০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:০৬

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিল কারা? 

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাসে দেশীয় অস্ত্রের মহড়া।  © সংগৃহীত ছবি

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শহীদ জিয়াউর রহমান হলে ইসলামী ছাত্রশিবিরের হল সেক্রেটারি কাজী জুহায়েরকে শাখা ছাত্রদলের আহবায়ক কমিটির সদস্য আলীনুর রহমানের থাপ্পড় মারার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুপক্ষের সংঘর্ষের ঘটনায় ক্যাম্পাসে দেশীয় অস্ত্রের মহড়া দেখা গেছে। এ সময় অনেকের হাতে দেশীয় অস্ত্র রামদা, ছুরি, চাপাতি ও জিআই পাইপ, গাছের ডাল দেখা যায়। এতে প্রশ্ন উঠেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে দেশীয় অস্ত্রের মহড়া দিলো কারা? 

ঘটনার সূত্রপাত গতকাল শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ইবির শহীদ জিয়াউর রহমান হলের নীচতলার করিডোরে। হলের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, হল শিবিরের সেক্রেটারি কাজী জুহায়ের হলের করিডোর দিয়ে ক্র‍্যাচে ভর দিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় হলের সিড়ি দিয়ে নেমে দুয়েকটা কথার পরেই হঠাৎ করে ছাত্রদল নেতা আলীনূর তাকে থাপ্পড় দেন। থাপ্পড় খেয়ে শিবির নেতা কিছু বললে আলীনুর আবারও তার দিকে এগিয়ে যায়।

পরে মারধরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাখা ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। দুই পক্ষই প্রভোস্টের কার্যালয়ের সামনে যেয়ে পাল্টাপাল্টি স্লোগান দেয়। এক পর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতা দৌড়ে হলের ২১৭ নং কক্ষে অবস্থান নিয়ে দরজা আটকে দিলে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা তাকে ধরতে সেখানে যায়। এ সময় তার কক্ষের জানালায় ভাঙচুর এবং দরজায় লাথি মারা হয়। পরিস্থিতি শান্ত করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টোরিয়াল বডির উপস্থিতিতে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করা হলেও তা ব্যর্থ হয়।

পরে প্রক্টরিয়াল বডি ও পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের সরিয়ে দেন। তাদের সহায়তায় আলীনুরকে হলের রুম থেকে উদ্ধার করে ইবি থানা পুলিশ। তাকে প্রক্টরের গাড়িতে উঠাতে গেলে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মারমুখী অবস্থানে দেখা যায়। এ সময় প্রক্টর ও ইবি থানার ওসির গায়ে শিবিরের নেতাকর্মীদের কিল-ঘুষি লাগে এবং প্রক্টরের গাড়ির গ্লাস ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।

এ দিকে ঘটনার পরপরই ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল করার অভিযোগ তুলে গাড়ি আটকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে ছাত্রদল। মিছিলটি ডায়না চত্বর প্রদক্ষিণ করে প্রধান ফটকে গিয়ে শেষ হয়। ছাত্রদলের বিক্ষোভ মিছিলের পাশে ক্যাম্পাসে রামদাসহ দেশীয় অস্ত্র হাতে বহিরাগতদের মহড়া দিতে দেখা যায়। একই সময় জিয়া মোড়ে, লালন শাহ ও শাহ আজিজ হলের পকেট গেট এলাকায় লাঠিসোটা, জিআই পাইপ নিয়ে অবস্থান নেয় শাখা শিবিরের নেতাকর্মীরা।

দেশীয় অস্ত্রের মহড়ার ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। একইসাথে শান্তিপূর্ণ নিরাপদ ক্যাম্পাস অশান্তের ঘটনায় ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করে শিক্ষার্থীদের মাঝে। বিভিন্ন বিভাগের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন, ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে দেশীয় অস্ত্রের মহড়া দিলো কারা? বহিরাগত প্রবেশ নিষিদ্ধ ক্যাম্পাসে কীভাবে তারা প্রবেশ করলো? এবং এই ক্ষেত্রে প্রশাসনের ভূমিকা-ই বা কী?

গতকাল এ ঘটনায় পাল্টাপাল্টি দোষারোপ করেছে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির। ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে হল দখলের রাজনীতির অভিযোগ তুলে ক্যাম্পাস অস্থিতিশীলতার অভিযোগ তোলেন শাখা ছাত্রদলের আহবায়ক মাসুদ রুমি মিথুন। অপরদিকে, ছাত্রদলের হাত ধরেই ঘটনার সূত্রপাত উল্লেখ করে স্থানীয় বিএনপি ও ছাত্রদল-যুবদলের বিরুদ্ধে মহড়ার অভিযোগ তুলে গণমাধ্যমে বক্তব্য দেন শিবির সেক্রেটারি রাশেদুল ইসলাম রাফি।

শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি রাশেদুল ইসলাম রাফি বলেন, গতকালের ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে ও বাইরে দেশীয় অস্ত্রের মহড়ার ঘটনায় ছাত্রশিবিরের কোন নেতাকর্মী জড়িত ছিলো না, তারা আমাদের কেও নয়। আমরা বরাবরই ক্যাম্পাস নিরাপদ রাখার চেষ্টা করেছি, এ জন্য প্রশাসন ও ছাত্রদলের ভাইদের সাথেও আলোচনা করেছি। কারা ক্যাম্পাসের ভেতরে ও বাইরে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিয়েছে তা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনকে খুঁজে বের করার আহ্বান জানাই। একইসাথে এ ঘটনায় যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।

শাখা ছাত্রদলের আহবায়ক মাসুদ রুমি মিথুন বলেন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের কোন নেতাকর্মী দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেয়নি। ক্যাম্পাসের ভেতরে ঝামেলার পরে স্থানীয় এলাকার জামায়াত শিবিরের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাস ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের হামলার উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসে। তখন স্থানীয় জনগণ ও বিএনপির নেতাকর্মীরা হয়তো তাদের মতো করে তাদের (জামায়াত) প্রতিহত করেছে। আমরা আজকে দেখতে পেয়েছি এমপি আমীর হামজা হাসপাতালে জামায়াতের নেতাকর্মীদের দেখতে গেছেন। ক্যাম্পাসের ঘটনায় স্থানীয় জামায়াত কীভাবে যুক্ত হলো এটা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এ সময় ক্যাম্পাসের জিয়ামোড় এলাকা, দুটি হলের পকেট গেট এবং ক্যাম্পাসের হলে হলে কারা লাঠিসোটা এবং দেশীয় অস্ত্র নিয়ে অবস্থান নিয়েছিলো তা প্রশাসনকে খতিয়ে দেখার দাবি জানান তিনি।

জানতে চাইলে ইবি থানার ওসি এস এম মামুনুর রশীদ বলেন, গতকালের সংঘর্ষের পরে আমরা আমাদের জায়গা থেকে সতর্ক অবস্থানে আছি। পুলিশ প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছি। এখন পর্যন্ত কেওই থানায় কোন অভিযোগ দায়ের করেনি। বাইরে ঘটনার সময় আমি আমি জিয়া হল থেকে ছেলেটিকে উদ্ধারের কাজে ছিলাম। পরবর্তীতে বিষয়টা শোনার পর ঘটনাস্থলে গেলে অস্ত্রধারী কাওকে পাওয়া যায়নি। কারা ক্যাম্পাসের ভেতরে ও বাইরে দেশীয় অস্ত্রের মহড়া দিয়েছে, তাদের শনাক্তে আমাদের কার্যক্রম চলমান আছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, গতকালের ঘটনার পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং কমিটিকে ৭২ ঘন্টার মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কমিটি হলের ঘটনার পাশাপাশি পূর্বাপর প্রতিটি বিষয়ে তদন্ত করবে। প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেওয়া অস্ত্রধারীদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ক্যাম্পাসে বহিরাগত প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা স্বার্থে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। যতদিন প্রয়োজন ততদিন পুলিশ দায়িত্বে থাকবে।