প্রতিষ্ঠার দুই দশক পেরিয়ে গেলেও কুবিতে নেই ডে-কেয়ার সেন্টার
প্রতিষ্ঠার দুই দশক পেরিয়ে গেলেও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের শিশু সন্তানদের জন্য নেই কোনো ডে-কেয়ার সেন্টার। ফলে সন্তানদের দেখাশোনার পাশাপাশি একাডেমিক ও দাপ্তরিক দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে বিশেষ করে নারী শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পড়তে হচ্ছে নানা ভোগান্তিতে।
এতে ক্লাস-পরীক্ষা ও নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রমে মনোযোগ ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০০৬ সালে কুমিল্লার ঐতিহাসিক শালবন বিহারের পাশে প্রতিষ্ঠিত হয় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। সময়ের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসর ও কার্যক্রম বিস্তৃত হলেও শিশুদের নিরাপদ যত্নের জন্য এখনো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে সন্তানদের কখনো বাসায় রেখে, কখনো সঙ্গে নিয়ে ক্যাম্পাসে এসে একাডেমিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হচ্ছে অনেক মাকে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘ সময়ের ক্লাস বা পরীক্ষার সময় শিশুদের দেখাশোনার বিষয়টি তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। পরিবারে সহায়তার সুযোগ না থাকলে অনেককে সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে ক্যাম্পাসে আসতে হয়। এতে একদিকে যেমন শিশুর নিয়মিত খাবার ও ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে, অন্যদিকে মায়েরাও ক্লাস ও অন্যান্য কাজে পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারেন না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম বলেন, ‘কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে নারী শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষকদের কল্যাণে ডে-কেয়ার সেন্টার না থাকা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়। একজন কর্মজীবী মায়ের জন্য এটি মাতৃত্ব ও পেশাগত দায়িত্বের মধ্যে সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি করে। একই সঙ্গে শিশুর যত্নের নিশ্চয়তা, কর্মদক্ষতা ও মানসিক স্বস্তি বাড়ানোর পাশাপাশি পরোক্ষভাবে পেশাগত অগ্রগতিতেও ভূমিকা রাখে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে নানাদিক থেকে সম্প্রসারিত হচ্ছে। তাই একটি মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে ডে-কেয়ারকে সুযোগ নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। আশা করি, বর্তমান প্রশাসন অতি শিগগিরই একটি স্বাস্থ্যকর ডে-কেয়ার সেন্টার চালুর উদ্যোগ নেবে এবং নারী-বান্ধব শিক্ষা ও কর্মপরিবেশ তৈরিতে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।’
লোক-প্রশাসন বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী কামরুন্নেছা নুসরাত বলেন, ‘দীর্ঘ সময়ের ক্লাস হলে শিশুকে বাসায় রেখে আসা সম্ভব হয় না। আবার ক্যাম্পাস দূরে হওয়ায় পরিবারের সদস্যদেরও সবসময় সঙ্গে রাখা সম্ভব হয় না। ফলে বাধ্য হয়ে সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে আসতে হয়। এতে শিশুর খাবার ও ঘুমের সময় ঠিক থাকে না, আর ক্লাসে মনোযোগ ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে। এতে মা ও শিশু দুজনেরই মানসিক চাপ বাড়ে।’
তিনি বলেন, ‘আমার পরিচিত কয়েকজন শিক্ষার্থী সন্তান সামলানোর কারণে নিয়মিত ক্লাস করতে পারেন না। এতে তাদের উপস্থিতি নিয়েও সমস্যায় পড়তে হয়। মাতৃত্বকালীন ছুটির পাশাপাশি যদি ডে-কেয়ারে কেয়ারটেকারের ব্যবস্থা থাকত, তাহলে মায়েদের ভোগান্তি অনেকটাই কমত। সন্তানের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া এখন অনেক মায়ের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।’
আরও দেখুন: গণঅভ্যুত্থানে ইন্টারনেট বন্ধ, সেখান থেকেই স্বাধীন নেটের ভাবনা মাভাবিপ্রবি অধ্যাপকের
একই বিভাগের শিক্ষার্থী উম্মে হাবিনা স্মৃতি বলেন, ‘ডে-কেয়ার থাকলে মায়েরা নিশ্চিন্তে সন্তানকে সেখানে রেখে ক্লাস করতে পারতেন। শিশুকে সময়মতো খাবার খাওয়ানো ও প্রয়োজনীয় যত্ন নেওয়াও সম্ভব হতো। বিশেষ করে যাদের পারিবারিক সহায়তা কম, তাদের জন্য ডে-কেয়ার একটি বড় সহায়তা হতে পারে।’
প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সুমাইয়া জাহান আল আভি বলেন, ‘আমাকে সন্তানকে সঙ্গে নিয়েই ক্লাস করতে হয়েছে। এমনও হয়েছে, সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত একটানা ক্লাস চলেছে, তখনও সন্তানকে সঙ্গে রাখতে হয়েছে। ক্লাসের মাঝে কোনো বিরতি থাকলে সিঁড়িতে বসেই সময় কাটাতে হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সন্তানকে খাওয়ানোর প্রয়োজন হলেও ক্যাম্পাসে কোনো ডে-কেয়ার বা ব্রেস্টফিডিং কর্নার ছিল না। প্রথম বর্ষ থেকে প্রায় ২০২১ সাল থেকেই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে ক্লাস করছি, কিন্তু কোনো ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাইনি। ৬০ শতাংশ ক্লাসে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক হওয়ায় প্রায় প্রতিদিনই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে ক্যাম্পাসে আসতে হয়েছে। বাসা দূরে হওয়ায় যাতায়াতের সমস্যাও মোকাবিলা করতে হয়েছে। গর্ভাবস্থায় মাতৃত্বকালীন ছুটি কিংবা সন্তান জন্মের পর উপস্থিতির ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ সুবিধা না থাকায় অসুস্থ অবস্থাতেও ক্লাসে উপস্থিত হতে হয়েছে।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বেলাল উদ্দীন বলেন, ‘আমরা নারী শিক্ষার্থীদের জন্য একটি স্পেস তৈরি করে দেব। বিবিএ ফ্যাকাল্টির পেছনের জায়গায় বিভিন্ন সুবিধাসম্পন্ন একটি ফিমেল কর্নার তৈরি করা হবে। সেখানে তারা বিশ্রাম নিতে পারবেন, ফ্রেশ হতে পারবেন। নামাজের জায়গা, স্বাস্থ্যসম্মত ওয়াশরুম ও ব্রেস্টফিডিং কর্নারের ব্যবস্থাও থাকবে। তবে আপাতত ডে-কেয়ার সেন্টার চালুর কোনো পরিকল্পনা নেই।’
দুই দশকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো ও একাডেমিক কার্যক্রম বিস্তৃত হলেও নারী শিক্ষার্থী, শিক্ষকদের সন্তানদের জন্য নিরাপদ ও প্রাতিষ্ঠানিক শিশু-যত্নের ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি।