২৪ জুলাই ২০২৬, ১৯:৪২

খুবিতে দ্বিতীয় দিনেও অচলাবস্থা, তদন্ত-আইনি পদক্ষেপসহ প্রশাসনের একাধিক সিদ্ধান্ত

ফটক বন্ধ রয়েছে।  © টিডিসি ছবি

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) বিজয় ’২৪ হলের নারী ওয়াশরুমে গোপনে ভিডিও ধারণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংকট দ্বিতীয় দিনেও অবসান হয়নি। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কর্মসূচির কারণে শুক্রবার (২৪ জুলাই) সন্ধ্যা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন ও প্রধান ফটক তালাবদ্ধ ছিল। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং একাডেমিক পরিবেশ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারেনি।

শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়ে প্রশাসনের দৃশ্যমান পদক্ষেপ না দেখা পর্যন্ত তাদের কর্মসূচি প্রত্যাহারের কোনো সিদ্ধান্ত নেই। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ক্যাম্পাসের পরিস্থিতিতেও নতুন কোনো পরিবর্তন আসেনি।

ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ২২ জুলাই রাত প্রায় ৯টা ৪৫ মিনিটে। বিজয় ’২৪ হলের নারী ওয়াশরুমে গোপনে মোবাইল ফোন রেখে ভিডিও ধারণের অভিযোগে হলের ক্যান্টিনে কর্মরত ইমাম হাসান নামে এক ব্যক্তিকে আটক করেন আবাসিক শিক্ষার্থীরা। পরে তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে পরদিন সকাল থেকেই সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বর্জনের ঘোষণা দেন।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় বৃহস্পতিবার দিনজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একাধিক জরুরি বৈঠক করে। সকালে ও দুপুরে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মো. নূরুন্নবী। পরে ঢাকা থেকে ক্যাম্পাসে ফিরে বিকেলে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল করিম পৃথক বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। এসব সভায় বিভিন্ন স্কুলের ডিন, রেজিস্ট্রার, ডিসিপ্লিন প্রধান, আবাসিক হলের প্রভোস্ট, ছাত্রবিষয়ক পরিচালক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা অংশ নেন।

জরুরি বৈঠক শেষে প্রশাসন বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বৃহস্পতিবারের নির্ধারিত সব পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. এস. এম. মাহবুবুর রহমান বাদী হয়ে অভিযুক্ত ইমাম হাসান ও তার স্ত্রী রুপা মণির বিরুদ্ধে হরিণটানা থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর অভিযুক্তকে আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

প্রশাসন আরও জানায়, ঘটনার তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে তিন কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি অভিযুক্তের পরিচালিত হল ক্যান্টিনের বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে। ছাত্রী হলের অভ্যন্তরে কর্মচারীদের মোবাইল ফোন বহন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া অপরাজিতা ও বিজয় ’২৪ ছাত্রী হলের ক্যান্টিন পরিচালনায় নতুন নীতিমালা প্রণয়ন এবং ভবিষ্যতে ওই দুই হলে কোনো পুরুষ কর্মী নিয়োগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এদিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, শুধু একটি মামলার মাধ্যমে এ ঘটনার সমাধান হবে না। তারা ক্যাম্পাসে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন, নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা জোরদার এবং অতীতের অভিযোগগুলোরও স্বচ্ছ তদন্ত ও দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

শিক্ষা ডিসিপ্লিনের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সাবিত হাসান অর্ক বলেন, ‘আমরা কোনো ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে আন্দোলন করছি না। আমাদের মূল দাবি হলো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং ক্যাম্পাসে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। প্রশাসন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তবে সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন এবং দৃশ্যমান অগ্রগতি না দেখা পর্যন্ত আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে আছি।’

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা ডিসিপ্লিনের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সাবিনা ইয়াসমিন তিথি বলেন, ‘এই ঘটনার পর অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যেই নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি হয়েছে। আমরা চাই, শুধু এই ঘটনার বিচার নয়; ভবিষ্যতে যেন এমন কোনো ঘটনা আর না ঘটে, সে জন্য স্থায়ী ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি জায়গা হওয়া উচিত, যেখানে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ পরিবেশে স্বাভাবিকভাবে পড়াশোনা করতে পারে।’

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক পরিচালক প্রফেসর ড. মো. সালাউদ্দিন বলেন, ‘ঘটনার পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি দেখছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে একাধিক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেসব সভায় শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের, তদন্ত কমিটি গঠন, সংশ্লিষ্ট ক্যান্টিনের বরাদ্দ বাতিল, ছাত্রী হলে কর্মচারীদের মোবাইল ফোন বহন নিষিদ্ধ, ক্যান্টিন পরিচালনায় নতুন নীতিমালা প্রণয়ন এবং ভবিষ্যতে ওই দুই ছাত্রী হলে কোনো পুরুষ কর্মী নিয়োগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আবাসনসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় এবং ছাত্রী হলের ওয়াশরুমের ভেন্টিলেটার আরও নিরাপদ করার উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়েছে। ভেন্টিলেটারে নন-ট্রান্সপারেন্ট (অস্বচ্ছ) গ্লাস স্থাপনসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ শুরু হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার কোনো সুযোগ না থাকে। আমরা চাই শিক্ষার্থীরা হলে নিরাপদ ও স্বস্তিকর পরিবেশে বসবাস করুক।’

তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবিগুলো বাস্তবায়নে আন্তরিকভাবে কাজ করছে। তবে প্রশাসনিক ভবন তালাবদ্ধ থাকায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। তাই শিক্ষার্থীদের প্রতি আমাদের আন্তরিক অনুরোধ, প্রশাসনিক ভবনের তালা খুলে দিয়ে প্রশাসনকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ করে দিন। এতে চলমান তদন্ত, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো আরও দ্রুত কার্যকর করা সম্ভব হবে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করাই আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।’ 

শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নতুন কোনো ঘোষণা বা অতিরিক্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। ফলে প্রশাসনিক ভবন ও প্রধান ফটকে তালা, একাডেমিক কার্যক্রম স্থগিত এবং শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলন সবকিছুই পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী অব্যাহত রয়েছে।