২৬ মে ২০২৬, ১৬:০৩

কবি নজরুলই প্রাণ যে বিশ্ববিদ্যালয়ের

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো  © টিডিসি সম্পাদিত

১৯১৪-১৫ সালে কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর বৈচিত্র্যময় জীবনের একটি বছর কাটিয়েছেন ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার নামাপাড়া গ্রামে। এখানে তিনি যে বটগাছের নিচে বাঁশি বাজাতেন, সেই বটগাছের পাশেই শুকনি বিলের মাঝে ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ময়মনসিংহ শহর থেকে ঢাকা অভিমুখে ২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়। ৫৭ একরের বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বর্তমানে দুই শতাধিক শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে পড়াশোনা করছেন প্রায় দশ হাজার শিক্ষার্থী।

পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ই যেন কবি নজরুলের ছোঁয়ায় ও স্মৃতিতে জীবন্ত। কবি নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্মের নাম ও স্মৃতি ব্যবহার করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থাপনা, ম্যুরাল ও কর্মযজ্ঞে। উপাচার্যের বাসভবনের নাম ‘দুখু মিয়া’ বাংলো, যেটি কবির ডাকনাম। বাংলোটির ফটকে একটি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে রয়েছে কবি নজরুলের একটি ম্যুরাল।

এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কবি নজরুলের দৃষ্টিনন্দন একটি ভাস্কর্য। শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভের নাম ‘চির উন্নত মম শির’, যেটি কবির বিদ্রোহী কবিতার একটি লাইন। ছাত্র-ছাত্রীদের চারটি হলের নামই কবি নজরুলের সাহিত্যকর্ম ও সৃষ্টিসত্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত। দুটি হল কবি নজরুলের কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নিবীণা’ ও ‘দোলনচাঁপা’ নামে এবং অপর দুটি হলের নাম রাখা হয়েছে নজরুলের কবিতা ও সাহিত্যকর্মের অনুষঙ্গ থেকে ‘বিদ্রোহী’ ও ‘শিউলিমালা’।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারের নাম কবির গল্পগ্রন্থের নামে ‘ব্যথার দান মেডিকেল সেন্টার’। এছাড়াও কেন্দ্রীয় ক্যাফেটেরিয়ার নাম কবির কাব্যগ্রন্থ এর নামে ‘চক্রবাক’। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে রয়েছে নজরুলের বইয়ের জন্য আলাদা কর্নার, রয়েছে নজরুলের গল্প, উপন্যাস, জীবনীসহ বিপুল বইয়ের ভাণ্ডার।

ক্যাম্পাস থেকে ভালুকা ও ময়মনসিংহগামী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বাসগুলোর নামেও নজরুলের সাহিত্যকর্মের নামের সাথে মিল রাখা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিদিন যাতায়াত করে বিদ্রোহী, ধুমকেতু, ঝিঙে ফুল, প্রভাতী, বাঁধনহারা, বিদ্যাপতি, প্রলয় শিখা, দক্ষিণ হাওয়া, সওগাত, সাম্যবাদী প্রভৃতি নামের বাস।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয় ‘গাহি সাম্যের গান মুক্তমঞ্চ’, ‘চুরুলিয়া মঞ্চ’ ও ‘জয়ধ্বনি মঞ্চে।’ ‘গাহি সাম্যের গান’ ও ‘জয়ধ্বনি’ শব্দ দুটি চয়ন করা হয়েছে কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য প্রচলিত বৃত্তিগুলোর নামকরণও করা হয়েছে কবি পরিবারের সদস্যদের নামানুসারে, যেমন— ‘প্রমিলা বৃত্তি', ‘বুলবুল বৃত্তি', ‘কাজী অনিরুদ্ধ বৃত্তি’।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬টি অনুষদের অধীনে ২৫টি বিভাগে পাঠদান কার্যক্রম চলমান রয়েছে। শিক্ষার্থীরা এখানে আইন, নাট্যকলা, চারুকলা, সঙ্গীত, চলচ্চিত্র নির্মাণ ও সাহিত্যের পাশাপাশি বিজ্ঞান, ব্যবসায় প্রশাসন ও সামাজিক বিজ্ঞানের বিষয়গুলো পড়ার সুযোগ পান। তবে শিক্ষার্থীরা যে বিভাগেই পড়ুক, নজরুলকে জানার স্বার্থে প্রতিটি বিভাগেই ‘নজরুল স্টাডিজ’ নামে একশত নম্বরের বাধ্যতামূলক একটি কোর্স পড়ানো হয়। এছাড়াও নজরুলের সাহিত্যকর্ম, বিভিন্ন গান, কবিতা, উপন্যাস, নাটক সর্বোপরি তার জীবনী এবং জীবনকর্মের ওপর উচ্চতর গবেষণার জন্য রয়েছে ‘ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজ’।

নজরুল জন্মজয়ন্তীতে সভা, সেমিনার ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে কবিকে স্মরণ করে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার। অনুষ্ঠানে নজরুল স্মৃতি সংরক্ষণ ও গবেষণা কর্মে অবদান রাখার জন্য দেশ-বিদেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের হাতে তুলে দেওয়া হয় ‘নজরুল পদক।’

কবি নজরুলের ১২৭ তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আজ সোমবার (২৫ মে) বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি নজরুল ভাস্কর্যে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান জানান, এবছর পবিত্র ঈদ-উল-আযহা ও গ্রীষ্মকালীন অবকাশ উপলক্ষে ক্যাম্পাস ছুটি থাকায় নজরুল জন্ম-জয়ন্তীর মূল আয়োজন বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পর আগামী ২৪ ও ২৫ শে জুন অনুষ্ঠিত হবে।