দক্ষিণ এশিয়ায় কমছে শিশুমৃত্যুর হার, বাড়ছে প্রতিবন্ধী শিশুর সংখ্যা
দক্ষিণ এশিয়ায় গত কয়েক দশকে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে এই সাফল্যের আড়ালেই সামনে এসেছে নতুন এক উদ্বেগজনক বাস্তবতা। শিশুমৃত্যুর হার কমার পাশাপাশি বাড়ছে শৈশবকালীন প্রতিবন্ধিতার হার, ফলে এ অঞ্চলের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখন এক দ্বৈত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। গবেষকদের মতে, আধুনিক চিকিৎসা ও উন্নত নবজাতক সেবার কারণে অনেক ঝুঁকিপূর্ণ শিশু বেঁচে গেলেও তাদের একটি অংশ দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক, মানসিক ও বিকাশগত জটিলতার ঝুঁকিতে থাকায় প্রতিবন্ধী শিশুর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।
সম্প্রতি 'Developmental Medicine & Child Neurology' জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. নুরুজ্জামান খাঁনসহ দেশি-বিদেশি গবেষকদের একটি দল। ড. নুরুজ্জামান খাঁন মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো হিসেবেও যুক্ত রয়েছেন।
গবেষণায় বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও আফগানিস্তানের ১৯৮৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়ের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এজন্য ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), বিশ্বব্যাংক, বিভিন্ন জরিপ, গবেষণা নিবন্ধ এবং আন্তর্জাতিক ডাটাবেসের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯০ সালে প্রতি হাজার জীবিত জন্মে পাঁচ বছরের কম বয়সী ১২৬ শিশুর মৃত্যু হলেও ২০২২ সালে তা কমে ৩৭ জনে নেমে এসেছে। অর্থাৎ, এ সময়ে শিশুমৃত্যুর হার প্রায় ৭০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। গবেষকদের মতে, উন্নত জনস্বাস্থ্যব্যবস্থা, টিকাদান কর্মসূচির সম্প্রসারণ, মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়ন, পুষ্টির উন্নতি, বিশুদ্ধ পানির সহজলভ্যতা এবং আর্থসামাজিক উন্নয়ন এ অগ্রগতির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ১৯৮৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রতি হাজার জীবিত জন্মে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যুহারের গড় ছিল ৬২ দশমিক ৮ জন। অন্যদিকে, ১৮ বছরের কম বয়সী প্রতি হাজার শিশুর মধ্যে গড়ে ৪৭ জন প্রতিবন্ধী হিসেবে জীবনযাপন করছে। গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, ২০০৫ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে শিশু মৃত্যুহার ও প্রতিবন্ধিতার প্রবণতা একে অপরকে অতিক্রম করে। ২০১০ সালের পর থেকে প্রতিবন্ধী শিশুর সংখ্যা শিশু মৃত্যুহারের তুলনায় দ্রুত বাড়তে শুরু করে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও আফগানিস্তান সব দেশেই এ প্রবণতা দেখা গেছে, যদিও সময়ের ক্ষেত্রে কিছু পার্থক্য রয়েছে।
গবেষণায় শিশু মৃত্যুহার ও প্রতিবন্ধিতার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য বিপরীত সম্পর্ক পাওয়া গেছে। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, শিশু মৃত্যুহার প্রতি একক কমার বিপরীতে প্রতিবন্ধিতার হার ০.২৪৫ একক বেড়েছে। এছাড়া স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বৃদ্ধি এবং অপরিণত বা প্রিটার্ম জন্মের হার বৃদ্ধির সঙ্গেও প্রতিবন্ধিতা বৃদ্ধির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্য ব্যয় প্রতি একক বাড়লে প্রতিবন্ধিতার হার ০.৮৭ একক এবং প্রিটার্ম জন্মের হার বৃদ্ধির সঙ্গে প্রতিবন্ধিতার হার ০.১৮২ একক বেড়েছে।
গবেষকদের মতে, আগে যেসব শিশু অকাল জন্ম, জন্মের সময় শ্বাসকষ্ট, সংক্রমণ, জন্মগত ত্রুটি কিংবা অন্যান্য জটিলতার কারণে মারা যেত, আধুনিক চিকিৎসা ও নবজাতক সেবার উন্নতির ফলে তাদের অনেকেই এখন বেঁচে যাচ্ছে। তবে এদের একটি অংশ দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক, মানসিক ও বিকাশগত জটিলতার ঝুঁকিতে থাকে। ফলে শিশুমৃত্যু কমলেও প্রতিবন্ধী শিশুর সংখ্যা বাড়ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ২৪ কোটি শিশু প্রতিবন্ধী হিসেবে জীবনযাপন করছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় ১৮ বছরের কম বয়সী প্রায় ১৪ শতাংশ শিশু কোনো না কোনো ধরনের প্রতিবন্ধিতার মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে সেরিব্রাল পালসি, বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধিতা, শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা এবং অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার উল্লেখযোগ্য।
গবেষণায় অপুষ্টি, নিকটাত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে, সংক্রমণ, সময়মতো প্রসবপূর্ব ও প্রসবোত্তর সেবা না পাওয়া, মাতৃস্বাস্থ্যসেবার সীমিত ব্যবহার এবং কম বয়সে অসংক্রামক রোগের বিস্তারকে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে অকাল জন্ম নেওয়া ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত ফলোআপ, প্রাথমিক হস্তক্ষেপ এবং পুনর্বাসন সেবার ঘাটতিও সমস্যাটিকে আরও জটিল করে তুলছে।
গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি, প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ পদ্ধতির অগ্রগতি, চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি এবং সচেতনতা বাড়ার কারণে অটিজম ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধিতাসহ বিভিন্ন সমস্যা আগের তুলনায় বেশি শনাক্ত হচ্ছে। ফলে প্রতিবন্ধী শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে উন্নত শনাক্তকরণ ব্যবস্থাও একটি ভূমিকা রাখছে।
গবেষকরা আরও বলেন, বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে বলে প্রতিবন্ধী শিশুর প্রকৃত চিত্র নির্ধারণে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অনেক উন্নয়নশীল দেশে এখনও প্রতিবন্ধিতা পর্যবেক্ষণের নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। তাই গবেষণার ফলাফলকে সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক হিসেবে নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক প্রবণতা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
গবেষক ড. মো. নুরুজ্জামান খাঁন জানান, দক্ষিণ এশিয়ায় শিশুমৃত্যু কমে যাওয়া নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। তবে একই সঙ্গে শৈশবকালীন প্রতিবন্ধিতার হার বৃদ্ধি নতুন জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিবন্ধিতা প্রতিরোধ, দ্রুত শনাক্তকরণ, প্রাথমিক হস্তক্ষেপ, পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি সহায়তামূলক সেবার ওপর গুরুত্বারোপ করা জরুরি।