জুলাইয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় জড়িত ছাত্রলীগ ও আওয়ামী শিক্ষকদের বিচার শুরু কবে, জানালেন ববি উপাচার্য
দেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত সহিংসতার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলেও ব্যতিক্রম চিত্র বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (ববি)। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের নির্মমভাবে দমন এবং আওয়ামী লীগ সরকারকে টিকিয়ে রাখার ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকা শিক্ষক-কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় জড়িত ছাত্রলীগ নেতাদের বিরুদ্ধে এখনো কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষুদ্ধ সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীরা জানান, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট যখন দেশজুড়ে স্বৈরাচার পতনের কাউন্টডাউন চলছে, ঠিক সেই মুহূর্তে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০ জনেরও বেশি শিক্ষক ও কর্মকর্তা প্রায় দেড় ঘণ্টার একটি গোপন অনলাইন মিটিংয়ে যুক্ত হন। যে বৈঠকের ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাসিবাদের অনুসারী শিক্ষকরা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা ‘এক দফা’ দাবিকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এসময় তারা যেকোনো উপায়ে ছাত্র-জনতার এই গণ-অভ্যুত্থান ও সরকার পতন ঠেকাতে শেখ হাসিনার পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার করেন। কীভাবে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমন করা যায় এবং কীভাবে তাদের রাজপথ থেকে হটিয়ে দেওয়া যায়— তার নীলনকশা ও পরিকল্পনা সাজানো হয়েছিল এই গোপন বৈঠক থেকে। গোপন বৈঠকের আগের সপ্তাহে, অর্থাৎ ২৯ জুলাই দুপুর ২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের নিচে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ।
প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যমতে, ছাত্রলীগ নেতা এ কে আরাফাতের নেতৃত্বে ৪০-৫০ জনের একটি সশস্ত্র দল আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়েছিল। অতর্কিত এই হামলায় ছাত্রীসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ১৫ জন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন। আহতদের মধ্যে ৯ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের তাৎক্ষণিকভাবে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এছাড়া আন্দোলন চলাকালে দায়িত্বপালনরত গণমাধ্যমকর্মীদের ওপরও দফায় দফায় হামলা ও হেনস্তা করে ছাত্রলীগ কর্মীরা।
১ আগস্ট সকাল ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে পুলিশের ব্রিফিং চলাকালীন ঢাকা টাইমস-এর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মো. মাসুদ রানাকে পুলিশের সামনে থেকেই তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেন ছাত্রলীগকর্মী আবুল খায়ের আরাফাত। ৪ আগস্ট সাড়ে ৫টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি গেটের সামনে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাবের কার্যনির্বাহী সদস্য ও বরিশাল পত্রিকার প্রতিনিধি আবু উবাইদার ওপর হামলা চালানো হয়।
হামলায় আহত আইন বিভাগের শিক্ষার্থী এস এম ওহিদুর রহমান বলেন, চব্বিশের ২৯ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাউন্ড ফ্লোরে আমাদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে ছাত্রলীগ বর্বর আক্রমণ চালায়। হামলাকারীদের নাম-পরিচয়সহ তালিকা প্রক্টর অফিসে একাধিকবার জমা দেওয়া হয়েছে এবং ফৌজদারি মামলা দায়েরের দাবি জানানো হয়েছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের চরম অবহেলা ও নজরদারির অভাব স্পষ্ট।
ক্যাম্পাস সাংবাদিক আবু উবাইদা বলেন, ঘটনার পর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এখনো এই হামলার বিচার সম্পন্ন করতে পারেনি। বারবার প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সত্ত্বেও বিষয়টি কার্যকরভাবে নিষ্পত্তি করা হয়নি।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মেহেদী হাসান সোহাগ বলেন, আমাদের অবস্থান স্পষ্ট, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্ত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া নেবে।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মামুন অর রশীদ বলেন, অবশ্যই আমরা দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। আগামী সিন্ডিকেটে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করা হবে। সেখানে সবার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের স্বার্থে একটি জুডিশিয়ারি কমিটি গঠন করা হবে।