০৫ আগস্ট ২০২৬, ২১:৪২

‘জুলাই বিপ্লবের শহীদরা আমাদের জাতীয় ইতিহাসের আলোকবর্তিকা’—কাঠমন্ডুতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আমানুল্লাহ

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ  © টিডিসি ছবি

জুলাই বিপ্লবের শহীদদের জাতীয় জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেরণার উৎস এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে চিরন্তন আলোকবর্তিকা হিসেবে উল্লেখ করেছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ। তিনি বলেন, শহীদদের আত্মত্যাগ বাংলাদেশে নতুন গণতান্ত্রিক ভোরের সূচনা করেছে। শহীদ পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের স্মৃতি সংরক্ষণ করা জাতির পবিত্র দায়িত্ব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বুধবার (৫ আগস্ট) নেপালের কাঠমন্ডুতে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষে বাংলাদেশ দূতাবাস আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ড. আমানুল্লাহ বলেন, 'জুলাই বিপ্লবের বীর শহীদরা আমাদের জাতীয় জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেরণার উৎস এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে চিরন্তন আলোকবর্তিকা। স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তরুণদের এই আত্মত্যাগ বাংলাদেশে এক নতুন গণতান্ত্রিক ভোরের সূচনা করেছে। শহীদদের রক্তের ঋণ কখনো পরিশোধ করা সম্ভব নয়; তবে তাঁদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং তাঁদের স্মৃতিকে অমর করে রাখা আমাদের পবিত্র জাতীয় দায়িত্ব।'

অনুষ্ঠানে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) মহাসচিব রাষ্ট্রদূত গোলাম সারওয়ার জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অধ্যাপক আমানুল্লাহর ভূমিকার কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, 'ড. আমান ছিলেন আমাদের জুলাই আন্দোলনের অন্যতম মূল থিংক-ট্যাংক ও দূরদর্শী নেতা। আন্দোলনের উত্তাল ও অগ্নিঝরা দিনগুলোতে তাঁর সুচিন্তিত কৌশল, সাহসী নেতৃত্ব এবং নির্ভীক দিকনির্দেশনা সাধারণ মানুষকে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে আসতে যুগান্তকারী অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে।'

তিনি আরও বলেন, 'জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি গণমাধ্যমের বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়েও ড. আমান ছিলেন অনন্য। যখন টেলিভিশন টকশোতে জুলাই আন্দোলনের পক্ষে কথা বলার মতো কাউকেই পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন ড. আমান অকুতোভয় ও স্পষ্টভাষী কণ্ঠে সত্য তুলে ধরেছেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর এই ঐতিহাসিক আত্মত্যাগ ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব জাতির স্মৃতিতে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।'

জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকে বৈষম্যহীন ও স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার হিসেবে উল্লেখ করে উপাচার্য বলেন, 'জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলন কেবল কোনো রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ছিল না; এটি ছিল বৈষম্যহীন ও স্বৈরাচারমুক্ত এক নতুন বাংলাদেশ গড়ার সংকল্প। এই সংগ্রামে জীবন উৎসর্গকারী বীর সন্তানদের স্মৃতি চিরভাস্বর রাখতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সর্বাত্মক পদক্ষেপ নিয়েছে।'

তিনি জানান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিটি শহীদ পরিবারকে ৮ লাখ টাকা করে অনুদান দিয়েছে। পাশাপাশি শহীদ পরিবারের শিক্ষার্থীদের সম্পূর্ণ টিউশন ফি মওকুফ করা হয়েছে। অধিভুক্ত কলেজের অসচ্ছল, প্রান্তিক ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য চালু করা হয়েছে ‘জুলাই শহীদ স্মৃতি শিক্ষাবৃত্তি ২০২৫’।

স্মৃতি সংরক্ষণে নেওয়া উদ্যোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, 'তরুণ প্রজন্ম ও ভবিষ্যৎ গবেষকদের মাঝে জুলাই আন্দোলনের চেতনা বাঁচিয়ে রাখতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসে শহীদ শিক্ষার্থীদের নামফলকসহ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। একইসঙ্গে অধিভুক্ত দেশের সকল কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠাগার, আবাসিক হল ও প্রধান ভবনসমূহ শহীদদের নামে উৎসর্গ করা হয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন এই বীরত্বগাথা থেকে অনুপ্রেরণা পায়।'

৩৬ দিনের গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি আহত, দৃষ্টিশক্তি হারানো এবং পঙ্গুত্ব বরণকারীদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা ও সমবেদনা জানান।

আন্দোলনের সর্বজনীন অংশগ্রহণের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, 'শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, পেশাজীবী, শ্রমজীবী মানুষ, রিকশাচালক, চিকিৎসকসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষের ঐক্যবদ্ধ অংশগ্রহণে এই গণঅভ্যুত্থান সফল হয়েছে। বিশেষ করে জীবন ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া চিকিৎসক, নারীদের অসীম সাহসিকতা এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদান ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।'

আন্দোলনের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ঐক্যের ওপর গুরুত্ব দিয়ে ড. আমানুল্লাহ বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে অভ্যন্তরীণ মতভেদের কারণে অনেক গণঅভ্যুত্থান কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি। তাই জুলাই আন্দোলনের উদ্দেশ্য সফল করতে পারস্পরিক মতপার্থক্য ভুলে সর্বস্তরে সমতা প্রতিষ্ঠা এবং ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে তিনি বলেন, 'শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ ও আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার ঘোষিত 'লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস' (Learning with Happiness) কর্মসূচির অংশ হিসেবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে। ভীতিহীন ও আনন্দঘন শিক্ষার পরিবেশ তৈরিতে দেশব্যাপী ব্যাপকভিত্তিক সাংস্কৃতিক উৎসব ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতা চলমান রয়েছে।'

কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষা নিয়ে তিনি বলেন, 'শিক্ষার্থীদের কেবল সনদভিত্তিক শিক্ষার মধ্যে আটকে না রেখে যুগোপযোগী করতে আমাদের সনাতন কারিকুলাম ঢেলে সাজানো হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি, ভাষাগত দক্ষতা, ফ্রিল্যান্সিং ও উদ্যোক্তা উন্নয়নসহ বিভিন্ন দক্ষতাভিত্তিক (Skill-based) শর্ট ও সার্টিফিকেট কোর্স চালু করা হয়েছে, যেন শিক্ষার্থীরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে নিজেদের সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারে।'

বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক দপ্তরের পরিচালক মোহাম্মদ শফিউল করিম, দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কূটনৈতিক মিশনের সদস্য এবং প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের শেষে জুলাই-আগস্টের শহীদদের আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়।