কবি নজরুল কলেজেই কবিকে অবজ্ঞা, দুই দাবি শিক্ষার্থীদের
দেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামাঙ্কিত কবি নজরুল সরকারি কলেজে খোদ নজরুলই আজ উপেক্ষিত। কলেজটি কাজী নজরুল ইসলামের নামে নামকরণের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কলেজ প্রাঙ্গণে আজও নির্মিত হয়নি কবির কোনো ভাস্কর্য, স্মৃতিস্তম্ভ, নজরুল মঞ্চ কিংবা নজরুল কর্ণার। কবির সাহিত্য ও জীবনদর্শন জীবন্ত রাখতেই কলেজে নজরুল ভাস্কর্য ও নজরুল কর্নার স্থাপনের দাবি শিক্ষার্থীদের।
দানবীর খ্যাত হাজী মুহাম্মদ মহসিনের আর্থিক সহায়তায় ১৮৭৪ সালে পুরান ঢাকায় মোহসিনিয়া মাদ্রাসা (ঢাকা মাদ্রাসা) প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে চারবার নাম পরিবর্তনের পর ১৯৭২ সালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামানুসারে এ প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়। নামকরণের পর পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কলেজে এখনো নজরুল যথাযথ মর্যাদা পাচ্ছেন না।
নগরীর বুকে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামে একমাত্র বিদ্যাপীঠ কবি নজরুল সরকারি কলেজ। কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে কবির জীবন ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে জানার প্রবল আগ্রহ থাকলেও, ক্যাম্পাসে নেই নজরুলকে জানার ন্যূনতম কোনো সুযোগ। কবির নামে প্রতিষ্ঠিত এমন একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তার কোনো স্মৃতিচিহ্ন না থাকাটা শিক্ষার্থীদের কাছে বিস্ময় ও হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল নজরুলের জীবন ও সাহিত্য সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষকদের মাঝেও নেই তেমন কোনো ভ্রুক্ষেপ।
আরও পড়ুন: যোগ্য শিক্ষকের তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ায় তলানিতে বাংলাদেশ
যুগ প্রবর্তক ও বিরল প্রতিভার ধর কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন সাম্য, দ্রোহ ও প্রেমের কবি। জীবদ্দশায় নিদারুণ দুঃখ-কষ্ট সহ্য করেই অতিবাহিত হয়েছে তার জীবন। মৃত্যুর বহু বছর পেরিয়েও যেন দুখু মিয়ার দুঃখের অবসান ঘটেনি। কবির নামাঙ্কিত মহাবিদ্যালয়ে যখন দেখি তাকে একপ্রকার উপেক্ষিত করে রাখা হয়, তখন কষ্টের শেষ থাকে না।
কবি তার অবিনাশী কবিতা, গান ও অতিভাষণে পরাধীন ঘুমন্ত জাতিকে জাগিয়ে তুলেছিলেন প্রবল পরাক্রমে। কবির নামে প্রতিষ্ঠিত এই মহাবিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তার কোনো দৃশ্যমান স্মৃতিচিহ্ন না থাকাটা সত্যিই বিস্ময়কর। কলেজের মূল ফটকে একটি ম্যুরাল থাকলেও সারা বছর তা পড়ে থাকে চরম অযত্ন অবহেলায়, ঢেকে থাকে বিভিন্ন রকম পোস্টারে। দীর্ঘদিন ধরে রেলিং না থাকায় ম্যুরালটির উপর কুকুর উঠে বসে থাকে। এছাড়াও লক্ষীবাজারের ফুটপাতের দোকানীরা প্রতিদিন ম্যুরালের উপর ময়লা আবর্জনা ফেলে রাখে। সম্প্রতি কলেজের সি ভবনের দেয়ালে একটি নতুন ছবি আঁকা হলেও সেটির রক্ষণাবেক্ষণেও কর্তৃপক্ষের বিন্দুমাত্র নজর নেই।
কলেজের মূল ফটকে সারা বছর অনাদরে পড়ে থাকা ম্যুরালটির কদর কেবল নজরুলের জন্ম কিংবা মৃত্যু দিবস এলে কিছুটা বাড়ে। তবে সেই যত্নও ক্ষণস্থায়ী। প্রশাসন ও কলেজের কয়েক সংগঠনের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতেই সবাই যেন আবারও ভুলে যায় কবিকে। কলেজে বড় পরিসরে কোনো নজরুল জন্মোৎসবও উদযাপিত হয় না, কেবল সরকারি রীতি মেনে প্রতি বছর দায়সারাভাবে রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী পালন করা হয়। কলেজ প্রশাসনের এমন উদাসীনতা দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষার্থীদের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
ভাস্কর্য নির্মাণ করতে হলে সরকারি অনুমোদন লাগে। আমাদের এখানে নজরুলের ছবি রয়েছে ভাস্কর্য স্থাপন কিছুটা ঝামেলার। এটি নিয়ে নানা ধরনের ফতোয়া ও কথা উঠে। সরকারি সিদ্ধান্ত থাকলে তখন করা সম্ভব— অধ্যাপক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান, কলেজ অধ্যক্ষ
দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তার সাহিত্য আজও জীবন্ত হয়ে আছে। ত্রিশালে কবির নামে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ে কবির স্মৃতিকে ধারণ করার জন্য ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থাপনার নামকরণ করা হয়েছে তার কাব্যগ্রন্থ, কবিতা ও বিখ্যাত উক্তির মাধ্যমে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চ (গাহি সাম্যের গান মুক্তমঞ্চ), ক্যান্টিন (চক্রবাক), মেডিক্যাল সেন্টার (ব্যথার দান) ও স্মৃতিস্তম্ভ (চির উন্নত মম শির) সহ নানা স্থাপনায় নজরুলের সাহিত্যের স্পর্শ লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু, রাজধানীতে কবির নামে প্রতিষ্ঠিত এই কলেজে কবির প্রতি এমন অবজ্ঞা সাহিত্যপ্রেমীদের গভীরভাবে ব্যথিত করছে।
কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী রিজওয়ান ইসলাম বলেন, জাতীয় কবির নামে প্রতিষ্ঠিত একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান কবি নজরুল কলেজ প্রাঙ্গণে কবির কোনো স্থায়ী ভাস্কর্য বা নজরুল কর্নার না থাকাটা আমাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক। কর্তৃপক্ষ কেবল নামেই নজরুল শব্দটিকে ধারণ করেছে, কবির আদর্শ বা চেতনাকে নয়।
তিনি আরও বলেন, ক্যাম্পাসে একটি সুসজ্জিত নজরুল কর্ণার থাকলে আমরা তার বিদ্রোহী চেতনা ও সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে আরও গভীরভাবে জানার সুযোগ পেতাম। আমরা চাই দ্রুত কলেজে কবির একটি সম্মানজনক ভাস্কর্য নির্মাণ এবং আমাদের মতো নজরুল প্রেমীদের জন্য নজরুল চর্চার একটি স্থায়ী পরিবেশ। জাতীয় কবির স্মৃতিকে এভাবে অবজ্ঞার করার সংস্কৃতি আমরা আর দেখতে চাই না।
কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাঈম সরকার বলেন, কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন বিদ্রোহ, সাম্য, মানবতা ও ন্যায়বিচারের প্রতীক। তার নামে প্রতিষ্ঠিত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে আমাদের প্রত্যাশা থাকে, তার আদর্শ, চেতনা ও সাহিত্যচর্চা আমাদের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত হবে। তার সাহিত্য, দর্শন ও জীবনদর্শন নিয়ে পাঠচক্র, সেমিনার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও গবেষণামূলক কার্যক্রম কলেজে আরো বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: শিক্ষার্থীরা বাংলা-ইংরেজি রিডিং ও গণিতের যোগ-বিয়োগ না পারলে শিক্ষকের বেতন বন্ধ
তিনি আরও বলেন, আমরা অনেক কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখেছি বিভিন্ন স্থাপনার নাম কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ও কবিতার নামে নামকরণ করা হয়। কিন্তু আমাদের কলেজে শুধু মূল ফটকেই নজরুলের নাম রয়েছে, আর পুরো কলেজের কোথাও নজরুলের নামগন্ধ নেই। নজরুলের নামে নামকরণের এত বছর পরেও কলেজে একটি স্বতন্ত্র নজরুল কর্নার নেই। আমরা চাই, কলেজ কর্তৃপক্ষ দ্রুত একটি নজরুল কর্ণার প্রতিষ্ঠা করুক।
কলেজের সামনে নজরুলের ম্যুরালের রেলিং কবে নাগাদ স্থাপন হতে পারে এ বিষয়ে জানতে চাইলে কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেন, আমি আসলে দেখিনি রেলিংটি কবে ভেঙেছে। কলেজের গেটসহ কিছু কাজ এসেছে তখন রেলিংটি ঠিক করা হবে বলে জানান তিনি।
কলেজে নজরুল কর্ণার বা ভাস্কর্য স্থাপনের বিষয়ে তিনি বলেন, ভাস্কর্য নির্মাণ করতে হলে সরকারি অনুমোদন লাগে। আমাদের এখানে নজরুলের ছবি রয়েছে ভাস্কর্য স্থাপন কিছুটা ঝামেলার। এটি নিয়ে নানা ধরনের ফতোয়া ও কথা উঠে। সরকারি সিদ্ধান্ত থাকলে তখন করা সম্ভব।
নজরুল কর্ণার স্থাপন প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, আমাদের কলেজে জায়গার কিছুটা সংকট রয়েছে। নতুন ভবনের কাজ সম্পন্ন হলে নজরুল কর্ণার স্থাপনের হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।