১৮ মে ২০২৬, ১০:১৩

জন্ম একসঙ্গে, ববিতে পড়েছেন একই বিভাগে—এবার যমজ ভাই পড়বেন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ে

শিক্ষকের সঙ্গে জমজ দুই ভাই মো. আতিকুর রহমান ও মো. আশিকুর রহমান  © সংগৃহীত

পড়েছেন একই স্কুল, একই কলেজে, একই ইউনিভার্সিটির একই বিভাগের ছাত্র ছিলেন। দুজনই ছিলেন ডিপার্টমেন্টের টপার। এবার উচ্চ শিক্ষার জন্য দুজনই পাড়ি দিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রে। এমন সাফল্যমণ্ডিত গল্পটি বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে মেধাবী দুই যজম ভাই মো. আতিকুর রহমান ও মো. আশিকুর রহমান।

ফুল ফান্ডেড স্কলারশিপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি করতে যাচ্ছেন মো. আতিকুর রহমান যাচ্ছেন। তিনি পড়বেন ইউনিভার্সিটি অফ ফ্লোরিডাতে। আর মো. আশিকুর রহমান যাচ্ছেন ‘অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে।

জানা গেছে, মো আতিকুর রহমান বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের ২০১৭-১৮ সেশনের শিক্ষার্থী ছিলেন। আর মো আশিকুর রহমান ২০১৮-১৯ সেশনের শিক্ষার্থী। দুই ভিন্ন ব্যাচে পড়লেও অর্জনের জায়গায় ছিল দারুণ মিল। দুজনই নিজ নিজ ব্যাচে ‘ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট’ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন।

শিক্ষক ও সহপাঠীদের কাছে তারা পরিচিত ছিলেন মেধাবী, বিনয়ী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থী হিসেবে। সহপাঠীরা জানান, তারা দুই ভাই প্রচন্ড মেধাবী, লাজুক, নম্র ও সবার প্রতি শ্রদ্ধাশীল।

তাদের এই সাফল্যের পথ সহজ ছিল না। দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি, কঠোর পরিশ্রম, গবেষণার প্রতি আগ্রহ এবং অ্যাকাডেমিক দক্ষতা উন্নয়নের মধ্য দিয়েই নিজেদের তৈরি করেছেন তারা। নানা সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত

শিক্ষক খোরশেদ আলমের সঙ্গে যজম দুই ভাই

বিশ্বমানের গবেষণার অঙ্গনে জায়গা করে নিয়েছেন এই দুই ভাই। আতিক ও আশিকের এই অর্জনে গর্বিত পুরো বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার।

তাদের এই অনন্য সাফল্য নিয়ে সাংবাদিক আতিকুর রহমান বলেন, ‘আতিক-আশিকের জীবনের গতি ইন্টারেস্টিং। একই মায়ের পেটের জমজ ভাই। একই স্কুল, একই কলেজ, একই ইউনিভার্সিটি, একই ডিপার্টমেন্ট। দুইজনই ডিপার্টমেন্টের টপার। দুইজনই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডির জন্য ফুলফান্ড পেয়েছে (ভিন্ন দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে)। দুজনেরই ভিসা কনফার্ম। আন্টি (ওদের আম্মু) মোটামুটি একজীবন ভয়াবহ সংগ্রাম করলেন। আন্টির প্রতি সালাম।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আতিক-আশিকের মাইন্ডসেটের আজীবন ভক্ত আমি। আমার বিশ্বাস, ওরা একদিন নিজেদের সামর্থ্যের বাইরে চলে যাবে।

‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়’; আতিক-আশিকের স্বপ্নের দ্বিগুণ হবে। মনটা খারাপ লাগছে এটা ভেবে, ইদে বাড়িতে গেলে আতিক আশিকই সবার আগে ফোন দিত। নদীর পাড়ে ওদের বাড়ি। অনেকবার গিয়ে খাওয়াদাওয়া করেছি।কখনো ওইদিকে গেলে মনে হবে কোনোএক ডিঙি নৌকায় করে আমার বন্ধুরা অনেক দূরে চলে গেছে। তারপর হয়ত ভাবব, আবার কখনো দেখা হবে’, যোগ করেন তিনি।

পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, ‘প্রিয় Md Atikur Rahman  ও Md. Ashikur Rahman , একজন শিক্ষক হিসেবে অনুভূতি সত্যিই গর্বের ও আনন্দের । অভিনন্দন তোমাদের দু' জনকে । ওদের আজ ইউ.এস.এ এর ভিসা কন্ফার্ম হয়েছে। আতিক  যাচ্ছে University of Florida তে, আর আশিক যাচ্ছে Arizona State University তে, দুজনই ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টে  পিএইচডি করবে। সম্পর্কে ওরা দুই ভাই (টুইন)। পদার্থবিজ্ঞানের আগ্রহ ছিল প্রথম থেকেই। শিক্ষকদের আনন্দ আরও বেশি হয় যখন ছাত্ররা শিক্ষককে ছাড়িয়ে যাই।’

তিনি বলেন, ‘যে স্বপ্ন নিয়ে আমি নিজে জাপানে পিএইচডি শেষ করে ইউনিভার্সিটি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে একটা লম্বা সময় কাটিয়ে দেশে ফিরেছিলাম সেটা সত্যি হচ্ছে, এটা আমার জন্য বেশ আনন্দের। তবে আমি যখন জাপানে  IMS এর পজিশন ছেড়ে দেশে আসার কথা চিন্তা করি বেশিরভাগ মানুষই আমাকে নিষেধ করেছিল।  তারপরেও অনেকটা একান্ত নিজের সিদ্ধান্তেই দেশে আসা এবং বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করা। তবে বুঝতে খুব বেশিদিন সময় লাগেনি কেন  শুভাকাঙ্ক্ষীরা  দেশে আসার ব্যাপারে  কেন সাপোর্ট করেনি? দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে যাঁরা দেশে কাজ করতে চাই তাঁদের যে কি প্রতিকূল অবস্থা ফেস করতে হয় তা যে করেছে সেই জানে। যাইহোক, এ বিষয়ে অন্য একদিন লিখব।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘উচ্চশিক্ষা ও গবেষণাধর্মী শিক্ষার জন্য মূলত বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু আমাদের দেশের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা  খুবই অপ্রতুল। আমাদের অবস্থা তুলনামূলক আরও নিচে।  তারপরেও চেষ্টা করি আগ্রহী শিক্ষার্থীদের দেশে ও দেশের বাইরের কিছু কানেক্শন কাজে লাগিয়ে তাদের স্বপ্ন পূরণে পথ দেখাতে। যেমন, আমার এই দুই শিক্ষার্থীর জন্য বুয়েটের প্রফেসর ড. জিল্লুর রহমান ও বুয়েটের প্রফেসর ড. আবু সায়েম কাড়াল এর বেশ সহযোগিতা ছিল।’

তার ভাষ্য, ‘University of Barishal থেকে শিক্ষার্থী গিয়ে University of Florida বা Arizona State University-এর মতো  বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছে— এটি আমাদের জন্য গর্বের, আবেগের এবং গভীর তৃপ্তির মুহূর্ত। তাদের এই অর্জন আমাদের শিক্ষার্থীদের আগ্রহী ও আত্মবিশ্বাসী করে  স্বপ্ন দেখতে সাহস দেবে।  এত প্রতিকূলতার মাঝেও শিক্ষার্থীদের সফলতার সঙ্গী হতে পেরে আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি। বিদেশে অর্জিত অভিজ্ঞতায় দেশ ও সমাজের প্রতি আমার নিজের দায় কিছুটা হলেও শোধ করার চেষ্টা করছি।  ওদের সফলতা কামনা করি। দেশকে মনে রেখো, দেশের প্রতি দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থেকো।আমার রিসার্চ টীম ( www.karlbd.org )।’

নতুন স্বপ্ন আর সম্ভাবনাকে সঙ্গে নিয়ে এখন যুক্তরাষ্ট্র যাত্রার অপেক্ষায় থাকা দুই ভাইয়ের এই সাফল্যের গল্প বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থীদের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।