শিক্ষামন্ত্রীর আগমন ঘিরে ইবিতে ভাসমান টংদোকান উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) স্নাতক প্রথম বর্ষে (২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে) ভর্তিকৃত নবীন শিক্ষার্থীদের ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের আগমন ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে ঝাল চত্বরের ভাসমান টংদোকান উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইবি প্রশাসন।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট প্রধান ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করণের লক্ষ্যে গঠিত কমিটির সদস্যসচিব মোহাম্মদ আলাউদ্দীন স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে ঝাল চত্বরের দোকানগুলো তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানায় প্রশাসন। তবে সিদ্ধান্ত ঘিরে ক্ষুব্ধ দোকানিরা আর হুট করে এমন সিদ্ধান্তে নিজেদের খাওয়া-দাওয়ার সমস্যার সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন শিক্ষার্থীরা।
উল্লিখিত ঝাল চত্বরের অবস্থান প্রশাসন ভবনের পাশে। ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের মুখরোচক খাওয়া-দাওয়ার একমাত্র স্থান হিসেবে পরিচিত এই চত্বরে ঝালমুড়ি ফুচকা, চটপটি, বিভিন্ন মৌসুমি ফল, লেবুর শরবত থেকে শুরু করে চা, বিস্কুট, বিভিন্ন কনফেকশনারি আইটেম, ভাত, খিচুড়ি, রুটিসহ ভারী খাবার বিক্রি করা হয়। হলের ডাইনিংয়ের খাবারের মান সন্তোষজনক না হওয়ায় প্রতিদিন কয়েক হাজার শিক্ষার্থী এখানে খাবার খান। এতে শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা উপকৃত হলেও খাবারের উচ্ছিষ্ট ও অন্যান্য আবর্জনার কারণে নোংরা পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া কয়েক দিনের বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার কারণে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ বিরাজ করছে সেখানে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আগামী ১ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের নবীন শিক্ষার্থীদের সেন্ট্রাল ওরিয়েন্টেশন আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছে প্রশাসন। সেদিন অনুষ্ঠিতব্য ‘ওরিয়েন্টেশন’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের। এ ছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন, ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক সচিব, ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুল আউয়ালসহ সরকারের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
এস্টেট অফিসের নোটিশে বলা হয়, অদ্য ২৮ জুলাই, সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক নিরাপত্তা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করণের লক্ষ্যে ভাইস চ্যান্সেলর কর্তৃক গঠিত কমিটির প্রথম সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবনের পশ্চিম পাশে আমবাগানের সকল ভ্রাম্যমান এবং টং দোকানগুলো আগামী ২৯/০৭/২০২৬ ইং তারিখ এর মধ্যে পরবর্তী সিদ্ধান্ত না দেওয়া পর্যন্ত সব দোকান তুলে নেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হলো। তবে, বিকল্প ব্যবস্থা না করেই তাদের চলে যেতে বলায় ক্ষুব্ধ ভাসমান ব্যবসায়ীরা।
এ বিষয়ে শরবত বিক্রেতা ওবায়দুল্লাহ বলেন, ‘আমাদের কয়েকবছরের দোকান এখানে। ভার্সিটির জায়গায় দোকান করি, এখন তারা আমাদের উঠায়ে দিচ্ছে। আমাদের তো আর তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার ক্ষমতা নাই। তাই চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
ঝালমুড়ি বিক্রেতা মোল্লা বলেন, ‘আমরা ছোট থেকেই এই কর্মই শিখেছি। এখন হুট করে আজকে সকালে এসে বলতেছে চলে যেতে। আমরা কোথায় যাব বলেন! আর কী করে খাব? এটা ছাড়া আর তো কোন কাজও জানিনা। এর উপরেই আমার সংসার চলে, ছেলেপেলের লেখাপড়া করাই।’
মৌসুমি ফল বিক্রেতা মজিদ বলেন, ‘ভাতের দোকানগুলোর কারণে আমবাগানটা নষ্ট হয়। আমরা আগেও ছিলাম। আমি প্রায় ২০-২২ বছর এই ক্যাম্পাসে দোকান চালাই। বিশ্ববিদ্যালয় ছয় মাস খোলা থাকে, ছয় মাস বন্ধ থাকে। এই ছয় মাসের ভিতরে যদি গরিবের পেটে এভাবে লাথি মারে, তাহলে তো বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াই ভালো। আমি মাস গেলেই ভাড়া দিচ্ছি, সব দিচ্ছি। তারপরও যদি এত অত্যাচার হয়! আমাদের মালপত্র দাম নিয়া কিন্যা নেন, টাকা দেন, আমরা বাড়িতে চইলা যাই।’
সিএসই বিভাগের শিক্ষার্থী আরাফাত বলেন, ‘আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের রানিং ছাত্র। নিজের খরচটা চালিয়ে নিতে কিছুদিন ধরে ঝাল চত্বরে ছোট একটা বিজনেস চালাচ্ছি। যদি ব্যবসাটা গুটিয় নিতে হয় তাইলে আমরা কোথায় যাব আর জীবিকা নির্বাহ কীভাবে হবে? যদি আমাদের তুলে দিতেই হয় তাহলে আমরা ব্যবসা করতে পারবো কিনা, কোথায় বসব, কীভাবে ব্যবস্থা হবে তা আগেই নিশ্চিত করা দরকার ছিল। নাহলে আমাদের ভোগান্তিতে পড়তে হবে। নিয়মিত ছাত্ররা যদি এখানে একটা সুযোগ-সুবিধা না পাই তাইলে আমরা কোথায় যাব? ’
জানতে চাইলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করণের লক্ষ্যে গঠিত কমিটির আহ্বায়ক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান বলেন, ‘কমিটির সভায় ঝাল চত্বরের দোকানগুলো তুলে দেওয়া সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিষয়টিকে উচ্ছেদ না বলে অপসারণ হিসেবে অভিহিত করা যায়। তবে তাদের ব্যবসার ব্যাপারে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিকল্প ব্যবস্থা করা হবে। সামনে ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম এবং তারপর অভ্যুত্থান দিবসের প্রোগ্রাম নিয়ে আমরা কাজ করছি। এগুলো শেষ হলে তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হবে।’