শিক্ষার্থীদের গবেষণা অনুদানের ১৫% নিচ্ছে বিভাগ, দিতে হচ্ছে অঙ্গীকারনামা
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি (এনএসটি) ফেলোশিপের আওতায় শিক্ষার্থীদের গবেষণার জন্য পাওয়া অনুদানের ১৫ শতাংশ অর্থ ‘কল্যাণ তহবিল’-এর নামে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগের বিরুদ্ধে। এ জন্য ফেলোশিপের আবেদনের সময় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অঙ্গীকারনামাও নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে বিভাগটির দাবি, একাডেমিক কমিটির সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই এ নিয়ম করা হয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের কল্যাণেই ওই অর্থ ব্যয় করা হয়।
প্রতি বছর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ‘জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি (এনএসটি) ফেলোশিপ’ কর্মসূচির আওতায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, অনুমোদিত স্নাতকোত্তর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ইনস্টিটিউটে এমএস/এমএসসি, এমফিল ও পিএইচডি পর্যায়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের গবেষণার জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। গবেষণার প্রয়োজনীয় বিভিন্ন কাজে ব্যয়ের জন্য শিক্ষার্থীরা এ অর্থ পেয়ে থাকেন।
নথি পর্যালোচনা করে জানা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগের ১৯ জন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৩ জন এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩০ জন স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী এনএসটি ফেলোশিপ পেয়েছেন। তিনি অর্থবছরে মোট ৭২ জন শিক্ষার্থী জনপ্রতি ৫৪ হাজার টাকা করে ফেলোশিপ পেয়েছেন। এতে মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৮ লাখ ৮৮ হাজার টাকা।
এর মধ্যে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ৮ হাজার ১০০ টাকা করে বিভাগে জমা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সে হিসাবে তিন বছরে ৭২ জন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ‘কল্যাণ তহবিল’-এর নামে নেওয়া হয়েছে মোট ৫ লাখ ৮৩ হাজার ২০০ টাকা।
বিভাগ সূত্রে জানা যায়, একাডেমিক কমিটির সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ফেলোশিপপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফেলোশিপের ১৫ শতাংশ বিভাগে জমা দেওয়ার নিয়ম করা হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছর থেকে এ নিয়ম কার্যকর রয়েছে।
বিভাগ-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা দাবি করেন, ফেলোশিপের অর্থ থেকে ‘কল্যাণ তহবিল’ বাবদ নেওয়া অর্থ শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা হয়। তাঁর দাবি, শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা সহায়তা, ধর্মীয় উৎসব উদযাপন, খেলাধুলার আয়োজন, বিভিন্ন ব্যাচের অনুষ্ঠান, শিক্ষা সফরসহ শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট নানা খাতে এ তহবিলের অর্থ ব্যয় করা হয়।
তবে গবেষণার জন্য পাওয়া অর্থ অন্য খাতে নেওয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ফেলোশিপ পাওয়া একাধিক শিক্ষার্থী। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘গবেষণায় যে পরিমাণ অর্থ খরচ হয়, তার তুলনায় এই টাকা খুবই কম। তারপরও যদি গবেষণার জন্য পাওয়া টাকা বিভাগের ফান্ডে দিতে হয়, সেটি খুবই দুঃখজনক। গবেষণার টাকা কল্যাণ তহবিলে খরচ করলে বিভাগ গবেষণায় আরও পিছিয়ে পড়বে।’
আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘গবেষণায় এমনিতেই দিন দিন শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। এভাবে গবেষণার টাকা অন্য ফান্ডে ব্যয় করলে দেখা যাবে, শিক্ষার্থীরা আর এদিকে আগ্রহই দেখাবে না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিজস্ব ফান্ড থেকে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করা উচিত। গবেষণার জন্য পাওয়া ব্যক্তিগত অনুদানের টাকা কল্যাণ তহবিলে দেওয়া অযৌক্তিক।’
তবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন বিভাগের সংশ্লিষ্ট একাধিক শিক্ষক। অঙ্গীকারনামা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আরিফুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীদের গবেষণাকাজে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক ও যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হয় এবং এসবের খরচ অনেক বেশি। অনেক সময় গবেষণার কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি শিক্ষার্থীদের ব্যবহারে নষ্ট হয়ে যায়। সেগুলো মেরামত বা প্রতিস্থাপনেও বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হয়।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী তাৎক্ষণিকভাবে অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যায় না। এ কারণে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ দিয়ে এসব খরচ মেটানো হয়।
বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক শামীমা বেগম বলেন, ‘ল্যাবের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে যে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা দিয়ে সব খরচ মেটানো সম্ভব হয় না। ফেলোশিপ পাওয়া শিক্ষার্থীদের গবেষণার জন্য অনেক সময় অন্য ল্যাবেও কাজ করাতে হয়, যেখানে খরচ অনেক বেশি। একটি জিনোম বিশ্লেষণ বা ডিএনএ পরীক্ষা করাতেই প্রায় ২৫ হাজার টাকা লাগে। এসব কাজে শিক্ষকেরাও অনেক সময় নিজেদের পকেট থেকে টাকা দেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘কেন্দ্রীয় বরাদ্দে ল্যাবের খরচ মেটে না। শিক্ষার্থীদের দেওয়া টাকাটা কল্যাণ তহবিলে যোগ হয় এবং ওই অর্থ থেকে ব্যয় নির্বাহ করা হয়। আমিও প্রতি মাসে নিজের পকেট থেকে এ তহবিলে টাকা দিই।’
তবে বিভাগের একাডেমিক কমিটিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে টাকা কেটে নেওয়ার এখতিয়ার আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিভাগ কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটি বিভাগের এখতিয়ার।
তাঁর দাবি, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এ অর্থ নেওয়ার ক্ষেত্রে কাউকে চাপ দেওয়া হয় না; অনেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই দিয়েছেন।
তবে এনএসটি ফেলোশিপ পাওয়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক বিভাগ উদ্ভিদবিজ্ঞান। বিভাগটির চেয়ারম্যান কাজী নাহিদা বেগম জানিয়েছেন, ফেলোশিপের অর্থ থেকে বিভাগ কোনো অংশ নেয় না।
তিনি বলেন, ‘আমাদের বিভাগের শিক্ষার্থীরাও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ফেলোশিপ পেয়ে থাকে। তারা পুরো অর্থই গবেষণার কাজে ব্যয় করে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট তত্ত্বাবধায়ক শিক্ষকও গবেষণার বিভিন্ন ব্যয় বহন করেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের কল্যাণে আমাদের বিভাগে আলাদা একটি তহবিল রয়েছে, যেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অর্থ দেন এবং সেই অর্থ আমরা আনুপাতিকভাবে প্রতি ব্যাচের জন্যই ব্যয় করি।’