১০ আগস্ট ২০২৬, ১৭:২২

অসহনীয় লোডশেডিংয়ে দুর্বিষহ অবস্থায় ইবি শিক্ষার্থীরা

অসহনীয় লোডশেডিংয়ে দুর্বিষহ অবস্থায় ইবি শিক্ষার্থীরা  © সংগৃহীত

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় বেশ কয়েকদিন ভয়াবহ আকারে বেড়েছে লোডশেডিংয়ের মাত্রা। প্রচণ্ড গরমের সাথে পাল্লা দিয়ে অতিরিক্ত লোডশেডিং দুর্বিষহ করে তুলেছে শিক্ষার্থীদের জীবন। আবাসিক হলগুলোতে লোডশেডিংয়ের মাত্রা তুলনামূলক কম হলেও অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে আশপাশের এলাকার পরিস্থিতি। প্রতিদিন ক্যাম্পাসে ১ থেকে ২ ঘণ্টা লোডশেডিং হলেও পার্শ্ববর্তী এলাকা সমূহে সেটি ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য অনুসারে, তালিকাভুক্ত ১৪৩টির মধ্যে অন্তত ৬০টি বিদ্যুৎকেন্দ্র জ্বালানির সংকটে রয়েছে। এর মধ্যে ২৬টি গ্যাসভিত্তিক, ৩৩টি তরল জ্বালানিভিত্তিক ও দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। কক্সবাজারের মহেশখালীতে বঙ্গোপসাগরে পেট্রোবাংলার মালিকানাধীন এলএনজি টার্মিনালে টার্মিনালে গত ২১ জুলাই দুর্ঘটনার পর পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ ১৭ শতাংশের বেশি কমে গেছে। গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে দেড় হাজার মেগাওয়াটের বেশি। ফলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশে বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৮ হাজার মেগাওয়াট হলেও দৈনিক চাহিদা থাকে চাহিদা ১৬ থেকে ১৭ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। তবে বর্তমানে দৈনিক গড়ে ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হওয়ায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে প্রায় ২ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াটের মতো। দেশব্যাপী বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই ঘাটতির কারণে লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায়। বিশেষ করে ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী শেখপাড়া, আনন্দনগর, বসন্তপুর, শান্তিডাঙ্গা, মধুপুর এলাকায় বেড়েছে দুর্বিষহ লোডশেডিং। 

সংশ্লিষ্টরা জানান, ইবি ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় মূলত কুষ্টিয়া গ্রিড থেকে। স্বস্তিপুর (ভাদালিয়া) জোনাল অফিসের আওতায় হরিনারায়ণপুর সাব-স্টেশন লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণ করে। স্বস্তিপুর জোনাল অফিসের বিদ্যুতের চাহিদার পরিমাণ ১০ মেগাওয়াট থাকলেও কুষ্টিয়া গ্রিড থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ৩ থেকে সাড়ে ৩ মেগাওয়াট। যার মধ্যে ইবি ক্যাম্পাসে বিদ্যুতের লোড ১ মেগাওয়াটের মতো। ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ দিতে গিয়ে বাধ্য হয়ে সেখানকার ৭টি বৈদ্যুতিক লাইনের (ফিডার) মধ্যে মাত্র দুটি সচল রাখা যায়, বাকিগুলো বন্ধ রাখতে হয়। 

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও আবাসিক হলের শিক্ষার্থীরা জানান, কিছুদিন আগেও ক্যাম্পাসে লোডশেডিং হতো না বললেই চলে তবে ইদানীং মাত্রা বেড়েছে। যদিও আধাঘণ্টার বেশি থাকে না। কিন্তু ঘনঘন যাওয়া-আসা করে। এতে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ক্ষতি হয়। রাতে দিলেও দিনের বেলায় হলে জেনারেটর দেয় না। মাঝেমধ্যে ক্লাস চলাকালীন সময়ে লোডশেডিং হয়, এতে পড়াশোনার ব্যাঘাত ঘটে। 

পার্শ্ববর্তী শান্তিডাঙ্গার বিভিন্ন ছাত্রাবাসের শিক্ষার্থীরা জানান, দিনরাত্রি মিলিয়ে মেসে ৮-১০ বার বিদ্যুৎ যায়। আর একবার গেলেই কমপক্ষে ১ থেকে দেড় ঘণ্টা করে থাকে। দিনের পাশাপাশি রাতেও লোডশেডিং চলে সমানতালে। আগে একবার ১ ঘণ্টা করে লোডশেডিংয়ের শিডিউল চললেও গত ২/৩ দিন যাবত সেটাও বেড়েছে। এতে পড়াশোনায় সমস্যা হয়, রাতের ঘুম হয় না, পাম্প থেকে পানি তুলতে না পেরে মেসে পানির সমস্যা দেখা দেয়। 

আল ফিকহ বিভাগের শিক্ষার্থী তানভীর লিখেছেন, ক্যাম্পাসের আশপাশের এলাকায় ২৪ ঘন্টার ১০ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। মানলাম সারাদেশে ব্যাপক লোডশেডিং চলছে। কিন্তু শেখপাড়া, আনন্দনগর, শান্তিডাঙ্গা এলাকা গুলোর অবস্থা অজপাড়াগাঁয়ের থেকেও করুণ। ইবির অধিকাংশ শিক্ষার্থী এসব এলাকায় থাকে, দেশজুড়ে বিদ্যুৎ ঘাটতি থাকলেও শহরের ন্যায় অল্প সময় লোডশেডিং দেওয়া যায় সেটা অন্তত দেওয়া যেত। ক্ষোভ ঝেড়ে তিনি বলেন, এটা কি কোনো শিক্ষার পরিবেশ হতে পারে? প্রশাসনের কি কিছুই করণীয় নেই?

এবিষয়ে ইবির ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী এ কে এম শরীফ উদ্দিন বলেন, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হওয়ায় লোডশেডিং হচ্ছে। যেজন্য ফলশ্রুতিতে আমাদের ক্যাম্পাসের আশপাশের এলাকায় লোডশেডিংয়ের পরিমাণ বেড়েছে। এজন্য তো আমরা দায়ী না। জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ না বাড়লে পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনা নেই।

জানতে চাইলে কুষ্টিয়া গ্রিডের সাব-স্টেশন ইঞ্জিনিয়ার ফয়সাল আহমেদ বলেন, বিদ্যুতের খারাপ অবস্থা আমরাও বুজতেছি। আমাদের সর্বমোট ডিমান্ড ১৮০ থেকে ১৮৫ মেগাওয়াটের মতো, সেখানে বরাদ্দ পাচ্ছি ১০০ মেগাওয়াট। আমরা যেটা বরাদ্দ আমরা পাই, সেটা আমাদের ডিস্ট্রিবিউশন সংস্থা যারা আছে তাদেরকে দিয়ে দিই, ওরা ওদের মতো কন্ট্রোল করে। এলাকায় পল্লী বিদ্যুৎ ডিস্ট্রিবিউশনের কাজ যারা করে, তারা কোন লাইনে কতটুক বরাদ্দ দেয় সেটা ভালো বলতে পারবে। তবে জাতীয় গ্রিডে উৎপাদন কমে যাওয়ায় আমাদেরও চাহিদার তুলনায় কম সরবরাহ নিয়েই চলতে হচ্ছে। 

এ বিষেয়ে পল্লী বিদ্যুতের স্বস্তিপুর জোনাল অফিসের ডিজিএম খালিদ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বিদ্যুতের নাজুক পরিস্থিতির কথা স্বীকার করে বলেন, আমার এখানে চাহিদা ১০ মেগাওয়াটের উপরে কিন্তু বরাদ্দ হচ্ছে সাড়ে ৩ মেগাওয়াট। প্রায় ৬০-৬৫% লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। দেড়/দুঘণ্টা পরে ৪০ মিনিট বা ১ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাই। বিশ্ববিদ্যালয় টা গুরুত্বপূর্ণ KPI স্থাপনা। সেখানে গবেষণাগার আছে, রিসার্চ ম্যাটারিয়ালস থাকে, আবাসিক হল আছে। সেখানে যদি আমরা একইভাবে তিনভাগের একভাগ বিদ্যুৎ দেই তাহলে তো শিক্ষার্থীরা বসবাস করতে পারবে কিনা সন্দেহ আছে। এজন্য একটু কনসিডার করা হয়। তবে আজ থেকে বাধ্য হয়ে ক্যাম্পাসেও লোডশেডিং দিতে হবে।