০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩:০৩

হলের কক্ষ-প্রক্টরের গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ শিবির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে

হলের কক্ষ-প্রক্টরের গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ শিবিরের বিরুদ্ধে  © সংগৃহীত

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শহীদ জিয়াউর রহমান হলে ছাত্রদল নেতা কর্তৃক ছাত্রশিবিরের হল সেক্রেটারিকে থাপ্পড় মারার ঘটনায় ওভয়পক্ষের সংঘর্ষ ও দেশীয় অস্ত্রের মহড়ার দিনে সংশ্লিষ্ট হলের একটি কক্ষের জানালার কাচ এবং প্রক্টরের গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ পাওয়া গেছে। 

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা এবং ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, হলের রুম ভাঙচুরে জড়িত ছিলেন হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের মারুফ, শাহ আজিজ হলের শিবির নেতা তানজীল ও অর্থনীতি বিভাগের নাইমুর, আইসিটি বিভাগের রুহি, আইন বিভাগের নাজমুস সাকিব ও হোসনে মোবারক, আল ফিকহ বিভাগের ফয়সাল, আরবী ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের বাকী বিল্লাহ, দাওয়াহ বিভাগের আইনুল, খালেদ সাইফুল্লাহ ও আল হাদীস বিভাগের শাকিল ও ফরিদ।

এছাড়া প্রক্টরের গাড়ি বেরিয়ে যাওয়ার সময় হলের গেট পেরিয়ে কয়েক গজ এগোলে ডানদিক থেকে শিবির কর্মী রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের নাইমকে এবং কিছুটা পেছন থেকে শাকিল আহমেদকে ইট ছুড়ে মারতে দেখা যায়। এর পরপরই নীল টি-শার্ট পরিহিত আরো একজন প্রক্টরের গাড়ি লক্ষ্য করে পেছন থেকে ইট নিক্ষেপ করলেও তা গাড়ি পর্যন্ত পৌঁছায়নি। এসময় আল হাদীস বিভাগের জুনায়েদ, আইন বিভাগের সাকিব, ল ল্যান্ড বিভাগের মতিউর ও জয় কে ইটের টুকরা হাতে দেখা গেছে বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা।

ঘটনার সূত্রপাত শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ইবির শহীদ জিয়াউর রহমান হলের নীচ তলার করিডোরে। হলের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, হল শিবিরের সেক্রেটারি কাজী জুহায়ের হলের করিডোর দিয়ে ক্র‍্যাচে ভর দিয়ে যাচ্ছিলেন। এসময় হলের সিড়ি দিয়ে নেমে দুয়েকটা কথার পরেই হঠাৎ করে ছাত্রদল নেতা আলীনূর তাকে থাপ্পড় দেন। থাপ্পড় খেয়ে শিবির নেতা কিছু বললে আলীনুর আবারও তার দিকে এগিয়ে যায়।

পরে মারধরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাখা ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। দুই পক্ষই প্রভোস্টের কার্যালয়ের সামনে গিয়ে পাল্টাপাল্টি স্লোগান দেয়। এক পর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতা দৌড়ে হলের ২১৭ নং কক্ষের ভেতরে অবস্থান নিয়ে দরজা আটকে দিলে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা তাকে ধরতে সেখানে যায়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের উক্ত কক্ষের সামনে মব সৃষ্টি করতে দেখা যায়। এসময় তারা কক্ষের জানালার কাচ ভাঙচুর এবং দরজায় মুহুর্মুহু লাথি মারতে এবং অশ্রাব্য গালিগালাজ করতে থাকে। এসময় কক্ষের দরজার সামনে ছাত্রদল নেতা নিলয় কে দেখা যায়। পরে প্রক্টরিয়াল বডি ও ইবি থানার পুলিশের সদস্যদেরা ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের সরিয়ে দেন।

তাদের সহায়তায় আলীনুরকে হলের রুম থেকে উদ্ধার করে প্রক্টর অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। এসময় আলীনূরকে বের করে প্রক্টরের গাড়িতে উঠাতে গেলে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের আবারও মারমুখী অবস্থানে দেখা যায়। পুলিশের বেষ্টনী ভেদ করে প্রক্টর ও ইবি থানার ওসির গায়ে শিবিরের নেতাকর্মীদের কিল-ঘুষি লাগে। এসময় প্রক্টরের গাড়িতে ইট মেরে গ্লাস ভাঙচুর করে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা।

আলীনূরের সাথে ২১৭ নং কক্ষে থাকা ছাত্রদলকর্মী জিম বলেন, আলীনূর দৌড়ে আমার রুমে আসার পর শিবিরের ১০/১৫ জন গালি দিতে দিতে রুমের দিকে আসে। অতর্কিত সন্ত্রাসী কায়দায় হামলা দেখে আমি ভয়ে দরজা লাগিয়ে ফেলি। পরে তারা দরজায় অনর্গল লাথি মারতে থাকে। তারপর কে জানি রুম তালা মেরে চলে যায়। একপর্যায়ে কিছু দিয়ে আঘাত করে জানালার কাচ ভেঙে ফেলে। হলের পিছনে গিয়ে আমার রুমের ব্যালকনিতে ইট মারে। হোসনে মোবারক নামে একজন ইট ছুড়লে সেটি আমার হাতে লাগে। এতে হাতে ক্ষত হয়।

ঘটনার বিবরণ জানতে চাইলে প্রক্টরের গাড়িচালক আকুল বলেন, শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে থেকে ওই ছেলেকে নিয়ে যখনি আমি গাড়িটি ঘুরিয়ে টান দিছি, তখন দূর থেকে ছোঁড়া ইটের আঘাতে একপাশের গ্লাস হুরমুড় করে ভেঙে যায়। আমার খেয়াল তো তখন সামনের দিকে ছিল। গাড়ির সামনে পরিষ্কার থাকলেও একপাশ থেকে হুট করে ধাম করে শব্দ হয় এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মাঝের সারির শাটার গ্লাসটি ভেঙে পড়ে। এছাড়া গাড়ির পিছনের একটি লাইট ভেঙে গেছে।

হলের কক্ষ ও প্রক্টরের গাড়ির গ্লাস ভাঙচুরের ঘটনায় নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের ব্যাপারে শাখা ছাত্রশিবির সেক্রেটারি রাশেদুল ইসলাম রাফি বলেন, ২১৭নং কক্ষের সামনে পরিস্থিতি খুবই উত্তপ্ত ছিল। আমি ছাত্রদলকে সাথে নিয়ে, আমাদের ছেলেপেলেকে নির্বৃত্ত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি কিন্তু আসলে তা সম্ভব হয়নি। হলের নীচের ঘটনার সময় আমি সেখানে ছিলাম না। সেখানে আমাদের নেতাকর্মীদের বাইরেও অনেকে ছিলো, ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাও ছিলো। প্রক্টর স্যারের গাড়িতে আসলে কে ইট মেরেছে তা আমি সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারছি না। তবে অপরাধী যেই হোক, তার বিচার হোক—এটাই প্রশাসনের কাছে চাওয়া। ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের ব্যাপারে আসা অভিযোগ যদি প্রমাণিত হয় তাহলে অবশ্যই আমরা সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেব।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান কে একাধিকবার মুঠোফোনে চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে অন্য গণমাধ্যমে তিনি বলেছেন, যখন আলিনূরকে গাড়িতে উঠাতে যাই তখন গেটের একটু সামনে পৌঁছাতেই ছেলেপেলে আলীনূরের দিকে ধেয়ে আসে। তখন দ্রুত ওকে গাড়িতে তুলে দেই। এসময় উত্তেজিত হয়ে অনেকে গাড়ির দিকে ইট-পাটকেল ছুঁড়ে মারে। কয়েকটি ঢিল গাড়িতে এসে লাগে এবং কাঁচ ভেঙে যায়। কারা এ ঘটনায় জড়িত ছিল, তা তদন্ত কমিটি দেখবে।