২৬ জুলাই ২০২৬, ১৫:৪০

দেড় মাসেও আবাসন বৃত্তি পাননি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৮০ শিক্ষার্থী

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়  © সংগৃহীত

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) আবাসন বৃত্তি কর্মসূচি চালুর প্রায় দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা, তথ্যগত ত্রুটি ও জনবল সংকটের কারণে মূল তালিকাভুক্ত প্রায় ২৮০ শিক্ষার্থী এখনো তাদের প্রাপ্য বৃত্তির অর্থ পাননি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দ্রুত অর্থ পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাস দিলেও দীর্ঘসূত্রিতায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

গত ১১ জুন শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের আন্দোলন, দাবি ও প্রতীক্ষার পর ঘোষিত সম্পূরক আবাসন বৃত্তি কর্মসূচির উদ্বোধন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। প্রথম ধাপে শিক্ষার্থীদের হাতে ৯ হাজার টাকা করে বৃত্তির চেক তুলে দেওয়া হয়। তবে কর্মসূচি শুরুর প্রায় দেড় মাস পরও শত শত শিক্ষার্থী তাদের প্রাপ্য অর্থ না পাওয়ায় বৃত্তি বিতরণ কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সূত্রে জানা যায়, মোট ১০ হাজার ১২৪ জন শিক্ষার্থীর জন্য বৃত্তির অর্থ বিতরণের কার্যক্রম শুরু হয়। তবে প্রথম ধাপেই তথ্যগত ত্রুটির কারণে প্রায় ১ হাজার ৭০০ জনের বেশি শিক্ষার্থীর তথ্য সংশোধনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে তালিকা পাঠানো হয়। পরে সংশোধিত তালিকাতেও বিভিন্ন ধরনের ভুল থেকে যাওয়ায় প্রায় ২৮০ জন শিক্ষার্থীর কাছে এখনো বৃত্তির অর্থ পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া সর্বশেষ পাঠানো ৭৮১ জনের তালিকায় একজন শিক্ষার্থীর ব্যাংক হিসাবে ভুলবশত দুবার অর্থ জমা হয়েছে। অনানুষ্ঠানিকভাবে জানা গেছে, এমন ঘটনার সংখ্যা এখন পর্যন্ত চারজনে পৌঁছেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি সেল ও বৃত্তি শাখা সূত্রে জানা গেছে, প্রথমে অর্থ না পাওয়া শিক্ষার্থীদের তালিকা আইসিটি সেলে পাঠানো হয়। আইসিটি সেল তথ্য যাচাই ও প্রয়োজনীয় সংশোধনের পর সার্ভার হালনাগাদ করে সংশোধিত তালিকা ব্যাংকে পাঠায়। এরপর ব্যাংক শিক্ষার্থীদের হিসাবে বৃত্তির অর্থ স্থানান্তর করে। এই প্রক্রিয়ায় তথ্যগত ও কারিগরি জটিলতার কারণে ম্যানুয়ালি আবেদন করা প্রায় ২৩০ জন শিক্ষার্থীর আবেদনও এখন পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়নি।

আরও পড়ুন: বান্দরবানে নৌকাডুবিতে নিখোঁজ বিইউপি শিক্ষার্থী নাহিয়ানের লাশ উদ্ধার

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রতিটি ধাপেই বিলম্ব হওয়ায় পুরো প্রক্রিয়াটি দীর্ঘায়িত হয়েছে। তাদের মতে, শুরু থেকেই তথ্য যাচাই-বাছাই এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে এ ভোগান্তি এড়ানো সম্ভব ছিল।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমি ব্যবস্থাপনা ও আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মো. মোখতাসিব মিজু বলেন, ‘প্রশাসনের পক্ষ থেকে খুব দ্রুত বৃত্তির অর্থ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। সেই অনুযায়ী আমি প্রিমিয়ার ব্যাংকে হিসাব খুলে প্রয়োজনীয় তথ্য জমা দিই। কিন্তু দেড় মাস পার হলেও এখনো টাকা পাইনি। শুরু থেকেই তথ্য যাচাই ও সমন্বয়ের কাজ সঠিকভাবে করা হলে আমাদের এমন ভোগান্তিতে পড়তে হতো না। আমরা চাই, আর কোনো বিলম্ব না করে দ্রুত বাকি শিক্ষার্থীদের বৃত্তির অর্থ দেওয়া হোক।’

ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী রাকিব বলেন, ‘বৃত্তি কোনো অনুদান নয়, এটি আমাদের প্রাপ্য অধিকার। এই অর্থকে ঘিরে আমার কিছু নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার কারণে দেড় মাস পার হলেও আমার মতো শত শত শিক্ষার্থী তাদের প্রাপ্য অর্থ থেকে বঞ্চিত। এটি শুধু প্রশাসনিক ধীরগতির বিষয় নয়, শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন ও সময়ের প্রতিও উদাসীনতার বহিঃপ্রকাশ। আমরা চাই, দ্রুত বাকি শিক্ষার্থীদের বৃত্তির অর্থ বিতরণ সম্পন্ন করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে যেন এমন ভোগান্তি না হয়, সে জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা হোক।’

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (জকসু) কার্যনির্বাহী সদস্য মেহেদী হাসান বলেন, ‘এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা ও অদক্ষতার কারণে শিক্ষার্থীরা সময়মতো তাদের প্রাপ্য অর্থ পাচ্ছেন না। শুরু থেকেই আমরা প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছি, যাতে দ্রুত সমস্যার সমাধান হয়। আইসিটি সেল, বৃত্তি শাখা, অর্থ ও হিসাব দপ্তর, ট্রেজারার এবং উপাচার্যের সঙ্গে আমরা ধারাবাহিকভাবে সমন্বয় করছি।’

এইচএসসির রসায়ন প্রশ্নে কোনো ভুল নেই, বলছে শিক্ষা বোর্ড

জকসুর সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলিম আরিফ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে জনবল সংকট রয়েছে। তারপরও জকসুর পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হয়েছে। কার্যনির্বাহী সদস্য মেহেদী হাসান শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় কারিগরি ও অন্যান্য সহায়তা দিয়েছেন। আমরা আবারও উপাচার্যের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করব, যাতে দ্রুত সমস্যার সমাধান হয়।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃত্তি শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত সেকশন অফিসার মোহাম্মদ মাসুদ আলম বলেন, ‘অনেক শিক্ষার্থী বাংলায় নাম লিখেছেন, কেউ নামের জায়গায় হিসাবের ধরন লিখেছেন, কেউ আবার রাউটিং নম্বরসহ বিভিন্ন তথ্য ভুল দিয়েছেন। এসব কারণেই অনেকের বৃত্তির অর্থ পাঠানো সম্ভব হয়নি। স্বাভাবিক প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক আবেদন সামলাতে গিয়ে আমরা চাপের মধ্যে রয়েছি। ইতোমধ্যে আরও একজন কর্মকর্তাকে এ দায়িত্বে যুক্ত করা হয়েছে। আশা করছি, খুব দ্রুতই শিক্ষার্থীরা তাদের প্রাপ্য অর্থ পেয়ে যাবেন।’

অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার দ্বিতীয় কর্মকর্তা মো. মুজিবুর রহমান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দেওয়ার আগে আমাদের পর্যাপ্ত সময় দিলে আরও গোছানোভাবে কাজ করা যেত। এটি প্রথমবারের মতো বাস্তবায়িত একটি কর্মসূচি হওয়ায় অতিরিক্ত চাপের মধ্যেও আমরা আন্তরিকভাবে কাজ করছি। সর্বশেষ যে তালিকা পাঠানো হয়েছে, সেটি নির্ভুলভাবে সংশোধন হয়ে ফিরে এলে আশা করছি এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে বাকি শিক্ষার্থীদের অর্থ পাঠানো সম্ভব হবে।’

দায়িত্বের প্রথম দিনে স্মৃতিসৌধ ও শহীদ জিয়া–খালেদার সমাধিতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ

বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ও হিসাব দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. শেখ রফিকুল ইসলাম বলেন, বৃত্তির অর্থ না পাওয়া ২৮০ জন শিক্ষার্থীর সবাই একই সমস্যায় পড়েননি। তাদের মধ্যে আনুমানিক ১২০ থেকে ১৫০ জনের ব্যাংক হিসাব দীর্ঘদিন লেনদেন না হওয়ায় ডরম্যান্ট হয়ে গেছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থ পাঠানো হলেও তা ফেরত এসেছে।

তিনি আরও বলেন, ‘প্রথম ধাপে ব্যাংক প্রায় ১ হাজার ৭০০টি তথ্য যাচাইয়ের জন্য ফেরত পাঠায়। পরে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পাওয়া সংশোধিত তথ্যের মধ্যেও প্রায় ২৮০ জনের তথ্যে আবার ভুল পাওয়া যায়। এখন মূল ফাইলের সঙ্গে প্রতিটি তথ্য আলাদাভাবে মিলিয়ে দেখতে হচ্ছে। কোন শিক্ষার্থীর অর্থ গেছে আর কার যায়নি, তা ম্যানুয়ালি শনাক্ত করতে হচ্ছে। এটি অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও জটিল একটি প্রক্রিয়া। গতকাল বিকেল পর্যন্ত প্রায় ২০০টি তথ্য যাচাই করা হয়েছে। বাকি তথ্যও দ্রুত যাচাই করে সমস্যার সমাধান করা হবে। আশা করছি, যত দ্রুত সম্ভব শিক্ষার্থীরা তাদের প্রাপ্য অর্থ পেয়ে যাবেন।’