৩৫ অধ্যাপকে চলছে বেরোবি, ইংরেজিসহ ৬ বিভাগে অধ্যাপক শূন্য, ২১৬ শিক্ষকের ৩৪ জনই ছুটিতে
অধ্যাপক ছাড়াই চলছে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) ৬ বিভাগের শিক্ষা কার্যক্রম। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১৬ শিক্ষকের মধ্যে অধ্যাপক রযেছেন মাত্র ৩৫ জন। এর মধ্যে ৬টি বিভাগে নেই কোনো অধ্যাপক। যার ফলে অ্যাকাডেমিক মান, গবেষণা ও উচ্চশিক্ষা কার্যক্রমে প্রভাব পড়ছে বলে মনে করছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
জানা গেছে, বর্তমানে বেরোবির ২২টি বিভাগের মধ্যে ১৬টি বিভাগে মোট ৩৫ জন অধ্যাপক কর্মরত আছেন। এরমধ্যে বাংলা বিভাগে সর্বোচ্চ ৬ জন অধ্যাপক রয়েছেন। এছাড়া গণিত, ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ, মার্কেটিং ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ৩ জন করে এবং কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ও ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ২ জন অধ্যাপক রয়েছেন। অর্থনীতি, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, রসায়ন, ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং, জেন্ডার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ ও অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগে রয়েছেন একজন করে অধ্যাপক। অন্যদিকে ইংরেজি, ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, লোকপ্রশাসন, এবং ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমস (এমআইএস) বিভাগে কোনো অধ্যাপক নেই। এর মধ্যে এমআইএস বিভাগে একজন সহযোগী অধ্যাপকও নেই।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অধ্যাপকের অভাবে বিভাগগুলোতে অভিজ্ঞ শিক্ষকের অ্যাকাডেমিক দিকনির্দেশনা, গবেষণা তদারকি এবং উচ্চশিক্ষাভিত্তিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বিভাগীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও গবেষণা পরিচালনায়ও জটিলতা তৈরি হচ্ছে। একাধিক শিক্ষার্থী জানান, সিনিয়র শিক্ষকের সংকটের কারণে আমরা গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা ও অ্যাকাডেমিক পরামর্শ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। বিশেষ করে থিসিস, গবেষণা এবং উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ শিক্ষকের দিকনির্দেশনা পাই না।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ২১৬ জন। ৫৮ জন পিএইচডিধারী শিক্ষক রয়েছেন। এর মধ্যে শিক্ষা ছুটিতেই আছেন ৩৪ জন। সে হিসেবে প্রতি প্রায় ৩৯ জন শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছেন একজন শিক্ষক। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি ২০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক থাকার কথা। বেরোবিতে শিক্ষক সংকটের কারণে একজন শিক্ষককে গড়ে ৮ থেকে ১০টি কোর্স পরিচালনা করতে হচ্ছে। অতিরিক্ত ক্লাস, পরীক্ষা ও প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলে গবেষণায় পর্যাপ্ত সময় দিতে পারছেন না অনেক শিক্ষক। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রমও কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী সুজুতি মুর্মু বলেন, দেশের উচ্চশিক্ষার মূল চালিকাশক্তি হলো অভিজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের মেধা ও প্রজ্ঞা। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের যে চিত্র সামনে এসেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ২১৬ জন শিক্ষকের মধ্যে মাত্র ৩৫ জন অধ্যাপক, যা মোট শিক্ষকের মাত্র ১৬ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যার সীমাবদ্ধতা নয়, বরং এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগত মান ও ভবিষ্যতের জন্য এক অশনিসংকেত।
পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী হাফিজুর রহমান সিয়াম বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে মোট শিক্ষক সংখ্যা ২১৬ জন। এর মধ্যে অধ্যাপক রয়েছেন মাত্র ৩৫ জন, অর্থাৎ মোট শিক্ষকের প্রায় ১৬.২%। অধ্যাপকরা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক নেতৃত্ব, গবেষণা, পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, উচ্চতর গবেষণা তত্ত্বাবধান এবং নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ফলে অধ্যাপকের তুলনামূলক কম উপস্থিতি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক অ্যাকাডেমিক সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। আমি মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘমেয়াদি অ্যাকাডেমিক উন্নয়নের স্বার্থে যোগ্য শিক্ষকদের যথাসময়ে পদোন্নতি, শূন্য পদে নিয়োগ এবং গবেষণাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষক সংকট ও পদোন্নতি-সংক্রান্ত বিদ্যমান জটিলতা দ্রুত সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ প্রত্যাশা করছি।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলী বলেন, পদ সৃষ্টি করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। যখন এই বিভাগগুলো চালু হয়, তখন প্রতিটি বিভাগে একজন করে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষক নিয়োগ দেওয়ার কথা ছিল। তবে সে সময় অধ্যাপক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল কি না, তা আমার জানা নেই। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর তুলনায় শিক্ষক সংখ্যা অনেক কম। অ্যাকাডেমিক মানোন্নয়নের জন্য বিষয়টি ইউজিসিকে জানানো হয়েছে। আশা করছি, তারা দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।