২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:২৫

ক্যাম্পাসের পাশেই পুলিশ ফাঁড়ি চায় কুবি শিক্ষার্থীরা

অপ্রতিম হত্যার বিচার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ  © টিডিসি ফটো

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে (১৩) হারিয়ে শোক, নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষোভে ফুঁসছে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার। অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর রবিবার জানাজা ও দাফন শেষে হত্যার বিচার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

এ সময় তারা চার দফা দাবি উত্থাপন করেছে। দাবিগুলোর মধ্যে অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ডে জড়িতে সকলের শাস্তি, প্রশাসনের ব্যার্থতা স্বীকার করে কুমিল্লা পুলিশ সুপার, আদর্শ সদর এবং সদর দক্ষিণ থানার ওসিদের প্রত্যাহার, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার জন্য স্থায়ী একটি পুলিশ ফাঁড়ি প্রতিষ্ঠা ও রাষ্ট্রে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় দৃশ্যমান পদক্ষেপ এবং নিখোজ ব্যক্তিদের নিরাপত্তার জন্য তাৎক্ষণিক রেসপন্স ইউনিট গঠন।

প্রথম জানাজা শেষে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে কোটবাড়ি বিশ্বরোডের দিকে এগিয়ে যান শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘অপ্রতিমের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন। পরে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে তারা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কোটবাড়ি বিশ্বরোড এলাকা অবরোধ করেন। 

পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আরাফ ভূইয়া বলেন, এটা সম্পূর্ণই পুলিশ প্রশাসনের ব্যর্থতা। পুলিশ বলে, ক্লু পেয়েছি; কিন্তু কী ক্লু তারা পেয়েছে, সেটা আমরা জানি না। এই ব্যর্থতার দায় যতক্ষণ না তারা নেবে, আমরা ততক্ষণ রাস্তায় আছি।

ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী সাদিকুর রহমান বলেন, আমরা আজ কেবল অপ্রতিমের জন্য এখানে আসিনি। কুমিল্লায় এমন ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। আমরা অপ্রতিমের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

গত শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কুমিল্লার কোটবাড়ি গন্ধমতি এলাকার বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয় অপ্রতিম। এরপর তার আর সন্ধান পাওয়া যায়নি। ওই দিনই তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার সদর দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন।

পরে পরিবার, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন স্থানে তার সন্ধানে তল্লাশি চালায়। প্রায় ২১ ঘণ্টা পর শনিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ঘেঁষা সানন্দা এলাকার একটি জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার মাথায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। এ ঘটনায় কয়েকজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলছে।

রবিবার সকাল ১০টায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে অপ্রতিমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্বজন ও স্থানীয়রা অংশ নেন। জানাজার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. আব্দুল হাকিম অপ্রতিম হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার এবং শিক্ষার্থী ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।

পরে গন্ধমতি ঈদগাহে অপ্রতিমের দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে বাসার পাশের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। 

দাফনের আগে অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, ‘আমার আর নতুন করে কিছু বলার নেই। আমি কেবল আমার সন্তান হত্যার উপযুক্ত বিচার দেখতে চাই। আমার মাত্র ১৩ বছর বয়সী নিষ্পাপ ছেলেটা কোনো অপরাধ করেনি। তবে কেন তাকে এভাবে প্রাণ দিতে হলো? এই মুহূর্তে আমি শুধু ঘাতকদের কঠোর বিচার চাই।’

ছেলেকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন অপ্রতিমের মা ড. নাহিদা বেগম। তিনি বলেন, ‘ও-ই ছিল আমাদের সব। ওকে ঘিরেই আমাদের কত স্বপ্ন ছিল, কত পরিকল্পনা ছিল। আজ ঘরে ওর বই-খাতা আছে, বিছানায় ওর জিনিসপত্র আছে, কিন্তু ও নেই। আমরা কীভাবে এই শূন্যতা মেনে নেব, জানি না।’

অপ্রতিমের মৃত্যু ঘিরে নতুন করে সামনে এসেছে তার মা ড. নাহিদা বেগমের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করা বিভিন্ন পোস্টও। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় কুমিল্লার কোটবাড়ি বিশ্বরোডে শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি, টিয়ারশেল ও লাঠিচার্জের প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি আহত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর কথা জানান এবং নিরাপত্তার প্রয়োজনে শিক্ষার্থীদের সহায়তার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

শিক্ষার্থীদের অধিকার ও নিরাপত্তার পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়া সেই শিক্ষিকার একমাত্র সন্তান অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ড এখন কুবি ক্যাম্পাসে গভীর শোকের পাশাপাশি নিরাপত্তা ও বিচার নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের দাবি হলো, ঘটনার নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে হত্যার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।