তিনদফায় মেয়াদ বাড়িয়েও নির্ধারিত সময়ে শেষ হচ্ছে না ইবির মেগা প্রকল্পের কাজ
তিন দফায় মেয়াদ বাড়িয়েও নির্ধারিত সময়ে শেষ হচ্ছে না ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ৫৩৭ কোটি ৭ লাখ টাকার মেগা প্রকল্পের কাজ। প্রকল্পের অনুমোদনের পর দু'দফায় মেয়াদ বৃদ্ধির পর ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় তৃতীয় দফায় মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয় ২০২৬ সালের ৩১ জুন পর্যন্ত। তবে এবারও প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা না থাকায় চতুর্থ দফায় আরো দেড় বছর অর্থাৎ ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন করছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
জানা যায়, ২০১৮ সালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ৫৩৭ কোটি ৭ লাখ টাকার মেগা প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয় যার মেয়াদ ছিল ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। মেগাপ্রকল্পের আওতায় আবাসিক হল ও একাডেমিক ভবনসহ ৯টি ১০ তলা ভবন এবং ১১টি ভবনের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ কাজের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়। নতুন ভবনের মধ্যে দু’টি ছাত্র ও দুটি ছাত্রী হল, একটি একাডেমিক ভবন, শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের জন্য একটি করে নতুন ভবন, দ্বিতীয় প্রশাসন ভবন এবং তৎকালীন শেখ রাসেল হলের দ্বিতীয় ব্লক নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়।
এছাড়া ১১টি ভবনের সম্প্রসারণের মধ্যে রয়েছে দ্বিতীয় প্রশাসন ভবন, মীর মোশাররফ হোসেন একাডেমিক ভবন, ব্যবসা প্রশাসন অনুষদ ভবন, রবীন্দ্র-নজরুল কলা ভবন, দ্বিতীয় ডরমিটরি, পরমাণু বিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়া ভবন, চিকিৎসাকেন্দ্র, প্রভোস্ট কোয়ার্টার, টিএসসিসি, বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের পাঁচ তলার নতুন ভবন ও পুরোনো ভবনের সম্প্রসারণ এবং শিক্ষক-কর্মকর্তাদের নির্মাণাধীন ভবন। এছাড়াও পানি সমস্যা দূরীকরণে মেগা প্রকল্পের আওতায় গভীর নলকূপ ও রেইন ওয়াটার হারভেস্ট প্ল্যান্ট এবং বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধানে দুটি ৫০০ কেভিএ বৈদ্যুতিক সাব স্টেশন, সোলার প্যানেল স্থাপনও এ প্রকল্পের অধীনে রয়েছে।
প্রকৌশল অফিস সূত্রে জানা যায়, মেগা প্রকল্পের অনুমোদন ২০১৮ সালের জুন মাসে হলেও এর কাজ শুরু হয় ২০২১ সালের জুলাই মাসে। কাজ শুরুর কিছুদিন পর নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় নির্মাণাধীন ৯টি ১০ তলা ভবনের মধ্যে আটটির কাজ বন্ধ করে দেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দফায় দফায় চিঠি দেওয়ার কয়েক মাস পর কাজে ফেরে ঠিকাদাররা। ২০২২ সালে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত সে সময় সার্বিক কাজের অগ্রগতি ছিলে মাত্র ৩২ শতাংশ। ২০২২ সালে এর মেয়াদ শেষ হওয়ায় ১ বছর বাড়িয়ে ২০২৩ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল।
কাজ শেষ করতে না পারায় দ্বিতীয় দফায় আরও ১ বছর বাড়িয়ে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় নেওয়া হয়। তখন প্রকল্পের অগ্রগতি ছিলো মাত্র ৬০ শতাংশের মতো। দ্বিতীয় দফায় মেয়াদ বৃদ্ধির পরে ৯টি ১০ তলা ভবনের কাজ শেষ না হলেও ভবন সম্প্রসারণের কাজগুলো শেষ করে ঠিকাদাররা। মেগা প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ার কারণ হিসেবে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় সময় লাগা, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ, প্রশাসনে রদবদল এবং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে বর্তমান সময়ের নির্মাণসামগ্রীর দাম প্রকল্পের অনুমোদনের সময়কার দামের কয়েকগুণ বেশি হওয়ায় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। এতেও কাজের প্রতি অনীহা সৃষ্টি হয়েছে যা প্রকল্পের অগ্রগতি থামিয়ে দিচ্ছে বলে জানায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো।
তারা জানান, প্রকল্পের অনুমোদন হয়েছিলো ১৮ শিডিউলের রেটে কিন্তু কাজ করতে হচ্ছে ২৪ শিডিউলের রেটে। প্রকল্পের কাজের শেষ সময়ে এসে জিনিসপত্র কিনতে মোটা অংকের লসের মুখোমুখি হচ্ছেন তারা। নির্মাণ কাজ চলার মাঝপথে হুট করেই রডের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যায়। পাল্লা দিয়ে বেড়ে যায় সিমেন্টের দামও। অবকাঠামোর কাজ শেষ করে ইন্টারনাল কাজ শুরুর পর দেখা যায় বৈদ্যুতিক জিনিসপত্রের দামও বেশি। ১০ তলা ভবন গুলোর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস ছিলো লিফট কেনা। ১০ কোটি টাকা দিয়ে ইউরোপীয়ান ১৩টি লিফট কিনলেও তাদের বিল দেওয়া হবে ৬ কোটি টাকা। চোখের সামনে ৪ কোটি টাকা লস হচ্ছে তাদের। এসব কারণে কাজের প্রতি অনীহা এসেছে যা প্রকল্পের ধীরগতির কারণ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আলীমুজ্জামান টুটুল জানান, মেগা প্রকল্পের কাজগুলোর মধ্যে কিছু কাজ সমাপ্তের দ্বারপ্রান্তে আর কিছু কাজ পিছিয়ে রয়েছে। সবমিলিয়ে ৭০% কাজ শেষ হয়ে গেছে। কিছু কাজের ফিনিশিং বাকি আছে সেগুলোর কাজ চলছে। প্রকল্পের নির্ধারিত সময় জুনের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব নয় তাই আমাদের পিডি (প্রকল্প পরিচালক) মন্ত্রণালয়ের সাথে কথা বলবেন মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য। নইলে নির্মাণকাজ অসমাপ্ত রয়ে গেলে আবাসিক হল বা ভবনগুলো কোন কাজে আসবে না।
এমন বাস্তবতায় মেগা প্রকল্পের মেয়াদ আরেক দফা বৃদ্ধির আবেদন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। নির্মাণসামগ্রী ক্রয় অনেকাংশে সম্পন্ন হলেও শেষ পর্যায়ের কাজ সম্পন্নে সময়, শ্রমিক ও আর্থিক বরাদ্দ প্রয়োজন। এছাড়া প্রকল্প অনুমোদনের সময়ের কিছু ত্রুটি এখন সামনে আসায় প্রকল্প সংশোধনও করতে হবে। বিশেষ করে প্রকল্প অনুমোদনের সময় ভবনের বিষয়টি থাকলেও একাডেমিক ভবন এবং দ্বিতীয় প্রশাসন ভবনের হলরুম বা অডিটোরিয়ামের আসবাবপত্র গুলো এই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত নেই যা শেষ সময়ে এসে জটিলতা বাড়াচ্ছে। আসবাবপত্রের জন্য যে টাকা প্রয়োজন তা বরাদ্দ পেতে শেষ সময়ে এসে প্রকল্প সংশোধন করতে হবে। সার্বিক বিবেচনায় আরো দেড় বছর মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন ইতোমধ্যেই মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
জানতে চাইলে প্রজেক্ট ডিরেক্টর ড. নওয়াব আলী বলেন, ফিনিশিং কাজের জন্য সময় দরকার। প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য ৩ মাস আগে থেকে জানাতে হয় বিধায় সামগ্রিক ভাবে প্রকল্পের কাজ শেষ করার জন্য আমরা মন্ত্রণালয়ের কাছে আরো দেড় বছর সময় চেয়ে আবেদন করেছি। প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে প্রতি ১৫ দিন পরপর রিপোর্ট করা হয়৷ সরকারের আন্তঃমন্ত্রণালয় টিম এটা দেখভাল করে। ঠিকাদারের গাফিলতির কারণে মূলত প্রকল্পের কাজ শেষ করতে দেরি হচ্ছে। তাদের লোকসান হচ্ছে সেটাও সত্য। এখন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের একটি টিম আসবে; তারা পরিদর্শন করে মেয়াদ বৃদ্ধির ব্যাপারে সরকারের কাছে সুপারিশ করবে, তারপর সিদ্ধান্ত হবে।