তিনমাস মেয়াদী কমিটি দিয়ে ৬ বছর পার, শিক্ষক-ব্যবসায়ীসহ ছাত্রত্ব নেই ২৬ জনের
তিন মাসের জন্য গঠিত কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি) শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটি পার করেছে ছয় বছর। দীর্ঘ সময় পার করলেও নতুন কমিটি ঘোষণা না হওয়ায় সংগঠনটির নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ, নেতৃত্ব সংকট, ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। একই কমিটি বছরের পর বছর বহাল থাকায় শিক্ষক, ব্যবসায়ী ও আদুভাই দিয়েই চলছে বর্তমান কমিটি। পাশাপাশি যারা ক্যাম্পাসে অবস্থান করছে তারা সমালোচনার মুখে ‘আদুভাই কমিটি’ উপাধিও পেয়েছেন। নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রায় সাত মাস ধরে তা ঝুলে থাকায় প্রশ্ন উঠেছে সংগঠনটির নেতৃত্ব পুনর্গঠন নিয়ে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২১ সালের ১৭ জুন তৎকালীন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন ও সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামলের স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের ৩১ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি প্রকাশ করা হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের ২০০৭-০৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল মামুনকে আহ্বায়ক এবং ইংরেজি বিভাগের ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোস্তাফিজুর রহমান শুভকে সদস্য সচিব করা হয়। আহ্বায়ক আব্দুল্লাহ আল মামুন ২০১১ সালে লোক প্রশাসন বিভাগ ও সদস্য সচিব মোস্তাফিজুর রহমান ২০১২ সালে ইংরেজি বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে তাদের কারো নিয়মিত ছাত্রত্ব নেই বলে জানা গেছে।
এই কমিটির অধিকাংশ নেতার ছাত্রত্ব বহু বছর আগে শেষ হয়েছে। ৩১ সদস্যের এ কমিটিতে বর্তমানে নিয়মিত ছাত্রত্ব রয়েছে মাত্র চারজনের। এর মধ্যে সদস্য সচিব মোস্তাফিজুর রহমান শুভ ইংরেজি বিভাগের সান্ধ্যকালীন কোর্সে এবং যুগ্ম আহ্বায়ক মো. আবুল বাশার নৃবিজ্ঞান বিভাগের ওবিই কারিকুলামের মাস্টার্স প্রোগ্রামে অধ্যয়নরত রয়েছেন। এছাড়া যুগ্ম আহ্বায়ক আতিকুর রহমান সান্ধ্যকালীন কোর্সে ভর্তি রয়েছেন এবং সাইফুল ইসলাম অর্থনীতি বিভাগে স্নাতকোত্তর পরীক্ষা দিয়েছে বলে জানা গেছে।
দীর্ঘদিন পদ না পাওয়া ছাত্রদল নেতাদের অভিযোগ, কমিটির অন্তত ২৬ জনের বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রত্ব নেই। এ ছাড়া তাদের ৮ থেকে ১০ জন বাদে সবাই এখন নিষ্ক্রিয় রয়েছেন। কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক অহিদ উল্ল্যাহ অহিদ দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় অবস্থান করছেন। গিয়াসউদ্দিন আশিক একটি কোচিং সেন্টারের পরিচালক এবং গোলাম রাব্বানী আশিক ও শাফায়েত সজল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। এ ছাড়া কয়েকজন নেতার রাজনৈতিক পরিচয় ও সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংগঠনের একাংশের নেতাকর্মীরা।
গত ১৯ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে সিট বানিজ্যকে কেন্দ্র করে নিজ দলের কর্মীকে মারধর করায় যুগ্ম আহ্বায়ক আতিকুর রহমানকে দুই মাসের জন্য পদ স্থগিত করা হয় এবং এই ঘটনায় ছাত্রদলের একাংশের কর্মীরা বর্তমান আহ্বায়ক কমিটিকে ‘আদুভাই কমিটি’ আখ্যা দিয়ে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে বলেও জানা যায়।
দীর্ঘ সময় ধরে আহ্বায়ক কমিটি বহাল থাকা এবং নতুন কমিটি ঘোষণায় বিলম্ব হওয়ায় নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, নতুন কমিটি না হওয়ায় সংগঠনের অভ্যন্তরে বিভক্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিভিন্ন গ্রুপ ও উপগ্রুপ তৈরি হচ্ছে। তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে নতুন নেতৃত্ব ঘোষণার প্রত্যাশা করছেন।
শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক সাইদুল ইসলাম শাওন বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে কমিটি গঠন না হওয়ায় সাংগঠনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা এবং স্বাভাবিক গতি হারাচ্ছে। এর ফলে যোগ্য, মেধাবী ও ত্যাগী নেতাকর্মীরা নেতৃত্বের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ছেন। সংগঠনের অভ্যন্তরে বিভক্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিভিন্ন গ্রুপ ও উপগ্রুপ তৈরি হচ্ছে, যা সাংগঠনিক ঐক্য ও শৃঙ্খলার জন্য হুমকিস্বরূপ। যোগ্যতা, ত্যাগ, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং রানিং শিক্ষার্থীদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে নেতৃত্ব নির্বাচন করা হলে সংগঠন আরও গতিশীল, ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী হবে।’
শাখা ছাত্রদলের আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক মো. আবুল বাশার বলেন, ‘বর্তমানে সাধারণ শিক্ষার্থীরা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের নতুন, যোগ্য ও গতিশীল নেতৃত্বের প্রত্যাশায় রয়েছে। আমি আশাবাদী, খুব শিগ্গিরই রাজপথের পরীক্ষিত, ত্যাগী, নির্যাতিত নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠিত হবে।’
আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক মো. সাইফুল ইসলাম সৌরভ বলেন, ‘দলের দুঃসময়ে যারা আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন এবং শিক্ষার্থীদের পাশে ছিলেন, দল তাদের অবশ্যই মূল্যায়ন করবে।’
আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মোতাছিম বিল্লাহ পাটোয়ারী রিফাত বলেন, ‘বর্তমান কমিটি প্রায় অর্ধযুগ আগে গঠিত হয়েছে, ফলে নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে। দুঃসময়ে যারা সংগঠনকে আগলে রেখেছেন, তারা নতুন কমিটিতে মূল্যায়িত হবেন বলে প্রত্যাশা করি।’
এ দিকে শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মোস্তাফিজুর রহমান শুভ বলেন, ‘আহ্বায়ক কমিটি মূলত এত বছর থাকে না। নিয়মিত কমিটি হলে নতুন নতুন নেতৃত্ব বাড়ে এবং কি শিক্ষার্থীদের ভিতরে নতুন তারুণ্য দীপ্ততা বাড়ে, নেতৃত্বের গুণাবলিও বাড়ে কিংবা নতুন নতুন নেতা তৈরি হয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘প্রত্যাশা করি খুব দ্রুতই নতুন কমিটি উপহার দিবে। বিগত আন্দোলন সংগ্রামকে মূল্যায়ন, ত্যাগ, তিতিক্ষা, নির্যাতন এগুলো বিবেচনায় নিয়ে একটি শক্তিশালী কমিটি উপহার দিবে। সিনিয়র জুনিয়রের কম্বিনেশনের কমিটি, পাশাপাশি এটা বলা যায় শিক্ষার্থীবান্ধব একটি কমিটি আমরা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল প্রত্যাশা করি।’
এ দিকে নতুন কমিটি গঠনের লক্ষ্যে গত বছরের ২ নভেম্বর কেন্দ্রীয় ছাত্রদল তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল গঠন করে। কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদক শরীফ প্রধান শুভ, সহ-দপ্তর সম্পাদক আরিফুল ইসলাম আরিফ এবং মো. নাজমুচ্ছাকিব কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে নেতাকর্মীদের মতামত ও পদপ্রত্যাশীদের জীবনবৃত্তান্ত (বায়োডাটা) সংগ্রহ করেন।
তবে প্রায় সাত মাস পেরিয়ে গেলেও নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়নি। জানা গেছে, সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ বিভিন্ন পদে মোট ৫৪ জন নেতাকর্মী বায়োডাটা জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে ছাত্রলীগ থেকে ছাত্রদলে যোগ দেওয়া, অছাত্র, বহিষ্কৃত ও বিতর্কিত কয়েকজন নেতাকর্মীর নামও রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের প্রচার সম্পাদক শরীফ প্রধান শুভ বলেন, ‘নতুন কমিটি গঠনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। খুব শিগ্গিরই আপনারা এ বিষয়ে দেখতে পাবেন। কমিটির জন্য বিপুলসংখ্যক আবেদন জমা পড়েছে। এখানে প্রায় সবাই প্রার্থী। ৫ আগস্টের পর যারা সংগঠনে যুক্ত হয়েছেন, তারাও প্রার্থী; আবার প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরাও প্রার্থী। অর্থাৎ সব ব্যাচ ও প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। আমরা কমিটি গোছানোর কাজ করছি। কেন্দ্রীয় নির্দেশনা পেলেই নতুন কমিটি ঘোষণা করা হবে।” কতদিন বা কত মাসের মধ্যে নতুন কমিটি আসতে পারে জানতে চাইলে তিনি কোন নির্দিষ্ট সময় বলেননি।
কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-দপ্তর সম্পাদক মো. নাজমুচ্ছাকিব বলেন, ‘নির্বাচনের বিভিন্ন ব্যস্ততার কারণে নতুন কমিটি গঠন করতে এতদিন দেরি হচ্ছে। খুব শীঘ্রই নতুন কমিটি ঘোষণা করা হবে।’