০২ জুলাই ২০২৬, ১১:৫০

ইবি শিক্ষক নিয়োগে রিটেইক ইস্যু: অযোগ্যতা মানতে নারাজ সিনিয়র শিক্ষকেরা

ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়   © টিডিসি ফটো

নতুন উপাচার্য দায়িত্ব গ্রহণের পরে শিক্ষক সংকট নিরসনে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পূর্বে ঘোষিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিউনিকেশন অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম, ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং এবং আইসিটি বিভাগের সম্পন্ন হয়েছে শিক্ষক নিয়োগ বোর্ড। তন্মধ্যে জার্নালিজম এবং ফিন্যান্স বিভাগে প্রভাষক পদে মোট ৩ জন প্রার্থীকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও সাময়িক স্থগিত করা হয়েছে আইসিটি বিভাগের শিক্ষকের নিয়োগপত্র।  

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ২৯ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি বিভাগে প্রভাষক নিয়োগ বোর্ড অনুষ্ঠিত হয়। লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর একজন প্রার্থীকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু অভিযোগ ওঠে। তন্মধ্যে প্রার্থীর শিক্ষাজীবনে একটি কোর্সে রিটেইক এবং মানোন্নয়ন থাকায় তার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। উক্ত প্রার্থী ফিরোজা নাজনীন প্রথম বর্ষে একটি কোর্সে ফেল করায় পরবর্তীতে তিনি সেই কোর্সে রিটেইক পরীক্ষা দেন এবং কয়েকটি কোর্সে মানোন্নয়ন পরীক্ষা দেন। এছাড়া উক্ত প্রার্থী একই বিভাগের অধ্যাপক ড. জাহিদুল ইসলামের স্ত্রী হওয়ায় এই নিয়োগে স্বজনপ্রীতির অভিযোগও তোলা হয়েছে। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী যেকোন শিক্ষার্থী নিয়মের মধ্যে থাকলে রিটেইক এবং মানোন্নয়ন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ কর‍তে পারবে বলে নিয়ম রয়েছে। তাই রিটেইক বা মানোন্নয়ন থাকলেই যেকোন শিক্ষার্থীকে অযোগ্য বা দূর্বল শিক্ষার্থী বলতে নারাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র অধ্যাপকবৃন্দ। এছাড়াও শিক্ষক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে রিটেইক বা মানোন্নয়ন সম্পর্কিত কোন নির্দিষ্ট শর্ত উল্লেখ না থাকায় এখন এই ইস্যু নিয়ে বিতর্কের কোন সুযোগ নেই বলেও অভিমত তাদের। 

রিটেইক বা মানোন্নয়ন থাকলেই কোন শিক্ষার্থী দূর্বল বা অযোগ্য কিনা - জানতে চাইলে অর্থনীতি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী মোস্তফা আরিফ বলেন, কাঙ্খিত ফলাফল অর্জন করতে পারবে না বুঝতে পেরে অনেকেই চারটি প্রশ্নের চমৎকার উত্তর লিখলেও পঞ্চম প্রশ্নে যেয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে রিটেক রেখে আসে। অর্ডিন্যান্সে অনুযায়ী পরবর্তীতে রিটেইক দিয়ে কাঙ্খিত ফল অর্জন করে। আবার অনেকেই আছে নিয়মিত পড়াশোনা করেনা ফলে বাধ্যতামূলকভাবে রিটেইক দিতে হয়। একপাক্ষিকভাবে শুধু দূর্বল শিক্ষার্থীই রিটেক দেয় এভাবে বলার সুযোগ নেই। শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের ক্ষেত্রে আমরা প্রত্যাশা করি যে সম্পূর্ণ 'নীট এন্ড ক্লিন' কেওই আসুক। তবে বিভাগের প্ল্যানিং কমিটি অনুমোদন দিলে কারো কিছু বলার নেই। 

ফার্মেসি বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, রিটেইক এবং মানোন্নয়ন একটা অধিকার। কেও অসুস্থতার কারণে বা অন্য কোন কারণে পরীক্ষা দিতে না পারলে সে রিটেক দিবে না? কাঙ্খিত ফল না পেলে সে আবার পরীক্ষা দিয়ে তা অর্জনের চেষ্টা করতেই পারে। দ্বিতীয়ত, রিটেক বা মানোন্নয়ন থাকলে আবেদন করতে পারবে না—এমন কোন শর্ত না থাকলে, তাকে অযোগ্য বলা যাবে না; যেহেতু নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে এসবের ব্যাপারে কিছু বলা ছিলো না। নিয়োগ হওয়ার পর এসব বলা হচ্ছে মূলত মানুষকে দোষারোপ করার জন্য, আর কিছু না। 

জিয়া পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, রিটেইক বা ইম্প্রুভমেন্ট পরীক্ষা কখনোই কোন শিক্ষার্থীর দূর্বলতা চিহ্নিতের মানদন্ড বোঝায় না। সারাবছর ভালো পড়াশোনা করা সত্বেও পরীক্ষার দিন কোন শিক্ষার্থী মারাত্মক অসুস্থ হতে পারে, দূর্ঘটনা ঘটতে পারে, পরীক্ষায় উপস্থিতও নাও হতে পারে। এছাড়াও আনুষঙ্গিক কারণে পরীক্ষা খারাপ হতে পারে। যার ফলাফল আশানুরূপ হয়নি, সে পরবর্তীতে মানোন্নয়ন পরীক্ষা দিতেই পারে। এর মানেই যে সেই শিক্ষার্থী দূর্বল, তা মনে করার কোন কারণ নেই। 

হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগের সিনিয়র অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন তো একজনকে মানোন্নয়ন বা রিটেকের সুযোগ দিয়েছে। সে অনুযায়ী কেউ চাইলেই এটা দিতে পারে। এর মানেই সে খারাপ ছাত্র এমন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী কারোর যদি সেকেন্ড ডিভিশনও থাকে, সে পরে ইমপ্রুভ দিতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় এই আইন তৈরি করে না দিলে তো কেও রিটেক দিতো না। সেক্ষেত্রে শিক্ষক নিয়োগ বা চাকরির নিয়োগের ক্ষেত্রে এটা বাঁধা হওয়া উচিত বলে আমি মনে করিনা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন প্রশাসক অধ্যাপক ড. নুরুন নাহার বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিয়ে যারা চান্স পেয়েছেন, তারা প্রত্যেকেই মেধাবী। রিটেইক দিয়েছে মানে এই নয় যে সে খারাপ ছাত্র। রিটেক বা ইম্প্রুভমেন্ট দেওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। কেউ অসুস্থ হতে পারে, পারিবারিক সমস্যার হতে পারে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি থাকতে পারে এবং অমনোযোগীতাও হতে পারে৷  যেকোনো মুহূর্তে একজনের সাথে যেকোনো দুর্ঘটনা ও ঘটতে পারে। এই একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে তার সামগ্রিক শিক্ষাজীবনকে বিচার করা যাবে না। রিটেকের জন্য খারাপ ছাত্র বললে অবিচার করা হবে। 

এদিকে, প্রশাসনের প্রভাষক নিয়োগের শর্তে বলা হয়েছে, আবেদনকারীর এস.এস.সি/সমমান ও এইচ.এস.সি/সমমান উভয় পরীক্ষায় মোট জিপিএ ৯.০০ থাকতে হবে। তবে সনাতন পদ্ধতির ক্ষেত্রে উভয় পরীক্ষায় প্রথম বিভাগ থাকতে হবে। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর উভয় পরীক্ষায় সিজিপিএ ৩.৫০ (৪.০০ এর মধ্যে) থাকতে হবে। তবে সনাতন পদ্ধতির ক্ষেত্রে উভয় পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণী থাকতে হবে। শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোন স্তরে তৃতীয় শ্রেণী/বিভাগ থাকলে তিনি যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না। এম.ফিল/পিএইচ.ডি ডিগ্রীধারী প্রার্থীদের ক্ষেত্রে তৃতীয় শ্রেণীর শর্ত ব্যতীত (০৪ টি শিক্ষাস্তরের মধ্যে) যে কোন একটি শর্ত শিথিলযোগ্য। 

আলোচ্য প্রার্থী ফিরোজা নাজনীনের শিক্ষাগত যোগ্যতা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, রিটেক ও মানোন্নয়ন পরীক্ষার পর তিনি অনার্সে ৩.৫৯ এবং মাস্টার্সে ৩.৬৪ সিজিপিএ সহ দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। তিনি ২০২০ সাল থেকে গ্রীন ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগে শিক্ষকতা করছেন। তার জার্নাল এবং কনফারেন্স পেপারের সংখ্যা ১৬ টি এবং গুগল স্কলারেও তার সাইটেশন রয়েছে ১০০টির অধিক। অস্ট্রেলিয়া এবং আমেরিকাতে আন্তর্জাতিক কনফারেন্সের পেপার প্রেজেন্টশনে তিনি অংশ নিয়েছেন। এছাড়া সম্প্রতি ডিজিটাল প্যাথলজি নিয়ে পিএইচডি গবেষণা করতে পৃথিবীর বিখ্যাত জাপানের MEXT scholarship পেয়েছেন তিনি। 

নিয়োগ স্থগিতের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও মেধার মূল্যায়নের ব্যাপারে বিন্দু পরিমাণ সন্দেহ নেই। মূল মানদন্ড হিসেবে প্রার্থীদের লিখিত, মৌখিক পরীক্ষা এবং ডেমোনেস্ট্রেশন নেওয়া হয়েছে। যখন একাধিক প্রার্থীর ফলাফল সমান হয়েছে তখন আমরা তার শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা, বিভিন্ন পাবলিকেশনস, অন্যান্য কোয়ালিটি যাচাই করেছি। নিয়োগে স্বচ্ছতার ব্যাপারে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কাওকে এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থাকেও চ্যালেঞ্জ দিতে পারি। আইসিটি বিভাগের ব্যাপারে কিছু অভিযোগ আসায় তা সাময়িক স্থগিত রয়েছে, আমি বিষয়টি দেখছি।