২৫ জুলাই ২০২৬, ২৩:০১

জবির অস্থায়ী টিএসসিকে ‘গরুর খোঁয়াড়’ বানিয়ে প্রচার করছেন শিক্ষার্থীরা

জবির টিএসসি নিয়ে এআই জেনারেটেড ছবি ভাইরাল  © সম্পাদিত

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) অস্থায়ী টিএসসি আধুনিকায়ন ও সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পকে ঘিরে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন কাজ ফেলে রাখা, দোকানিদের থেকে টাকা নিয়েও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না করা, নামমাত্র ঘষামাজা করাসহ নানা অভিযোগে ফেসবুকে সমালোচনা করছেন শিক্ষার্থীরা। 

সরেজমিনে দেখা যায়, এসব অভিযোগ সামনে এনে ফেসবুকে এআই দিয়ে টিএসসিকে ‘গরুর খোঁয়াড়’ তৈরি করে অনেক শিক্ষার্থীরা সমালোচনা করছেন। টিএসসি অবকাঠামো আধুনিকায়ন কমিটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসসহ জকসু প্রতিনিধিরা থাকলেও প্রয়োজনীয় ও মানসম্মত অবকাঠামো উন্নয়ন হচ্ছে না বলে অভিযোগ করছেন তারা। শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন তুলছেন, এ দায় জকসুর নাকি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের?

জানা যায়, চলতি বছরের ১৫ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিস থেকে জারি করা এক নোটিশে মূল ফটকের বিপরীতে অবস্থিত টিএসসি এলাকার দোকানপাট সরিয়ে নিয়ে সেখানে পরিকল্পিতভাবে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ, সৌন্দর্যবর্ধন এবং স্থানটিকে আরও সুশৃঙ্খল করার ঘোষণা দেওয়া হয়। ওই নোটিশের পর দোকানপাট সরিয়ে নেয় দোকানিরা। আধুনিকায়নের নামে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর অফিস প্রত্যেক দোকানির থেকে ৫০ হাজার টাকা করে নিয়ে ফের দোকান বরাদ্দ দেয়। এবং এ টাকা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রকল্যাণে ব্যয় হবে বলে মৌখিক ঘোষণা দেওয়া হয়। 

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জবির অস্থায়ী টিএসসির জমির পরিমাণ ১০.১৭ শতাংশ। জমির প্রকৃত মালিক সমবায় ব্যাংক। অর্থাৎ জমিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয় জমিটি ক্রয়ের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জমিটি কিনতে সমবায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হলেও কোনো জবাব আসেনি। 

বেশ কিছুদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জবির অস্থায়ী টিএসসিকে নিয়ে বানানো গরুর খোঁয়াড়ের একটি এইআই জেনারেটেড ছবি ঘুরছে। শিক্ষার্থীরা সে ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে প্রশাসনের টিএসসি আধুনিকায়নের কাজের সমালোচনা করছেন। 

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জবির টিএসসি আধুনিকায়নের নামে টানা ৩-৪ মাস বসিয়ে রেখেছে। সেখানে আধুনিকায়ন না করে টিনের বেড়া দিয়ে দায়সারাভাবে কাজ সম্পন্ন করেছে। 

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, আধুনিক টিএসসির যে প্রত্যাশা ছিল, দৃশ্যমান কাজের সঙ্গে তার মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অনেকে ফেসবুকে টিএসসিকে এআই দিয়ে গরুর খোঁয়াড় বানিয়ে দিয়েছে। টাকা নিয়ে আধুনিকায়ন না করা তো এআই দিয়ে ছবি বানানোর মতোই হলো। 

ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী মোস্তফা হাসান বলেন, টিএসসির সংস্কার উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক। তবে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি নিয়ে শিক্ষার্থীদের যে ধরনের প্রত্যাশা থাকে, বর্তমান দৃশ্যমান কাঠামো সেই প্রত্যাশার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয়নি। এ জন্যই হয়ত অনেক শিক্ষার্থী এটিকে গরুর খামার বা গোয়ালঘরের সঙ্গে তুলনা করছেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, আরও নান্দনিক ও পরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের সুযোগ ছিল।

রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুল আলিম বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি কেবল নামেই আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসেনি। এখানে পরিবেশগত কোনো বিষয় বিবেচনা করা হচ্ছে না। 

নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী জান্নাতুল মাওয়া লিশা এআই জেনারেটেড ছবি ফেসবুকে শেয়ার করে লিখেছেন, আমাদের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে স্বাগতম। আমার প্রিয় মুরগির ফার্ম। 

বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী শফিক হাসান বলেন, প্রথম দেখায় এটি যে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় টিএসসির চিত্র শিক্ষার্থীরা কল্পনা করেছিলেন, তার সঙ্গে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেসব তুলনা বা সমালোচনা দেখা যাচ্ছে, সেগুলোর পেছনে শিক্ষার্থীদের হতাশার একটি জায়গা আছে বলেই মনে করি। তবে প্রকল্পটি শেষ হলে হয়ত আরও পরিষ্কার মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।

এর আগে টিএসসি সংস্কারে গত ১১ জুলাই চার দফা সংস্কার প্রস্তাবনা দেয় জকসু। সেগুলো হলো- উন্মুক্ত টেন্ডারের মাধ্যমে সবার উপস্থিতিতে দোকান বরাদ্দ দিতে হবে, দোকান বরাদ্দ দেওয়ার আগেই পণ্যের দাম লিখিতভাবে নির্ধারণ করতে হবে, এই মাসের মধ্যে টিএসসি সংস্কারের কাজ শেষ করতে হবে ও টিএসসির জমি অতি দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে ক্রয় করতে হবে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জকসু) সাংস্কৃতিক সম্পাদক তাকরিম হাসান নিজের ফেসবুক পোস্টে টিএসসির এআই জেনারেটেড ছবিটি শেয়ার করে লিখেছেন, শাবানা-আলমগীরের একটা সিনেমা দেখছিলাম ছোটবেলায়। আলমগীর ঘুমিয়ে আছে। শাবানা হাতে পানির গ্লাস আর ঔষধ নিয়ে বেডরুমে ঢুকে ডাকছে— ‘এই তোমার ঘুমের ঔষধটা খেয়ে নাও উঠে।’ মানে ঘুমিয়ে থাকা লোকটাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে ঘুমের ঔষধ খাওয়ানো হচ্ছে। আর এদিকে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি নিয়েও সেইম ব্যাপারটা ঘটলো।

একটা ঝুপড়ি থেকে আধুনিকায়ন করে এটাকে গরুর খোঁয়াড় বানানো হলো। অবশ্য জগন্নাথে পড়াশোনা করতে আসা আমরা যেহেতু গরু, আমাদের জন্যে এটা বুঝেশুনেই বানানো হয়েছে। নইলে কি আর এই ২/৩ মাস বন্ধ রেখে এমন একটা কাজ করা হতো? কত সুন্দর আইডিয়া ছিলো এটাকে নিয়ে। কিছুই করা গেলো না।

জকসুর স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক নূর মোহাম্মদ টিএসসির কাজের সমালোচনা করে বলেন, আমরা বারবার বলেছি, আগের কাঠামো ভেঙে যদি আবার একই ধরনের কাঠামো নির্মাণ করা হয়, তাহলে আধুনিকায়নের কোনো অর্থ থাকে না। প্রয়োজন হলে জায়গা সম্প্রসারণ কিংবা বহুতল কাঠামোর পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু আমাদের প্রস্তাবগুলো গুরুত্ব পায়নি। আমাদের দেওয়া চার দফা সংস্কার প্রস্তাব মানা হয়নি। 

টিএসসিকে ‘গরুর খোঁয়াড়’ হিসেবে আখ্যায়িত করাকে তিনি অযৌক্তিক মনে করেন না। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের এই সমালোচনাকে আমি অযৌক্তিক বলব না। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি কেমন হওয়া উচিত, সেই প্রত্যাশা থেকেই তারা কথা বলছে। কাজটি দেখে অনেকেই প্রশ্ন তুলছে, এটি টিএসসি নাকি অন্য কোনো স্থাপনা? এ ধরনের পরিস্থিতি প্রশাসনের জন্য বিব্রতকর। শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত বসার জায়গা ও গাছকেন্দ্রিক নান্দনিক পরিবেশ তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হলেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

এ বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল বলেন, টিএসসি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে দোকান ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ ও খাবারের মান নিয়ে নানান সমস্যা ছিল। শিক্ষার্থীদের জন্য একটি পরিচ্ছন্ন ও মানসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি ছাত্রদল বরাবরই জানিয়ে এসেছে। আমরা সবসময় চেয়েছি শিক্ষার্থীরা যেন সেখানে বসার মতো সুন্দর পরিবেশ পায়। প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ, খাবার-দাবার ও অন্যান্য সেবা সহজে গ্রহণ করতে পারে। খাবারের মানও যেন উন্নত হয়, সে বিষয়েও আমরা প্রশাসনকে বারবার জানিয়েছি।

টিএসসিকে ‘গরুর খোঁয়াড়’ হিসেবে আখ্যায়িত করার সমালোচনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে যারা সেখানে দোকান পরিচালনা করছেন, তাদের মানবিক বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। পুরো বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও প্রকৌশল দপ্তরের পরিকল্পনার অংশ। তারা যেভাবে সুবিধাজনক মনে করেছে, সেভাবেই কাজ করছে। এ বিষয়ে নিশ্চয়ই তাদের নিজস্ব ব্যাখ্যা রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৌশল দপ্তরের এক কর্মকর্তা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর অফিস আমাদের একটা ডিজাইন করতে দিয়েছিল। আমরা সে অনুযায়ী ডিজাইন দিয়েছি। এর পরে কী হয়েছে, জানি না। তবে তাদের করা ডিজাইন শতভাগ মানা হয়নি বলে জানিয়েছেন তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, কাজটি এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। পুরো কাজ শেষ হওয়ার পরই বোঝা যাবে এটি দেখতে কেমন হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টিএসসিকে ‘গরুর খোঁয়াড়’-এর সঙ্গে তুলনা করে করা সমালোচনার বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি। 

তবে টিএসসি এলাকায় একটি গাছের চারপাশে ঢালাই করে দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, এটি নির্মাণশ্রমিকদের ভুল ছিল। বিষয়টি নজরে আসার পর সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গাছের চারপাশের ঢালাই কেটে মাটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।