গ্যাস সংকটে খরচ বেড়েছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের
জাতীয় পর্যায়ে জ্বালানি সংকটের প্রভাবে গ্যাস উৎপাদন না হওয়ায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) আবাসিক হলগুলো ও কেন্দ্রীয় ক্যাফেটারিয়ায় রান্না বন্ধ থাকার ঘটনা ঘটেছে। এতে শিক্ষার্থীরা খাবার নিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে ক্যাম্পাসের আশেপাশের হোটেল থেকে খাবার খেতে খরচ হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা।
জানা যায়, গতকাল ও আজ (১২ ও ১৩ আগস্ট) দুইদিন ধরে গ্যাস না থাকায় রান্না হচ্ছে না। এছাড়াও এ মাসের শুরুতে দুইদিন গ্যাস সংকটে রান্না হয়নি।
শিক্ষার্থীরা অভিযোগ জানিয়ে বলছেন, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শহর থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। ক্যাম্পাসের আশেপাশে খুব বেশি খাবারের হোটেল নেই। এর ফলে আবাসিক হল ও ক্যাফেটারিয়ার খাবারের উপর নির্ভর করতে হয়। এতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। এছাড়াও ঘনঘন ও দীর্ঘ সময়ের জন্য লোডশেডিং থাকায় একাডেমিক ক্লাস, সেমিস্টার ও মিডটার্মের প্রিপারেশন, প্রেজেন্টেশন, এসাইনমেন্ট, থিসিস করতে পারছেন না অনেক তাঁরা।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থী ৬ হাজার ৪৮৪ জন। তাঁদের আবাসনের জন্য পাঁচটি আবাসিক হল রয়েছে। এসব হলে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৫৫৪ জন শিক্ষার্থী অবস্থান করছেন। এছাড়াও ক্যাম্পাসের আশেপাশের অবস্থিত মেস থেকেও অনেক শিক্ষার্থী এসে ক্যাফেটারিয়ায় খাবার খায়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল ও কেন্দ্রীয় ক্যাফেটারিয়ায় ৪৫-৫০ টাকার মধ্যেই মাছ/মুরগি ও পরিমাণমতো ভাত পাওয়া যায়। কিন্তু বাহিরের হোটেলে খেতে গেলে একই খাবারে খরচ হয় অতিরিক্ত টাকা। সেখানে শুধু মুরগি/মাছের জন্যই খরচ হচ্ছে ৪০-৬০ টাকা এবং প্রতি প্লেট ভাতের জন্য ১০ টাকা। যা মোট টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় ৭০-৯০ টাকা। শিক্ষার্থীরা জানান দুই প্লেট ভাত দিয়েও পরিমাণমতো হয় না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হলের আবাসিক শিক্ষার্থী হারেজ আহমদ বলেন, হলে গ্যাস সরবরাহ না থাকায় আমরা শিক্ষার্থীরা বর্তমানে খাবার নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছি। হলের ডাইনিংয়ে যেখানে একজন শিক্ষার্থী মাত্র ৪০-৪৫ টাকার মধ্যে খাবার খেতে পারে, সেখানে গ্যাস না থাকায় বাইরে হোটেলে খেতে গেলে একই খাবারের জন্য প্রায় ৮০-১০০ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের জন্য এই অতিরিক্ত খরচ বহন করা অনেক কঠিন। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত হলের গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানাচ্ছি।
কাজী নজরুল হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ওসমান গণি বলেন, কুবির হলে গ্যাস সংকটে চরম ভোগান্তিতে শিক্ষার্থীরা। দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় পর্যায়ের গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়ছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর রান্নাবান্নায়। পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে নিয়মিত ও সঠিকভাবে রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না, ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন আবাসিক শিক্ষার্থীরা। বিকল্প হিসেবে হলের বাইরে হোটেল থেকে খাবার কিনতে গেলেও অনেক সময় খাবার পাওয়া যাচ্ছে না; পাওয়া গেলেও বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনযাপনেও বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
বিজয়-২৪ হলের আবাসিক শিক্ষার্থী বায়েজিদ হোসেন বলেন, আজকে দুইদিন যাবত হলে গ্যাস নেই, গ্যাস না থাকার কারণে ২ দিন ধরে ডাইনিংয়ে রান্নাও হচ্ছে না। তাই শিক্ষার্থীদেরকে বাহিরে খাবার খেতে হচ্ছে, বাহিরে খাবারে দাম বেশি হওয়ায় শিক্ষার্থীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং মানসম্মত খাবারও পাচ্ছে না। আজকে শুনলাম ডাইনিংয়ে খাবার রান্না করতে গিয়ে ভাত এবং তরকারি নষ্ট হয়েছে কারণ গ্যাসের সাপ্লাই খুবই অল্প। প্রশাসনের উচিত খুব দ্রুতই এই সমস্যার উপযুক্ত সমাধান খোজা।
নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী হলের আবাসিক শিক্ষার্থী রাজিয়া সুলতানা লুৎফা বলেন, গ্যাস সংকটের কারনে হলের খাবারের স্বাভাবিক অবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাস না থাকার কারনে গতকাল রাতে হলে খাবার তৈরি হয়নি। আজ দুপুরেও খাবার তৈরি হয়নি। ফলে বাহির থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। যার ফলে সময় অপচয় এবং অতিরিক্ত টাকা খরচ হচ্ছে। অনেকের মিডটার্ম এবং সেমিস্টার ফাইনালে চলছে, তাদের স্বাভাবিক পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে।
ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে অসন্তোষের সৃষ্টি হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের উচিত দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহন করে শিক্ষার্থীদের খাবারের ভোগান্তি কমানো।
সুনীতি-শান্তি হলের আবাসিক শিক্ষার্থী রোম্মানা হোসেন বলেন, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে বিদ্যুৎ সংকট অনেক আগে থেকেই চলে আসছে। এর সঙ্গে সম্প্রতি গ্যাস সংকটও যুক্ত হয়েছে। গ্যাসের সমস্যার কারণে মিল বন্ধ রাখা হচ্ছে যার পরিবর্তে লাকড়ির চুলা ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা বেশ ভোগান্তির। অন্যদিকে, অনেক সময় হলগুলোতে বিদ্যুৎ না থাকলেও আশপাশের এলাকায় বিদ্যুৎ থাকে। এতে পরীক্ষা, পড়াশোনা ও অন্যান্য একাডেমিক কাজে সমস্যা হচ্ছে। প্রচণ্ড গরমে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকাও খুব কষ্টকর। আবার বিদ্যুৎ আসার পরও (Cou) Wi-Fi স্বাভাবিক হতে সময় লাগে, ফলে নেটওয়ার্ক সুবিধাও ব্যাহত হয়। তাই প্রশাসনের কাছে অনুরোধ, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক, যাতে শিক্ষার্থীদের এই ভোগান্তি কমে।বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মেডিকেল সেন্টারের ডেপুটি চিফ মেডিকেল অফিসার ডা. মাহমুদুল হাসান খান বলেন, সাধারণত রান্না করার জন্য টেম্পারেচার ৭০ ডিগ্রি রাখতে হয়। এরচেয়ে কম হলে খাবার ঠিকমতো সিদ্ধ হবে না। ফলে নানাবিধ রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যেমন- ডাইরয়া, আমাশয়, হেপাটাইটিস এ ও পেটের পীড়া।
নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী হলের প্রভোস্ট ড. সুমাইয়া আফরিন সানি বলেন, গতকাল গ্যাস না থাকায় আমরা লাকড়ি দিয়ে রান্না করার জন্য নির্দেশনা দিয়েছিলাম। কিন্তু আজ বৃষ্টি থাকায় সেটা সম্ভব হয়নি। তাই রান্না বন্ধ আছে। যেহেতু মাঝেমধ্যেই গ্যাস চলে যাচ্ছে তাই আমরা প্রশাসনের কাছে একটি চিঠি দিবো যেন আমাদেরকে একটি শেড দিয়ে রান্নাঘর তৈরী করে দেয়। সেখানে গ্যাস না থাকলেও লাকড়ি দিয়ে রান্না করা যাবে।
সুনীতি-শান্তি হলের প্রভোস্ট ড. মোসা. শাহীনুর বেগমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যাস্ত আছেন বলে কল রেখে দেন।
বিজয়-২৪ হলের প্রভোস্ট ড. মো. মাহমুদুল হাসান খান বলেন, হলের প্রভোস্ট হিসাবে আমি সামগ্রিক বিষয় গুলোতে মন্তব্য করতে পারি না। এটা ইতিমধ্যে আমরা প্রশাসনকে জানিয়েছি। তারা এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবে।
শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হলের প্রভোস্ট ড. মো. জনি আলম বলেন, আমি বাখরাবাদে কথা বলেছি। তারা জানিয়েছে এটা ন্যাশনাল সংকটের কারণে হচ্ছে। শুধু কুমিল্লা নয় সারাদেশেই এই সমস্যা। তিন-চারদিনের আগে গ্যাস আসবেনা বলে জানিয়েছে তারা। তবে শিক্ষার্থীদের কষ্ট লাঘব করার জন্য আমরা বিকল্প চিন্তা করছি। ভিসি স্যার ও প্রো-ভিসি স্যারের সাথেও যোগাযোগের একটি প্রক্রিয়া চলছে।
কাজী নজরুল ইসলাম হলের প্রভোস্ট মো. হারুন বলেন, অন্যান্য সময়ে বাহিরে লাকড়ি দিয়ে রান্না করা যেত কিন্তু বৃষ্টি থাকায় সেটাও সম্ভব হচ্ছে না। আমরা প্রশাসনকে জানিয়েছি। এটা ন্যাশনাল ক্রাইসিস হওয়ায় তাদের হাতেও সমাধান নেই। আমরা সংশ্লিষ্ট অফিসে যোগাযোগ করেছিলাম তারা বলেছিলো রাতেই গ্যাস চলে আসবে কিন্তু এখনো আসেনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ক্যাফেটারিয়া কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে তিনি বলেন, ক্যাফেতেও গ্যাস সংকটের জন্য রান্না করা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে বাখরাবাদ গ্যাস অফিস কুমিল্লায় যোগাযোগ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি। তারা জানিয়েছে, ন্যাশনাল গ্রিডের জন্য টেম্পারেচার কমে গেছে। ফলে সংকট দেখা দিয়েছে। আরও দুই-একদিন লাগতে পারে এই সংকট সমাধান করতে।
এ বিষয়ে জানতে উপ-উপাচার্যের সাথে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।