স্বচ্ছ পানির নান্দনিকতা হারিয়ে বেহাল ইবির একমাত্র লেক
স্বচ্ছ পানির নান্দনিকতা হারিয়ে বহুবিধ দূষণ, কচুরিপানা আর প্লাস্টিক বর্জ্যে প্রাণ যায় যায় অবস্থা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র লেকের। দীর্ঘদিন যাবৎ পরিচর্যার অভাবে ক্রমেই বেড়েছে দূষণের পরিমাণ, নষ্ট হচ্ছে পানি ও আশপাশের পরিবেশ। এতে একসময় শিক্ষার্থীদের মন-মানসিকতা সতেজক হিসেবে কাজ করা লেকটি ক্রমেই হারাচ্ছে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ। একসময় লেকটি ঘিরে অতিথি পাখির আনাগোনা থাকলেও এখন যেন তা শুধুই অতীত। বাজেট না থাকার দোহাই দিয়ে লেকের প্রাণচাঞ্চল্যের বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছে প্রশাসন।
ক্যাম্পাসের পশ্চিম পাশে প্রকৌশল ভবন ও মেডিকেলের পেছনে অবস্থিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র লেকটি দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের পদচারণামুখর আড্ডাস্থল। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠালগ্নে ‘ইবি লেক’ নামে পরিচিত এ জলাশয় পরবর্তী সময়ে ‘মফিজ লেক’ নামে ব্যাপক পরিচিতি পায়। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর লেকটির নাম পরিবর্তন করে ‘মীর মুগ্ধ সরোবর’ রাখা হয়।
একসময় স্বচ্ছ পানিতে মাছের বিচরণ, অতিথি পাখির কলকাকলি, দৃষ্টিনন্দন সেতুর আলো আর শিক্ষার্থীদের আড্ডায় মুখর থাকা লেকটি এখন কচুরিপানায় ঢেকে গেছে। চড়ুইভাতি আর পিকনিকের পর ফেলে যাওয়া প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন ও খাবারের প্লেট আর আশপাশের ময়লা বাড়াচ্ছে পানি দূষণের পরিমাণ। ফলে একসময়ের নান্দনিক এ জলাশয় হারাচ্ছে তার সৌন্দর্য ও পরিবেশগত বৈচিত্র্য।
কয়েক বছর আগে আকিজ গ্রুপের অর্থায়নে লেকের ওপর একটি দৃষ্টিনন্দন সেতু, উত্তর-পশ্চিম পাশে একটি ওয়াচ টাওয়ার এবং লেকের পাশে বসার স্থান তৈরি করা হয়। একই সময়ে লেকটি পরিষ্কারও করা হয়েছিল। সেতুতে লাইটিং থাকায় সন্ধ্যার পর লেকের সৌন্দর্য আরও বেড়ে যেত। পরিষ্কার পানি, আশপাশের পরিবেশ ও রাতের সৌন্দর্যের কারণে অনেকেই লেকটিকে ‘ইবির হাতিরঝিল’ নামে অভিহিত করতেন। শীতকালে এখানে ছিল অতিথি পাখির ব্যাপক আনাগোনা। রাতে লেকের সৌন্দর্য প্রতিনিয়ত কাছে ডাকতো শিক্ষার্থীদের। বাইরে থেকে কোন অতিথি এলে একবারের জন্য হলেও ঘুরে আসতেন ইবির এই লেক পাড় দিয়ে।
লেকের কচুরিপানা পরিষ্কার করতে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। সাধারণ শ্রমিকরা পানিতে নেমে এ কাজ করতে চান না। এ জন্য কচুরিপানা পরিষ্কারে জেলেদের প্রয়োজন হয়, আর তারা এ কাজের জন্য তুলনামূলক বেশি পারিশ্রমিক দাবি করেন—মোহাম্মদ আলাউদ্দিন, প্রধান কর্মকর্তা এস্টেট অফিস ইবি
এতসব সৌন্দর্যের কারণে ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের আড্ডা, চড়ুইভাতি ও পিকনিকের প্রধানতম স্থান হয়ে ওঠে ইবির এই লেকটি। আর তারপর থেকেই বাড়তে থাকে দূষণের পরিমাণ। সরজমিনে দেখা যায়, এসব আয়োজনের পর ফেলে যাওয়া প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, খাবারের প্যাকেট ও অন্যান্য বর্জ্য লেকের আশপাশে যত্রতত্র পড়ে আছে। এতে লেকের পরিবেশ ও পানির স্বাভাবিক সৌন্দর্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি প্লাস্টিক দূষণও বাড়ছে। এছাড়া দীর্ঘদিন পরিচর্যা না করায় বেড়েছে কচুরিপানার পরিমাণ। এখন এমন অবস্থা হয়েছে যে, কচুরিপানার চোটে পানির দেখা পাওয়াই দায়। লেকের আশপাশও ভরে গেছে ঝোপঝাড়ে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতা আর শিক্ষার্থীদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা লেকের এই করুণ অবস্থার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী। শিক্ষার্থীদের অসচেতন আচরণের কারণে একদিকে যেমন দূষণের পরিমাণ বেড়েছে তেমনি সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতায় লেকটি হারিয়েছে তার নিজস্ব সৌন্দর্য। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা না থাকায় বেড়েছে মশা ও সাপের উপদ্রব। এসব কারণে লেকে এখন আর আগের মতো নেই শিক্ষার্থীদের আনাগোনা। উপযুক্ত পরিবেশ না থাকায় হারিয়েছে অতিথি পাখিদের আগমনও।
অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী মোবারক বলেন, ‘একসময় লেকের সৌন্দর্য সবাইকে বিমোহিত করত। আমরা মজা করে ইবির হাতিরঝিল ডাকতাম। মজার ছলে বললেও কথাটা সত্যি। রাতের লাল-নীল আলোয় সাজানো ব্রিজ, পরিষ্কার পানিতে মাছের সাঁতার কাটা, শীতের সময়ে অতিথি পাখির কিচিরমিচির এসবে বিষাদগ্রস্ত মনও ভালো হয়ে যেত। কিন্তু লেকের সেই অবস্থা এখন আর নেই। অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার কারণে একসময়ের দৃষ্টিনন্দন লেকের অবস্থা করুণ হয়ে গেছে। কচুরিপানায় ভরে গেছে লেক, ঝোপঝাড়ে ছেয়ে গেছে আশপাশ। কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানাই, লেকটির সঠিক পরিচর্যা করে শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দিন।’
আরও পড়ুন: ক্যান্টিন থেকে পরিচ্ছন্নতা—ঢাবির ৫ নারী হলে কাজ করছেন পুরুষ স্টাফ-ক্যান্টিন বয়রা
জার্নালিজম বিভাগের শিক্ষার্থী সিনথিয়া বলেন, লেক তো ক্যাম্পাসের সবচেয়ে সুন্দর স্থান হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এই জায়গাটি বর্তমানে পরিত্যক্ত পুকুর মনে হয়। লেকের পানিতে এত কচুরিপানা। চারপাশে এত আগাছা জঞ্জাল দেখে মনে হয় কোনো জঙ্গলে চলে এসেছি। আগাছা জঞ্জাল অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় সাপ, পোকামাকড়ের ভয়ও বেড়েছে। পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এখন আর জায়গাটি যাওয়ার উপযোগী নয়। অথচ প্রশাসন চাইলেই লেকটি পরিষ্কার করে আবার সকল শিক্ষার্থীদের যাওয়ার উপযোগী করে তুলতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় এরিয়ার মধ্যে লেকের এরকম বেহাল অবস্থা আর প্রশাসনের সেই ব্যাপারে উদাসীনতা সত্যিই মানা যায় না।
জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট অফিস প্রধান মোহাম্মদ আলাউদ্দিন বলেন, লেকের কচুরিপানা পরিষ্কার করতে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। সাধারণ শ্রমিকরা পানিতে নেমে এ কাজ করতে চান না। এ জন্য কচুরিপানা পরিষ্কারে জেলেদের প্রয়োজন হয়, আর তারা এ কাজের জন্য তুলনামূলক বেশি পারিশ্রমিক দাবি করেন। লেকটি পরিষ্কার করতে ন্যূনতম এক লাখ টাকা প্রয়োজন হবে। বর্তমানে বৃষ্টি না হলে খুব দ্রুত লেকের পানি শুকিয়ে যাবে। তখন কচুরিপানাগুলো তুলে তুলনামূলক কম খরচে লেকটি পরিষ্কার করা সম্ভব হবে।