে থাকছেন।

হলভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, কাজী নজরুল ইসলাম হলে ১৮০টি আসনের বিপরীতে ২১০ জন, বিজয়-২৪ হলে ৪৬০টি আসনের বিপরীতে ৫২০ জন, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হলে ১৪৬টি আসনের বিপরীতে ১৭০ জন, নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী হলে ১৯৭টি আসনের বিপরীতে ২৯৬ জন এবং সুনীতি-শান্তি হলে ২৫৬টি আসনের বিপরীতে ৩৬৬ জন শিক্ষার্থী অবস্থান করছেন।

আসনের তুলনায় শিক্ষার্থী বেশি হওয়ায় আবাসিক হলগুলোতে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে অনেককে। কোথাও একই বিছানা ভাগাভাগি করে থাকতে হচ্ছে, কোথাও মেঝেতে বিছানা পেতে রাত কাটাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। চারজনের থাকার উপযোগী কক্ষে ৮ থেকে ১০ জনকে থাকতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। এতে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত পরিসর ও স্বাভাবিক পড়াশোনার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।

অন্যদিকে চার হাজার ৯২২ জন শিক্ষার্থীকে হলের বাইরে বাড়ি থেকে এসে কিংবা মেসে থেকে পড়াশোনা করতে হচ্ছে। অর্থাৎ মোট শিক্ষার্থীর ৭৫ দশমিক ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী হলের বাইরে থাকছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস দূরে হওয়ায় বাড়িতে আসা ও আশপাশের বিভিন্ন মেসে থাকতে হওয়ায় শিক্ষার্থীদের আবাসন ব্যয়ের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়েও দুশ্চিন্তায় থাকতে হচ্ছে। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে। এ ছাড়া কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা এবং বিভিন্ন সময়ে চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনায় ক্যাম্পাসের বাইরে বসবাসকারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী রাহাত আকন্দ মনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রায় সাত মাস হয়ে গেছে। বাইরে থাকার কারণে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। একটু রাত হলে, ৭টা বা ৮টা বাজলেই নিরাপত্তা নিয়ে ভয় লাগে। বিভিন্ন জায়গায় ছিনতাই ও হত্যার ঘটনা ঘটছে।’ তিনি জানান, কয়েক দিন আগে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এক শিক্ষকের ছেলেকে ক্যাম্পাসের পাশেই হত্যা করা হয়েছে। এ কারণে শঙ্কার মধ্যে আছেন তারা।

শুধু নতুন শিক্ষার্থীরাই নন, দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন– এমন শিক্ষার্থীদেরও আবাসিক হলে আসন পেতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফাইরোজ মাহি বলেন, ‘দেড় বছর হয়ে গেছে, এখনো হলে কোনো সিট পাইনি। আমাদের যে হলগুলো রয়েছে, সেগুলোতে সিট পাওয়া প্রায় অসম্ভব। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসন সংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের ভর্তুকি দেওয়া হয়। আমাদেরও যদি এ ধরনের ভর্তুকির ব্যবস্থা থাকত, তাহলে ভালো হতো।’

উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করীমের ভাষ্য, এটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় নয়। ফলে এখানে সবার আবাসন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
তবে দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের হলগুলো চালু হলে আবাসন সংকট থাকবে না বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন উপাচার্য। তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয় ক্যাম্পাসে আমাদের চারটি হল রয়েছে। প্রতিটি হলেই প্রায় এক হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। হলগুলো চালু হলে আমাদের আবাসন সংকট তো থাকবেই না; বরং অতিরিক্ত রুম ফাঁকা পড়ে থাকবে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন ২০০ একরের নতুন ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের জন্য ১০ তলার চারটি আবাসিক হল নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। নতুন হলগুলোর কাজ সম্পন্ন হলে আরও চার হাজার ২০৬টি আসন বৃদ্ধি পাবে বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।