১০ জুলাই ২০২৬, ১৬:৫১

সীমান্তবর্তী গ্রাম থেকে উঠে এসে ডিনস অ্যাওয়ার্ড অর্জন, হলেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক

শামিমা ফেরদৌসি বন্যা  © টিডিসি ফটো

বাংলাদেশের উত্তর সীমান্তঘেঁষা একটি জনপদ থেকে উঠে এসে দেশের অন্যতম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ। অ্যাকাডেমিক কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যাত্রা শুরু করা শামিমা ফেরদৌসি বন্যার গল্পটি শুধু সাফল্যের নয়, বরং প্রতিকূলতাকে জয় করার এক অনুপ্রেরণামূলক অধ্যায়।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৭-১৮ সেশনের শিক্ষার্থী শামিমা ফেরদৌসি বন্যা সম্প্রতি বেসরকারি ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক পদে যোগদানের আমন্ত্রণ পেয়েছেন। এর আগে তিনি স্নাতকে ৩.৮১ এবং স্নাতকোত্তরে ৩.৭১ সিজিপিএ অর্জন করে অ্যাকাডেমিক কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ ডিনস অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন।

ঠাকুরগাঁও জেলার হরিপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী যাদুরানী এলাকায় বেড়ে ওঠা বন্যার কাছে উচ্চশিক্ষার পথটা কখনোই সহজ ছিল না। পরিবারে তিন ভাইবোনের মধ্যে তিনি একমাত্র বোন এবং পরিবারের প্রথম সদস্য, যিনি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ঢাকায় এসে পড়াশোনার সুযোগ পান।

নিজের বেড়ে ওঠার গল্প বলতে গিয়ে বন্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমার বাসা একদম বর্ডার সাইডে। সেখান থেকে কোনো সন্তান ঢাকায় এসে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করবে, এটা আমাদের এলাকার অনেকের কাছেই স্বপ্নের মতো বিষয়। আল্লাহর রহমতে আমি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগই পাইনি, ডিনস অ্যাওয়ার্ডও অর্জন করেছি। আজ শিক্ষকতা পেশায় প্রবেশের সুযোগ পেয়েছি, এটা আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া।

তবে এই পথচলায় তাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে কঠিন বাস্তবতারও। করোনাকালে মাকে হারানোর শোক তার জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। ব্যক্তিগত সেই সংকট কাটিয়ে আবারও নিজেকে গুছিয়ে নেওয়া এবং স্বপ্নের পথে এগিয়ে চলা ছিল বড় এক চ্যালেঞ্জ।

এ বিষয়ে তিনি বলেন, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সংগ্রাম ছিল করোনার সময়ে মাকে হারানো। সেই সময় আমি গভীর মানসিক আঘাতের মধ্যে ছিলাম। তবে আমি সবসময় চেষ্টা করেছি যেন প্রতিকূলতা আমাকে থামিয়ে দিতে না পারে। আল্লাহর রহমত, পরিবারের সমর্থন এবং শিক্ষকদের অনুপ্রেরণা আমাকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।

শুধু পড়াশোনাতেই নয়, গবেষণাতেও রয়েছে তার উল্লেখযোগ্য সম্পৃক্ততা। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন গবেষণা প্রকল্পে গবেষণা সহকারী ও সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। বর্তমানে Bangladesh School of Social Research and Development-এ রিসার্চ কো-অর্ডিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি একটি আমেরিকান সফ্‌টওয়্যার প্রতিষ্ঠানে রিমোট রিভিউয়ার হিসেবেও কাজ করছেন।

গবেষণাক্ষেত্রে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ তাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিচিতি এনে দিয়েছে। তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেছেন এবং তার গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক জার্নালেও প্রকাশিত হয়েছে।

নিজের সাফল্যের পেছনের মূল শক্তি সম্পর্কে বন্যা বলেন, আমার সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান আল্লাহর রহমত, বাবা-মায়ের দোয়া, পরিবারের সহযোগিতা এবং শিক্ষকদের আন্তরিক দিকনির্দেশনার। আমার বিভাগের শিক্ষকরা আমাকে সবসময় উৎসাহ দিয়েছেন এবং এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছেন।

বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, পড়াশোনার কোনো বিকল্প নেই। সাফল্য হয়ত সঙ্গে সঙ্গে আসবে না, কিন্তু আন্তরিকতা, ধৈর্য এবং ধারাবাহিক পরিশ্রম থাকলে একসময় ফল পাওয়া যায়। সময়ের কাজ সময়মতো করতে হবে এবং নিজের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না।

সীমান্তের একটি ছোট্ট জনপদ থেকে শুরু হওয়া এই পথচলা আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে গিয়ে পৌঁছেছে। শামিমা ফেরদৌসি বন্যার এই অর্জন প্রমাণ করে, প্রতিকূলতা যতই বড় হোক, দৃঢ় সংকল্প, অধ্যবসায় এবং স্বপ্নের প্রতি বিশ্বাস থাকলে সাফল্যের দরজা একদিন না একদিন খুলবেই।