মানসিক চাপে বাড়ছে আত্মহত্যার প্রবণতা, ক্যাম্পাসে নেই স্থায়ী কাউন্সেলিং সেবা
প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থীর গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (গোবিপ্রবি) নেই স্থায়ী কাউন্সেলিং ব্যবস্থা। মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা ব্যক্তিগত সমস্যায় পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই কোনো পেশাদার কাউন্সেলর বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের নিয়মিত সেবা। বিভাগভিত্তিক ছাত্র উপদেষ্টা থাকলেও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ নেই।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পড়াশোনার চাপ, পরীক্ষার ফল, চাকরির প্রস্তুতি, পারিবারিক সমস্যা, আর্থিক সংকট, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তাসহ নানা কারণে অনেকেই মানসিক চাপে থাকেন। কেউ কেউ বন্ধু বা পরিচিতদের সঙ্গে এসব বিষয় নিয়ে কথা বললেও প্রয়োজনের সময় পেশাদার সহায়তা পান না।
শিক্ষার্থীদের মতে, মানসিক সমস্যাকে শারীরিক অসুস্থতার মতোই গুরুত্ব দেওয়া দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্দিষ্ট কাউন্সেলিং কক্ষ, গোপনীয়তা রক্ষা করে পরামর্শ নেওয়ার ব্যবস্থা এবং প্রয়োজন হলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা থাকলে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কারণে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি। এ সময় একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ পেলে কিছুটা হলেও ভালো অনুভব করা সম্ভব। শরীর অসুস্থ হলে যেমন চিকিৎসা দরকার, তেমনি মন অসুস্থ হলেও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ প্রয়োজন। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়া উচিত।’
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৩ ডিসেম্বর ইতিহাস বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ইয়াসমিন খাতুন আত্মহত্যা করেন। ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষার্থীদের আবদুল্লাহ আল নোমান গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। ২০২৬ সালের ১৬ মার্চ বাংলা বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী দীপা দাশ ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। ২০২২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি অর্থনীতি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী পল্লবী মন্ডল আত্মহত্যা করেন। ২০২০ সালের ১০ অক্টোবর ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মনীষা হীরা আত্মহত্যা করেছেন।
এ ছাড়া ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের (২০১৯-২০) শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী রিক্তা খানম ওরফে নোভার আত্মহত্যা করেন। ২০২৩ সালের ১২ জুলাই আইন বিভাগের (২০১৬-১৭) শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী অনুপম শিকদার আত্মহত্যা করেন।
সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৪০৩ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন। তাঁদের মধ্যে ২০ শতাংশের বেশি ছিলেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে গোবিপ্রবিতে এখনো চালু হয়নি স্থায়ী কাউন্সেলিং সেবা।
গোবিপ্রবির মেডিকেল অফিসার ডা. লিখন চন্দ্র বালা বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা প্রায়ই নানা ধরনের সমস্যা নিয়ে আমাদের কাছে আসেন। কিন্তু প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া ছাড়া আমাদের তেমন কিছু করার সুযোগ নেই। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে সাইকিয়াট্রিস্ট ও সাইকোলজিস্ট প্রয়োজন। মানসিক স্বাস্থ্যও খুব গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সময় দিয়ে কথা শোনা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া দরকার।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রে শারীরিক অসুস্থতার চিকিৎসা দেওয়া হলেও মানসিক সমস্যার জন্য আলাদা কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা নেই। ফলে কোনো শিক্ষার্থী মানসিক সমস্যায় পড়লে তাঁকে নিজের উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে গিয়ে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হয়। আবার অনেক শিক্ষার্থী মানসিক সমস্যার কথা অন্যদের জানাতেও স্বস্তি বোধ করেন না।
গোবিপ্রবির মনোবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান সানজিদা কবির বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসে একজন শিক্ষার্থী নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হন। পড়াশোনা, পরিবার, ভবিষ্যৎ ও ব্যক্তিগত নানা বিষয় নিয়ে তাঁদের ওপর মানসিক চাপ তৈরি হয়। তাই শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। আমরা এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে একাধিকবার জানিয়েছি। বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, অতিরিক্ত মানসিক চাপ একজন শিক্ষার্থীকে ভুল বা কঠিন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার দিকে ঠেলে দিতে পারে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগভিত্তিক ছাত্র উপদেষ্টা থাকলেও তাঁদের দায়িত্বের মধ্যে পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার বিষয়টি নেই। ফলে মানসিক সমস্যায় পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো জায়গা বা প্রশিক্ষিত ব্যক্তির কাছে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়নি।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা পেশাদার কাউন্সেলর নিয়োগের বিষয়ে গোবিপ্রবির ছাত্র উপদেষ্টা ও নির্দেশনা দপ্তরের পরিচালক সহযোগী অধ্যাপক গাজী মাহবুব বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে এ ধরনের কোনো পদ নেই। নতুন করে নিয়োগ দিতে গেলে প্রশাসনিক কিছু জটিলতা রয়েছে। তবে শিক্ষার্থীরা চাইলে বিষয়টি প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। এ ছাড়া, শিক্ষার্থীদের সমস্যা ও মতামত জানানোর জন্য বিভাগভিত্তিক ছাত্র উপদেষ্টা রয়েছে।’