০৩ আগস্ট ২০২৬, ২২:৫৯

জবির আবাসন প্রকল্পে পরিবর্তন; ১৭০০ সিট বদলে এখন ৬০০

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো  © সংগৃহীত

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) আবাসন সংকট নিরসনে কেরানীগঞ্জের ৭ একর জমিতে প্রায় ১৭০০ শিক্ষার্থীর জন্য অস্থায়ী আবাসন নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। আন্দোলনের মুখে নেওয়া ওই প্রকল্পের মাধ্যমে দ্রুত সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীদের আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল। তবে প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পের কাজ শুরু হয়নি। 

প্রকল্পের কাজ শুরু না হলেও অস্থায়ী আবাসনের পরিকল্পনা পরিবর্তন করে একই অর্থে ১০ তলা স্থায়ী ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী নতুন প্রকল্পে ৬০০ শিক্ষার্থী আবাসন সুবিধা পাবে, যেখানে অস্থায়ী আবাসন হলে ১৭০০ শিক্ষার্থী এ সুবিধা পেত। ফলে  আবাসন সংকট নিরসনের লক্ষ্যে নেওয়া প্রকল্পের ধরন পরিবর্তন এবং ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশ্ন ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে ।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের বাজেটে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকট নিরসনের জন্য অতিরিক্ত ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় কারাগারের বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সাত একর জমিতে অস্থায়ী আবাসন নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। সে সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত সময়ের মধ্যে সেখানে শিক্ষার্থীদের থাকার ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়।

আবাসন সংকট নিরসনের দাবিতে গেল বছরের মে মাসে আন্দোলনে নামেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। ১৪ মে শুরু হওয়া কর্মসূচিতে আবাসন সংকটের পাশাপাশি ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থীর জন্য আবাসন বৃত্তি, পূর্ণাঙ্গ বাজেট অনুমোদন এবং দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ দ্রুত বাস্তবায়নের দাবিও ছিল। আন্দোলনের একপর্যায়ে ১৬ মে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দাবি বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন। পরে কেরানীগঞ্জে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সাত একর জমিতে দ্রুত অস্থায়ী আবাসন নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই প্রকল্পে প্রায় ১৭০০ শিক্ষার্থীর আবাসনের পরিকল্পনা ছিল এমনকি অস্থায়ী আবাসন টিনসেডের একটা প্রাথমিক নকশাও তৈরি করা হয়েছিল।

তবে প্রায় এক বছর পরও সেই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়নি। তবে দ্রুত আবাসন সংকটে অস্থায়ী টিনসেডের পরিবর্তে গত ২৯ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর থেকে প্রকাশিত ই-টেন্ডার বিজ্ঞপ্তিতে ১০ তলাবিশিষ্ট ছাত্রহল নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, কেরানীগঞ্জে বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানাধীন প্রায় ৭ একর জমির মধ্যে মাত্র ৫৪ শতক জমির ওপর ১০ তলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করা হবে। অর্থাৎ পুরো জমির তুলনায় অপেক্ষাকৃত ছোট একটি অংশেই ভবনটি নির্মিত হবে।ফলে অবশিষ্ট বৃহৎ অংশ দীর্ঘ সময় খালি থাকবে।

প্রকল্প পরিবর্তনের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজে বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেছেন, আমাদের বলা হয়েছিল তিন মাসের মধ্যে থাকার ব্যবস্থা হবে। এখন সেটি কয়েক বছরের প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। বর্তমান শিক্ষার্থীরা এর সুবিধা পাবেন কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।

তিনি আরও বলেন, আমাদের চতুর্থ বর্ষ চলছে। এই সময়ে অস্থায়ী হল হলে কিছুটা সুবিধা পাওয়া যেত। কিন্তু স্থায়ী ভবনের জন্য অপেক্ষা করতে হলে অনেকেই পড়াশোনা শেষ করে চলে যাবে।

এ বিষয়ে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ইভান তাহসীব বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় সংকটই হলো আবাসন সংকট। যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব কোনো আবাসিক হল নেই, তাই দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী প্রকল্পের চেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে আবাসনের ব্যবস্থা করাই বেশি প্রয়োজন ছিল। 

এ বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল বলেন, শুরুতে এটি অস্থায়ী আবাসনের জন্য হলেও প্রশাসন যে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আমরা সেটিকে ইতিবাচকভাবে দেখি। আমাদের দীর্ঘদিনের আবাসন সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য এ ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতে বেশি কার্যকর হবে এবং সরকারি অর্থেরও টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করবে।

জকসু ভিপি মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট নিরসনের জন্য বরাদ্দকৃত ২০ কোটি টাকা যথাযথভাবে ব্যবহার না করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একতরফাভাবে ১০ তলা ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি দাবি করেন, এই অর্থ দিয়ে স্বল্প সময়ের মধ্যেই প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা করা সম্ভব ছিল, কিন্তু প্রশাসন তা বাস্তবায়ন না করে প্রায় দুই মাস এ অর্থ অব্যবহৃত রেখেছে। এছাড়া তিনি এ সিদ্ধান্তকে শিক্ষার্থী-বিরোধী, অপরিণামদর্শী এবং সম্ভাব্য অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টিকারী বলে আখ্যায়িত করে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী মো. হেলাল উদ্দিন পাটোয়ারী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, অস্থায়ী না স্থায়ী প্রকল্প হবে সেই সিদ্ধান্ত প্রকৌশল দপ্তরের নয়; এটি ওয়ার্কস কমিটি ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিয়েছে। প্রকৌশল দপ্তর কেবল বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করছে। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে অস্থায়ী টিনশেড আবাসনের পরিবর্তে ১০ তলা স্থায়ী ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে প্রায় ৬০০ শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা হবে এবং ভবিষ্যতে ভবনটি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনসহ অন্যান্য প্রয়োজনেও ব্যবহার করা যাবে।

অস্থায়ী প্রকল্পে কতজন শিক্ষার্থী থাকতে পারতেন, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানাতে পারেননি প্রধান প্রকৌশলী। তবে শিক্ষার্থীদের দাবি অনুযায়ী ওই প্রকল্পে প্রায় ১৭০০ জনের আবাসনের পরিকল্পনা ছিল বলে আলোচনায় উঠে আসে।

তবে প্রকল্প পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রধান প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিন পাটোয়ারীর বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক (ডিরেক্টর ইন চার্জ) সৈয়দ আহমেদ। তিনি বলেন, অস্থায়ী আবাসন প্রকল্পকে স্থায়ী ভবনে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তারা অবগত নন। এমনকি টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে কি না, সে বিষয়েও তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। তিনি আরও জানান, ২০ কোটি টাকার বরাদ্দ এসেছে কি না সে বিষয়েও তারা আনুষ্ঠানিকভাবে অবগত নন। তাদের ধারণা ছিল অর্থটি রাজস্ব খাত থেকে আসার কথা। এছাড়াও তিনি জানান,  অস্থায়ী টিনশেডের আবাসনের জন্য একটি নকশাও প্রণয়ন করা হয়েছিল।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. সাবিনা শারমিন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, অস্থায়ী আবাসন প্রকল্পের পরিবর্তে ১০ তলা স্থায়ী ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত হঠাৎ করে নেওয়া হয়নি। বিষয়টি নিয়ে একাধিক সভা ও সংশ্লিষ্ট কমিটিতে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, যেহেতু অর্থ বরাদ্দ এসেছে, তাই সাময়িক অবকাঠামো নির্মাণ করে ভবিষ্যতে তা অপসারণের মাধ্যমে অর্থের অপচয় না করে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই অবকাঠামো নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ভবনটি এমনভাবে পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন, ভাড়াভিত্তিক ব্যবহার বা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য কাজে লাগানো সম্ভব হয়।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোন ও অফিসে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।