‘জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় গণমাধ্যম ও যুবসমাজকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে’
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. রইছ উদ্দীন বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন আজ শুধু বাংলাদেশের নয়, পুরো বিশ্বের একটি বড় সংকট। এই সংকট মোকাবিলায় গণমাধ্যম ও যুবসমাজকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। পরিবেশ ধ্বংস, দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তব চিত্র গণমাধ্যমকে নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরতে হবে এবং তরুণদের সচেতনতা সৃষ্টি ও সামাজিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে হবে।
শনিবার (২৭ জুন) বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের উদ্যোগে ‘কম্বাটটিং ক্লাইমেট চেঞ্জ’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এ কথা বলেন। সেমিনারে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, গবেষক এবং বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুল আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. রইছ উদ্দীন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ড. সাবিনা শারমিন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এনভায়রনমেন্টাল ইনোভেশন অ্যান্ড রিসার্চ নেটওয়ার্ক এবং চিলড্রেন ওয়াচ ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী শাহ ইসরাত আজমেরী। আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন দ্য ডেইলি স্টারের প্রধান প্রতিবেদক পিনাকী রায়।
অধ্যাপক বলেন, ‘নির্বিচারে গাছ কাটা, পাহাড় ধ্বংস, নদী-খাল দখল ও দূষণের মাধ্যমে আমরা নিজেরাই পরিবেশের ক্ষতি করেছি। তাই পরিবেশ রক্ষার দায়িত্বও আমাদের সবার। আজকের এই সেমিনার তখনই সফল হবে, যখন আমরা প্রত্যেকে পলিথিন ও বর্জ্য যথাস্থানে ফেলব, পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখব এবং পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলব।’
তিনি বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও সবুজ ও পরিচ্ছন্ন করতে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি এবং ডাস্টবিন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ সফল করতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. সাবিনা শারমিন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন শুধু বাংলাদেশের নয়, সমগ্র বিশ্বের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই সংকট মোকাবিলায় গণমাধ্যম ও যুবসমাজকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। সচেতনতা সৃষ্টি, পরিবেশ রক্ষায় জনমত গঠন এবং পরিবেশ ধ্বংসের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে গণমাধ্যমের বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, শৈশবে যে সবুজ প্রকৃতি, নদী-খাল ও জীববৈচিত্র্য দেখেছি, আজ তার অনেকটাই বিলীন হয়ে গেছে। নির্বিচারে গাছ কাটা, পাহাড় ধ্বংস, নদী-খাল দখল এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহারের কারণে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। এর প্রভাব আজ বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে স্পষ্ট।
ড. সাবিনা শারমিন বলেন, পরিবেশ ধ্বংসের জন্য কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নয়, আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে দায়ী। তাই পরিবেশ রক্ষায়ও সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে। পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে এবং তরুণদের নেতৃত্বে একটি সচেতন সমাজ নির্মাণ করতে হবে।
গণমাধ্যমের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করে ট্রেজারার বলেন, পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়গুলো সাংবাদিকদের নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। একই সঙ্গে যুবসমাজকে পরিবেশ সংরক্ষণে বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণ করে একটি বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তুলতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
আলোচনায় পিনাকী রায় বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ভবিষ্যতের নয়, এটি বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা। রাজশাহী, খুলনা ও হাওরাঞ্চলের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ভিন্ন ভিন্নভাবে দৃশ্যমান। কোথাও খরার কারণে কৃষক সেচের পানির সংকটে কৃষি ছেড়ে আমচাষে ঝুঁকছেন, আবার কোথাও লবণাক্ততার কারণে কৃষিজমি অনাবাদি হয়ে পড়ছে। হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যায় একমাত্র ফসলও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, এসব বাস্তবতা গণমাধ্যমের মাধ্যমে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতে হবে। এতে বিজ্ঞানীরা মাঠপর্যায়ের সমস্যাগুলো সম্পর্কে জানতে পারবেন এবং কার্যকর সমাধান উদ্ভাবনের সুযোগ তৈরি হবে। গবেষণার ফল বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে তা কৃষকের কোনো উপকারে আসে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পিনাকী রায় আরও বলেন, ‘ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নদী-খাল দূষিত হওয়ার ফলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় হুমকি। তিনি বলেন, পৃথিবী আমাদের উত্তরাধিকার নয়; এটি আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছ থেকে ধার নিয়েছি। তাই পরিবেশ রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।’
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে শাহ ইসরাত আজমেরী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় শুধু গবেষণা বা দক্ষতা অর্জন যথেষ্ট নয়; প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখতে হবে। আজ একটি গাছের চারা রোপণ করলে ২০ বছর পর সেটি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি অসংখ্য মানুষকে উপকার করবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সবুজের সংকট ও জলবায়ু পরিবর্তন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই নতুন সবুজায়ন সৃষ্টি এবং বিদ্যমান গাছের যথাযথ পরিচর্যা নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব।