অর্থসংকট ও অবকাঠামোহীনতায় স্থবির হয়ে আছে কুবির সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো
বিশ্ববিদ্যালয় একেকটি জীবন্ত সমাজ, যেখানে চিন্তার জন্ম হয়, স্বপ্নের বিস্তার ঘটে আর সংস্কৃতির আলোয় মানুষ হয়ে ওঠার শিক্ষা নেয় তরুণেরা। সেই জায়গা থেকেই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পাসে প্রাণের স্পন্দন জাগিয়ে রেখেছে। সীমাবদ্ধতা, অর্থসংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা কিংবা প্রশাসনিক জটিলতা, সবকিছুর মধ্যেও তারা গান গাইছে, নাটক মঞ্চস্থ করছে, আবৃত্তির শব্দ ও যুক্তিতর্কে ক্যাম্পাস মুখর রাখছে। তবে আগের মতো আর প্রাণবন্ত আয়োজন নেই; কেমন যেন স্থবির হয়ে আছে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো।
গোধূলির শেষ আলো যখন লালমাই পাহাড়ে ঘেরা সবুজ ক্যাম্পাসে ধীরে ধীরে নেমে আসে, তখন কোথাও গিটারের মৃদু সুর ভেসে আসে, কোথাও নাটকের সংলাপ উচ্চারিত হয় আবার কোথাও কবিতার পঙক্তি বাতাসে মিশে যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বর্তমানে বিতর্ক, নাটক, আবৃত্তি, সংগীত ও নৃত্যকেন্দ্রিক একাধিক সংগঠন সক্রিয় রয়েছে। বিভিন্ন জাতীয় দিবস, সাংস্কৃতিক উৎসব, আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতা কিংবা সামাজিক সচেতনতামূলক আয়োজনের মাধ্যমে সংগঠনগুলো শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল বিকাশে ভূমিকা রাখছে। নতুন শিক্ষার্থীদের জন্যও এসব সংগঠন হয়ে উঠছে আত্মপ্রকাশের একটি নিরাপদ ও প্রাণবন্ত জায়গা।
তবে এই পথ একেবারেই মসৃণ নয়। সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্থায়ী চর্চাকক্ষের অভাব, পর্যাপ্ত অর্থায়নের সংকট, প্রয়োজনীয় বাদ্যযন্ত্র ও প্রযুক্তিগত সহায়তার সীমাবদ্ধতা তাদের কাজকে বারবার বাধাগ্রস্ত করে। অনেক সময় অনুশীলনের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা না পেয়ে খোলা মাঠ কিংবা ভবনের বারান্দায় বসেই প্রস্তুতি নিতে হয়।
কুবির সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘প্রতিবর্তন’-এর সভাপতি মাহমুদুল হাসান হৃদয় বলেন, ‘সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিবর্তন বিভিন্ন সম্ভাবনা নিয়ে এগিয়ে চললেও এর কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংকট বিদ্যমান। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো অপর্যাপ্ত বাজেট। কারণ প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা অনেক সময় একটি মানসম্মত অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য যথেষ্ট হয় না। ফলে সাজসজ্জা, সাউন্ড সিস্টেম, অতিথি আপ্যায়ন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে সীমাবদ্ধতা দেখা দেয়। সদস্যদের অনিয়মিত অংশগ্রহণও একটি বড় সমস্যা। কারণ একাডেমিক চাপ ও ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণে অনেক সদস্য নিয়মিত কার্যক্রমে যুক্ত থাকতে পারে না। পাশাপাশি ভালো মানের বাদ্যযন্ত্র, সাউন্ড সিস্টেম ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত সরঞ্জামের অভাব অনুষ্ঠানের মানকে প্রভাবিত করে। স্পন্সর ও পৃষ্ঠপোষকের অভাবের কারণেও বড় পরিসরে আয়োজন করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও প্রতিবর্তন শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বিকাশ, সাংস্কৃতিক চর্চা বৃদ্ধি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক পরিবেশ সমৃদ্ধ করার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।’
আরেকটি সংগঠন ‘অনুপ্রাস কণ্ঠচর্চা’-এর সাধারণ সম্পাদক নাজমুস সাকিব বলেন, ‘অনুপ্রাস হলো একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন। অনুপ্রাস কণ্ঠ চর্চার মাধ্যমে সংস্কৃতিকে ফুটিয়ে তোলে। বর্তমান প্রজন্ম সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে গিয়েছে, বর্তমান ছাত্র-ছাত্রীরা সেসব দিকেই বেশি ঝুঁকে যেখানে বস্তুগত বেনেফিট আছে। দ্বিতীয়ত দক্ষ কর্মী বা নেতাদের খুবই অভাব। তৃতীয়ত, আর্থিক সমস্যা। আমি দায়িত্বে আসার পর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোনো আর্থিক সহায়তা পাইনি।বিশ্ববিদ্যালয় যদি উপলক্ষকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে তাহলে শিক্ষার্থীরা সংস্কৃতি সম্পর্কে ভালো ধারণা পাবে।’
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও কুবির সংগঠনগুলো জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিয়েছে। বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অর্জিত সাফল্য, নাট্যোৎসবে অংশগ্রহণ কিংবা সংগীত পরিবেশনায় প্রশংসা সব মিলিয়ে সম্ভাবনার আলোও কম নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেও এখন তারা নিজেদের কার্যক্রম ছড়িয়ে দেওয়ার একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিবেটিং সোসাইটির সভাপতি আব্দুর রহমান আস সাদী বলেন, ‘কুমিল্লা ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটি, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতর্কচর্চার অন্যতম প্রধান প্ল্যাটফর্ম। আমরা নিয়মিত বাংলা ও ইংরেজি বিতর্ক, প্রশিক্ষণ কর্মশালা, আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতা এবং টেলিভিশন বিতর্কে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ক্যাম্পাসে যুক্তিবাদী ও নেতৃত্বগুণসম্পন্ন শিক্ষার্থী তৈরি করার কাজ করে আসছি। বর্তমানে ক্যাম্পাসে ক্লাবগুলোর সবচেয়ে বড় সংকট হলো নিয়মিত সদস্য তৈরী এবং অর্থায়ন। ক্লাবগুলোতে শিক্ষার্থীরা আগ্রহ নিয়ে সদস্য হয় কিন্তু একাডেমিক ও পারিপার্শ্বিক চাপে নিয়মিত হয়ে উঠতে পারে না। তা ছাড়া ক্লাবগুলোকে সচল রাখতে প্রশাসনিক নিয়মিত কোনো অর্থের বরাদ্দ নেই এবং কুমিল্লা অঞ্চলে স্পন্সর ব্যবস্থা করাও কষ্টসাধ্য।আমরা কুমিল্লা ইউনিভার্সিটির ডিবেটিং সোসাইটি চেষ্টা করছি নিয়মিত সেশন ও বিতর্ক আয়োজনের মাধ্যমে আমাদের সদস্যদের নিয়মিত করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক বৃদ্ধির মাধ্যমে আর্থিক স্বচ্ছলতা নিশ্চিত করা।’
আরেকটি সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘থিয়েটার’-এর সভাপতি তন্ময় সরকার বলেন, গুটি গুটি পায়ে পথ চলতে চলতে থিয়েটার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় আজ চতুর্দশ বর্ষে পদার্পণ করেছে। আমাদের শিল্পচর্চার মূল স্পন্দন হলো মঞ্চ। কিন্তু এক অদ্ভুত শূন্যতা এখন চারদিকে মঞ্চনাটকের প্রতি মানুষের কেমন যেন এক অনীহা তৈরি হয়েছে, দর্শক সারি এখন আর আগের মতো পূর্ণ থাকে না। যখন কোনো স্পন্সরের কাছে যাই তখন মঞ্চনাটকের কথা শুনলেই তারা পিছিয়ে যান। ফলে একটি সাধারণ প্রযোজনা মঞ্চে নামানোই আমাদের জন্য রীতিমতো এক কঠিন সংগ্রামে পরিণত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে সামান্য আর্থিক অনুদানটুকু মেলে, তা এতই নগণ্য যে আয়োজনের একটি ছোট্ট অংশের খরচও তা দিয়ে মেটানো সম্ভব হয় না। এমনও দিন যায়, যখন সাউন্ড ও লাইট প্রোভাইডারদের বিশাল অংকের বিল বকেয়া পড়ে থাকে, যা পরবর্তীতে আমাদের সদস্যদের মাসিক চাঁদা থেকে একটু একটু করে শোধ করতে হয়। দীর্ঘদিনের এই প্রাণবন্ত পথচলা আজ চরম আর্থিক প্রতিকূলতার কারণে ধীরে ধীরে স্থিমিত হয়ে আসছে। তবু আমাদের স্বপ্ন ফুরিয়ে যায়নি। আমরা বুক বেঁধে আছি সেই সুদিনের আশায় যেদিন আমাদের নাটকের মঞ্চগুলো আবারও দর্শকে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠবে, আর শিল্পের আলোয় দূর হবে সব হতাশা।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরামর্শক দপ্তরের পরিচালক ড. নাহিদা নাহিদ বলেন, ‘এখনো ছাত্র পরামর্শক দপ্তরের নির্দিষ্ট কোনো অর্গানোগ্রাম নেই। তাই শুরুতেই নিবন্ধিত সংগঠনগুলোকে বরাদ্দ দেয়া হয়। তবে এটা পক্রিয়াধীন। দপ্তর হয়ে গেলে তখন বাজেট থেকে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে এই খাতে। আশা করি, তখন শিক্ষার্থীরা ভালো একটি হেল্প পাবে।’
তবু প্রশ্ন রয়ে যায়, যে সংগঠনগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ হয়ে উঠতে পারে, তারা কী প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে? শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, প্রশাসনিক সহযোগিতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকলে কুবির সাংস্কৃতিক অঙ্গন আরও সমৃদ্ধ হতে পারে। একটি আধুনিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, নিয়মিত বাজেট এবং প্রশিক্ষণভিত্তিক কার্যক্রম এই সম্ভাবনাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।