জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টার নিজেই ‘অসুস্থ’
আবাসন, পরিবহন ও শ্রেণিকক্ষ সংকটের পর নানা সংকটে ভুগছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) একমাত্র মেডিকেল সেন্টার। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, একজন চিকিৎসক, একটি অ্যাম্বু্ল্যান্স দিয়ে চলে প্রায় ১৮ হাজার শিক্ষার্থীর স্বাস্থ্যসেবা। রাজউকের চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে যেন নিজেই ‘অসুস্থ’ এক চিকিৎসা কেন্দ্র। নির্ধারিত সময়ের পর স্বাস্থ্যসেবা না দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ শিক্ষার্থীদের।
বিষয়টি স্বীকার করে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘মেডিকেল সেন্টারের জনবল সংকট ও সীমাবদ্ধতার বিষয়গুলো আমাদের নজরে রয়েছে। নতুন চিকিৎসক নিয়োগের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) প্রয়োজনীয় প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। এ ছাড়া স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।’
জানা গেছে, আবাসন সংকট, পরিবহন সংকট, শ্রেণিকক্ষের সংকটসহ নানা সীমাবদ্ধতায় দীর্ঘদিন ধরেই জর্জরিত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। সেই তালিকায় এবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক সেবার একটি স্বাস্থ্যসেবাও প্রশ্নের মুখে রয়েছে। প্রায় ১৮ হাজার শিক্ষার্থীর চিকিৎসাসেবার একমাত্র ভরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারটি দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসক সংকট, প্রয়োজনীয় ওষুধের ঘাটতি, সীমিত চিকিৎসা সুবিধা, জরুরি সেবার অপ্রতুলতা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় কেন্দ্রটি শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন তারা।
শিক্ষার্থীরা জানান, জবির একমাত্র মেডিকেল সেন্টার থাকলেও রয়েছে জনবল সংকট, প্রয়োজনীয় ওষুধের ঘাটতি, সীমিত চিকিৎসাসেবা, বেড ও অ্যাম্বুলেন্স সুবিধার অভাব এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে কেন্দ্রটির সেবাব্যবস্থা চরম সংকটে রয়েছে। ফলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত তারা।
মেডিকেল সেন্টার সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে বর্তমানে একজন চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করছেন। তার সঙ্গে কয়েকজন টেকনোলজিস্ট, অফিস সহায়ক ও আনসার সদস্য কর্মরত থাকলেও শিক্ষার্থীদের তুলনায় এ জনবল অত্যন্ত অপ্রতুল। প্রতিদিন কয়েকশ শিক্ষার্থী চিকিৎসাসেবার জন্য এখানে আসেন। কিন্তু একজন চিকিৎসকের পক্ষে এত বিপুল সংখ্যক রোগীকে যথাযথ সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি মেডিকেল সেন্টারটির অবস্থান নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র মেডিকেল সেন্টারটি ভাষা শহীদ রফিক ভবনের নিচতলায় অবস্থিত। অথচ রাজউকের মূল্যায়নে ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। ২০২৩ সালে রাজউক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি ভবন দ্রুত খালি করে ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেয়, যার মধ্যে ভাষা শহীদ রফিক ভবনও ছিল। এরপরও ভবনটিতে নিয়মিত একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সম্প্রতি ভবনের বিভিন্ন স্থানে ছাদ ও দেয়ালের প্লাস্টার খসে পড়া, ফাটল দেখা দেওয়া এবং কার্নিশ ভেঙে পড়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। ফলে মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসা নিতে আসা শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মেডিকেল সেন্টারের জনবল সংকট ও সীমাবদ্ধতার বিষয়গুলো আমাদের নজরে রয়েছে। নতুন চিকিৎসক নিয়োগের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) প্রয়োজনীয় প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। এ ছাড়া স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে—অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন, উপাচার্য, জবি
মেডিকেল সেন্টারে একটি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল বলে মনে করেন শিক্ষার্থীরা। তাদের মতে, জরুরি অসুস্থতা, দুর্ঘটনা বা শিক্ষার্থীদের বাসায় পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিলে একটি মাত্র অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে সব পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন। ফলে একই সময়ে একাধিক জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে শিক্ষার্থীরা তাৎক্ষণিক সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে ভোগান্তিতে পড়তে পারেন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, মেডিকেল সেন্টারে সাধারণ চিকিৎসা ও কিছু প্রাথমিক ওষুধ ছাড়া বিশেষ কোনো সুবিধা নেই। প্রয়োজনীয় অনেক ওষুধ নিয়মিত পাওয়া যায় না। জরুরি পরিস্থিতিতে রোগীকে পর্যবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত বেড নেই। গুরুতর অসুস্থদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার মতো নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থাও নেই। ফলে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের বাইরে থেকে ব্যবস্থা করতে হয়।
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের নাগীব হাসান নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘১৮ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য একজন চিকিৎসক কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়। অসুস্থ অবস্থায় দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। প্রয়োজনীয় ওষুধও অনেক সময় পাওয়া যায় না। দ্রুত নতুন চিকিৎসক নিয়োগ ও সেবার মান উন্নয়ন জরুরি।’
ইংরেজি বিভাগের আব্দুর রহিম বলেন, ‘মেডিকেল সেন্টারে রোগ নির্ণয়ের সুযোগ খুবই সীমিত। প্রাথমিক চিকিৎসার বাইরে বড় কোনো সেবা পাওয়া যায় না। জরুরি রোগী এলে শেষ পর্যন্ত বাইরে হাসপাতালে যেতে হয়।’
আরও পড়ুন : দাবিতে অনড় খুবির শিক্ষার্থীরা, পরীক্ষা-ফলাফলে অনিশ্চয়তার মধ্যেও ক্লাস বর্জনের সিদ্ধান্ত
মেডিকেল সেন্টারের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ডা. মিতা শবনম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, বর্তমানে আমরা সীমিত জনবল নিয়ে কাজ করছি। একজন চিকিৎসকের পক্ষে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদা পূরণ করা কঠিন। নতুন চিকিৎসক নিয়োগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৪০ ধরনের ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে এবং সাধারণ চিকিৎসাসেবা চালু রয়েছে। তবে গুরুতর রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য বাইরে রেফার করতে হয়। একটি অ্যাম্বুলেন্সের প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিনের। পাশাপাশি পর্যাপ্ত জনবল, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলে সেবার মান আরও বৃদ্ধি পাবে।”
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক ড. কে এ এম রিফাত হাসান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করছি। জনবল সংকটের বিষয়টি দীর্ঘদিনের এবং নতুন চিকিৎসক নিয়োগের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি মেডিকেল সেন্টারকে আরও কার্যকর ও আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।