সিট ভাগাভাগি করল ছাত্রদল-ছাত্রশক্তি-ইশা-ছাত্র অধিকার, বাড়তি ছাত্রদের ৩৯ লাখ টাকা কার পকেটে?
রাজধানীর সরকারি তিতুমীর কলেজের একমাত্র ছাত্রাবাস শহীদ মামুন হলে সিট বণ্টন, অবৈধ আবাসন ও সিট বাণিজ্য নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। আবাসিক হলটি ৫১২ আসনের হলেও বর্তমানে এক হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী অবস্থান করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। কলেজ প্রশাসনের রাজস্ব খাতায় মাত্র রয়েছে ৫১২ শিক্ষার্থীর অস্তিত্ব থাকলেও শত শত শিক্ষার্থীর হিসাব তাদের কাছে নেই। এতে কলেজ প্রতিবছর আনুমানিক ৩৯ লাখ টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। এই বিপুল অংকের অর্থ কার পকেটে যাচ্ছে তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে।
দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও দাবির পর ২০২৫ সালের ১ জুলাই উদ্বোধন করা হয় শহীদ মামুন হল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী মামুন মিয়ার নামে নামকরণ হয় হলটির। কিন্তু উদ্বোধনের পর থেকেই সিট বরাদ্দ ও হল নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে নানা অভিযোগ সামনে আসতে থাকে।
সূত্র মতে, হলের সিট বণ্টনে ছাত্রদলের বিভিন্ন গ্রুপের প্রভাব ছিল স্পষ্ট। সিট বণ্টনের প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী আহ্বায়ক ইমাম হোসেনের প্যানেল ৮০ ও সদস্য সচিব সেলিম রেজার প্যানেল ১২০টি সিটের বরাদ্দ পেয়েছে। এছাড়া সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফ মোল্লার গ্রুপ ৪৫টি এবং যুগ্ম আহ্বায়ক হামদে রাব্বি আকরামের গ্রুপ পেয়েছে ১৫টি সিট। এ নিয়ে সংগঠনটির ভেতরেই অসন্তোষ দেখা দেয়।
সিট বণ্টন নিয়ে বিরোধের জেরে কলেজ ছাত্রদলের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। এতে অন্তত পাঁচজন আহত হন। ছাত্রদলের একাংশের অভিযোগ, প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে সদস্য সচিবপন্থী শিক্ষার্থীদের অধিকাংশ সিট দেওয়া হয়েছে। এর প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ অপর অংশ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
বিষয়টি আমরা জানি। তবে এসব ক্ষেত্রে আমাদের হাত-পা বাঁধা— অধ্যাপক ড. ছদরুদ্দীন আহমদ, অধ্যক্ষ, সরকারি তিতুমীর কলেজ
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হলে অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের মধ্যেও সীমিত সংখ্যক সিট বণ্টন করা হয়েছে। জাতীয় ছাত্রশক্তির জন্য পাঁচটি কক্ষে মোট ৩০টি সিট, ছাত্র অধিকার পরিষদের জন্য ৫টি এবং ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের জন্য একটি কক্ষে ৮টি সিট বরাদ্দ রয়েছে। তবে ইসলামী ছাত্রশিবির কোনো সিট নেয়নি। বাকি অধিকাংশ সিট ছাত্রদলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
সরেজমিনে শহীদ মামুন হলে গিয়ে দেখা যায়, ধারণক্ষমতার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ শিক্ষার্থী অবস্থান করছেন। ৭০৬, ৭০৯, ৮০১, ৮০২ ও ৯০৪ নম্বর কক্ষসহ প্রায় সবগুলো কক্ষেই ১২ থেকে ১৫ জন শিক্ষার্থীকে থাকতে দেখা যায়। যা নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি।
আরও পড়ুন: ওয়াসিম চত্বর থেকে বাঁশেরকেল্লা—আবর্জনা ও দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ শিক্ষার্থীরা
হলে ওঠার সময় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বার্ষিক ৮ হাজার টাকা করে সেশন ফি নেয় কলেজ প্রশাসন। সে হিসাবে ৫১২ শিক্ষার্থীর জন্য কলেজ প্রশাসনের রাজস্ব আয় প্রায় ৪০ লাখ ৯৬ হাজার টাকা। কিন্তু বর্তমানে এক হাজার শিক্ষার্থী অবস্থান করে থাকেন, তাহলে অতিরিক্ত ৪৮৮ শিক্ষার্থীর কাছ থেকেও একই হারে অর্থ নেওয়া হয়ে থাকলে তার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩৯ লাখ টাকা। এই অর্থ কার কাছে গেছে এবং কীভাবে আদায় হয়েছে— তার কোনো সরকারি হিসাব নেই।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, হলে অবস্থানরতদের বড় একটি অংশ ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের হলেও তাদের অনেকের সিট পাওয়ার কথা নয়। এছাড়া প্রভাবশালী ছাত্রনেতাদের নির্দেশনা অমান্য করলে কিংবা তাদের সঙ্গে বিরোধে জড়ালে হল ছাড়ার চাপ দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে প্রশাসনের নীরবতায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। ৫১২ আসনের হলে হাজারের বেশি শিক্ষার্থী অবস্থান করায় পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। হলের কর্মচারীরা জানান, একাধিক মোটর চালিয়েও পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে বৈদ্যুতিক চুলায় রান্না ও অতিরিক্ত ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে বিদ্যুৎ খরচও বেড়ে গেছে। নিয়মিত নষ্ট হচ্ছে হলের বিভিন্ন আসবাব ও অবকাঠামো।
অবৈধ আবাসিকদের বিরুদ্ধে কলেজ প্রশাসন বিভিন্ন সময় নোটিশ জারি করলেও এর বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। গত এপ্রিল মাসেও কেবল বৈধ শিক্ষার্থীদের হলে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও কোন ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন।
কোনো কক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী অবস্থান করলে প্রথমে ওই কক্ষের বৈধ আবাসিক শিক্ষার্থীদেরই এ বিষয়ে আপত্তি জানাতে হবে। এছাড়া কেউ যদি আমাদের কাছে নির্দিষ্টভাবে অভিযোগ করেন যে, তাদের কক্ষে অবৈধ বা অতিরিক্ত শিক্ষার্থী অবস্থান করছে, তাহলে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব— ফারুকুল ইসলাম, সহকারী অধ্যাপক, ইসলাম শিক্ষা বিভাগ ও হল তত্ত্বাবধায়ক
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলা বিভাগের এক শিক্ষার্থী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, হলে এখন কে বৈধ আর কে অবৈধ তা বোঝার উপায় নেই। প্রশাসন সবকিছু জানার পরও কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
সরেজমিনে কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের অনেকেই আনুষ্ঠানিক সিট বরাদ্দ ছাড়াই বিভিন্ন ছাত্রনেতা ও বড় ভাইদের মাধ্যমে হলে অবস্থানের সুযোগ পেয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, তিনি নিজ এলাকার ছাত্রদলের এক নেতার সুপারিশে হলে উঠেছেন। তবে হলে অবস্থানের জন্য কোনো ধরনের অর্থ লেনদেন হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। একইভাবে আরও কয়েকজন শিক্ষার্থীও হলে ওঠার প্রক্রিয়া সম্পর্কে কথা বললেও অর্থ লেনদেনের প্রশ্নে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে কলেজ জাতীয় ছাত্র শক্তির সদস্য সচিব আল নোমান নিরব বলেন, শহীদ মামুন হলে ৫১২টি আসনের বিপরীতে দীর্ঘদিন ধরে প্রায় দ্বিগুন শিক্ষার্থী অবস্থান করছে। অধিকাংশ কক্ষে নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে বেশি শিক্ষার্থী থাকায় বৈধ আবাসিক শিক্ষার্থীরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন এবং পড়াশোনার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।
আরও পড়ুন: গণমাধ্যমে ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’ দাবি করা সেই নাজিমের ফোনে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতার নানা প্রমাণ
তিনি বলেন, হলের আসন বণ্টনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবে একটি রাজনৈতিক সংগঠন হলের ওপর অস্বাভাবিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি ও সাংগঠনিক স্বার্থে ইচ্ছেমতো শিক্ষার্থীকে হলে তোলা এবং বের করে দেওয়ার অভিযোগও দীর্ঘদিনের।
তিনি আরও বলেন, হলের বৈধ আবাসিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে আমাদের সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত শিক্ষার্থী থাকলেও রাজনৈতিক কর্মী বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে আমরা কখনো গণরুম সংস্কৃতি চালু করিনি। আবাসন সংকটে থাকা কয়েকজন শিক্ষার্থীকে কেবল মানবিক বিবেচনায় সাময়িকভাবে থাকার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
আল নোমান নিরব বলেন, হলের ওপর কলেজ প্রশাসনের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত না হলে শিক্ষার্থীদের আবাসন ও একাডেমিক পরিবেশকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তাই স্বচ্ছ আসন বণ্টন, প্রশাসনিক নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
তিতুমীর কলেজ ছাত্রশিবিরের সভাপতি খাদেমুল ইসলাম সিয়াম বলেন, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে সরকারি তিতুমীর কলেজের শহীদ মামুন হল শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হলে হলকেন্দ্রিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার রাজনীতি শুরু হয়। সে সময় ছাত্রদল হলের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের উদ্যোগ নেয়। ছাত্রশিবির আদর্শিক অবস্থান থেকে এ ধরনের হল দখলের রাজনীতির বিরোধিতা করে। একপর্যায়ে আমাদের কাছে আসন ভাগাভাগির প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তা আমাদের নীতি ও আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় আমরা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করি।
সিট বণ্টনের প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী আহ্বায়ক ইমাম হোসেনের প্যানেল ৮০ ও সদস্য সচিব সেলিম রেজার প্যানেল ১২০টি সিটের বরাদ্দ পেয়েছে। এছাড়া সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফ মোল্লার গ্রুপ ৪৫টি এবং যুগ্ম আহ্বায়ক হামদে রাব্বি আকরামের গ্রুপ পেয়েছে ১৫টি সিট। এ নিয়ে সংগঠনটির ভেতরেই অসন্তোষ দেখা দেয়।
তিনি বলেন, আমরা সবসময় শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা, প্রয়োজনীয়তা এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে আসন বরাদ্দের পক্ষে অবস্থান নিয়েছি। তাই হল দখল ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের এই সংস্কৃতি থেকে নিজেদের দূরে রেখেছি। পরবর্তীতে ছাত্রদল এককভাবে হলের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। আসন বাণিজ্য, দলীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণে চাপ সৃষ্টি এবং রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের হলে রাখা বা বের করে দেওয়ার মতো অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।
তিতুমীর কলেজ ছাত্রশিবির মনে করে, আবাসিক হল কোনো রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান নয়; এটি শিক্ষার্থীদের আবাসন ও একাডেমিক পরিবেশ নিশ্চিত করার জায়গা। তাই হল পরিচালনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং প্রশাসনের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা জরুরি।
এ বিষয়ে জানতে তিতুমীর কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক ইমাম হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং কলটি কেটে দেন।
হলের তত্ত্বাবধায়ক ও ইসলাম শিক্ষা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ফারুকুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমরা এ বিষয়ে জানি, কিন্তু কোনো কক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী অবস্থান করলে প্রথমে ওই কক্ষের বৈধ আবাসিক শিক্ষার্থীদেরই এ বিষয়ে আপত্তি জানাতে হবে। এছাড়া কেউ যদি আমাদের কাছে নির্দিষ্টভাবে অভিযোগ করেন যে, তাদের কক্ষে অবৈধ বা অতিরিক্ত শিক্ষার্থী অবস্থান করছে, তাহলে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।
তিনি আরও বলেন, এক্ষেত্রে আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অন্যদিকে হলে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী অবস্থান করায় পানি, বিদ্যুৎসহ সার্বিক পরিচালন ব্যয়ও প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. ছদরুদ্দীন আহমদ বলেন, বিষয়টি আমরা জানি। তবে এসব ক্ষেত্রে আমাদের হাত-পা বাঁধা।