১৮ মার্চ ২০২৬, ১২:২৫

ছয় মাসের সেমিস্টার শেষ চার মাসে, ‘ভমিটিং স্টাডির’ দিকে ঝুঁকছে শিক্ষার্থীরা

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়  © ফাইল ফটো

কোভিড-১৯ এর রেশ এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি দেশের উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলো। এই সংকট কাটিয়ে উঠার জন্য ত্বরান্বিত ডিগ্রির দিকে ঝুঁকছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের(ববি) তার ব্যতিক্রম নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি বিভাগ এক সেমিস্টার চার মাসেই শেষ করে দিচ্ছে, যেখানে সাধারণত ছয় মাসে সেমিস্টার শেষ হওয়ার কথা। অন্যদিকে ইয়ার ভিত্তিক ডিপার্টমেন্ট সাত থেকে আট মাসের মধ্যে শিক্ষাবর্ষ শেষ করছে। এই ক্রম-সংকোচন নীতির প্রভাবে শিক্ষার্থীদরা ঝুঁকছেন 'ভমিটিং স্টাডির' দিকে। যার ফলে শিক্ষার মান নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে।

'ভমিটিং স্টাডির' দিকে শিক্ষার্থীরা

ভমিটিং স্টাডি বা বমি বিদ্যা পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার আগে পড়া মুখস্থ করে এবং পরীক্ষার খাতায় তা লিখে (ভমিটিং) দিয়ে আসে। পরীক্ষা শেষে সেই পড়া শিক্ষার্থীদের মনের ভাণ্ডার থেকে হারিয়ে যায়। এই পদ্ধতিতে অর্জিত জ্ঞান মস্তিষ্কে স্থায়ী হয় না। পরীক্ষার পর কয়েকদিন যেতে না যেতেই সেই পড়া ভুলে যায় শিক্ষার্থীরা।

এতে করে শিক্ষার্থীরা কোনো বিষয়ের মূল তত্ত্ব ও তার প্রয়োগ সম্পর্কে গভীরভাবে জানতে না পেরে শুধু মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এবং এক সময় জ্ঞান অর্জনের মূলধারা থেকে সরে জান তারা।

শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ

ত্বরান্বিত শিক্ষাক্রমের সবচেয়ে বড়ো ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা। একটি সেমিস্টার শেষ করতে একজন শিক্ষার্থীর ক্লাস, প্রজেক্ট, অ্যাসাইনমেন্ট, ল্যাব ওয়ার্ক, মিডটার্ম ও প্রেজেন্টেশন ইত্যাদি অ্যাক্টিভিজম কাজ সম্পন্ন করতে হয়। ত্বরান্বিত শিক্ষাক্রমের শিক্ষার্থীরা এসকল কাজ সম্পন্ন করতে উপযুক্ত সময় পান না। যার ফলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার গভীরে যাওয়ার সুযোগ হয়ে উঠে না। এবং এতে শেখার সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাই।

একটি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে যে প্রিপারেটরি লিভ থাকে ত্বরান্বিত শিক্ষাক্রমে শিক্ষার্থীরা সেসময়টুকুও পাইনা এবং পরীক্ষা নিতে যে সময় প্রয়োজন, তা সংকুচিত করে ফেলা হয়। যার ফলে শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষায় পাস করার মতো করে প্রস্তুতি নিতে বাধ্য হন ও ভমিটিং স্টাডির দিকে ঝুঁকে যান। অনেক শিক্ষার্থীরা বই দিকে না ঝুঁকে সিনিয়রদের কাছ থেকে নোট নিয়ে এসে পরীক্ষার আগে পড়তে বসেন। যার ফলে বই থেকেও দূরে সরে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। সংকুচিত নীতির এপদ্ধতিতে অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে শিক্ষার্থীরা হিমশিম খেয়ে পরেন।

আর এই চাপ শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। উদ্বেগ, বিষণ্ণতা ও পড়াশোনায় অনীহার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশ্রাম ও নিজের মতো করে চিন্তা করার সুযোগ না পাওয়ায় সৃজনশীলতা ও সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা বিকশিত হওয়ার পথ রুদ্ধ হতে পারে। ঈদের ছুটি বা অন্যান্য দীর্ঘ ছুটিও এই ত্বরান্বিত শিক্ষাক্রমের কারণে প্রায় বিলুপ্ত, যা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়াচ্ছে।

শিক্ষার্থীরা জানান, ৬ মাসের সিলেবাস ৪ মাসের মধ্যে শেষ করতে হচ্ছে। ক্লাসের চাপ, বাড়ির কাজের চাপ এতটাই বেড়ে যায় যে আমরা কোনো টপিক সম্পর্কে বিস্তারিত জানার সময় পাই না। সবকিছু এত দ্রুতগতিতে এগোয় যে শিখতে গিয়ে আমরা হারিয়ে যাই।

এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিজম থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা

বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী অ্যাকাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অ্যাক্টিভিজম-এর সাথে যুক্ত থাকেন। এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক প্রোগ্রাম ও খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করে থাকেন। তবে, ত্বরান্বিত শিক্ষাক্রম ফলে অ্যাকাডেমিক পেশার সামাল দিতে দিতে শিক্ষার্থীরা এসকল অ্যাক্টিভিজম করার সুযোগ হয়ে উঠে না এবং অনেক সময় শিক্ষার্থীরা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন থেকে ছিটকে পড়ে যান। এবং শরীর চর্চার মতো খেলাধুলাও নিয়মিত চালিয়ে যেতে পারেন না।

অসম্পূর্ণ সিলেবাসে পরীক্ষা

ত্বরান্বিত শিক্ষা কার্যক্রম শুধু শিক্ষার্থীদেরকে প্রভাবিত করে না, এর প্রভাব শিক্ষকদের উপরও পড়ে। স্বল্প সময়ে সিলেবাস সম্পন্ন করার অনেক সময় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয় শিক্ষকদের। এতে করে ক্লাসের সংখ্যা যেমন কমে আসে তেমনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ টপিক গভীর ভাবে না পড়িয়ে শুধু আলোচনা করে চলেন যান তারা। আর এতে কার্যত অসম্পূর্ণ থেকে যায় পাঠ্যক্রম। আর শিক্ষার্থীরা ও সেসকল টপিক এত গুরুত্ব দিয়ে পড়েন না। 

শিক্ষার্থী না হয়ে হচ্ছেন পরীক্ষার্থী

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের এক সেমিস্টারে দুইটি মিড পরীক্ষা ও ফাইল পরীক্ষার পাশাপাশি ক্লাস টেস্ট (আইটেম/CT) ও ল্যাব টেস্ট দিতে হয়। সংকোচন নীতিতে এই সকল পরীক্ষা একটা পর একটা লেগেই থাকে। যার ফলে তারা শিক্ষার্থী না হয়ে শুধু হয়ে উঠেন পরীক্ষার্থী।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থীদের সাথে বললে তারা বলেন, ৪ মাস ৯ দিন আমাদের তৃতীয় বর্ষ প্রথম সেমিস্টার শেষ হয়। গত বছর ১৫ই ডিসেম্বর আমরা ৩-১ এর শেষ পরীক্ষাটি দিই। পরীক্ষা শেষ হওয়ার এক দিন পরেই আমাদের(৩-২) ক্লাস শুরু হয়ে যায়। তারপর গত বছর ১৮ ডিসেম্বর থেকে ৩ জানুয়ারি পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি থাকে। ছুটি থেকে ক্যাম্পাসে এসেই শুনি আমাদের প্রথম ও দ্বিতীয় মিড পরীক্ষা ফেব্রুয়ারির ১৫ তারিখে হবে। বিষয় এমন যে এক পরীক্ষা দিতে না দিতেই আরেক পরীক্ষা সামনে এসে পরলো। আবার এর ভিতরে আমাদের এক কোর্স টিচার আমাদের সিটি নেওয়ার কথা বলে। যদিও বা আমরা সিটির একদিন আগে ম্যাম কে বিষয়টার সম্পর্কে অবগত করি যাতে সিটি টা মিড এর পরে নেওয়ার যায়।

তারা আরো বলেন, আমাদের অবস্থা এখন এমন যে, আমরা শিক্ষার্থী না হয়ে এখন হয়ে পড়ছি পরীক্ষার্থী। এখন আবার শুনছি এপ্রিলে আমাদের (৩-২) ফাইল পরীক্ষা হবে। ম্যাথমেটিক্সের মতো অ্যানালিটিক বিষয়ে বারংবার পরীক্ষা দিতে আমরা হিমশিম খেয়ে পড়ি। পরীক্ষার চাপে অনেক সময় ৪-৭ ক্লাসে আমাদের কোর্স শেষ দিতে হয়।

ত্বরান্বিত উচ্চশিক্ষার অগ্রগতি, না কি বাড়তি বোঝা?, 'মানসম্মত' শিক্ষা দেওয়া সম্ভব?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর জবাব হলো 'না'। শিক্ষা একটি প্রক্রিয়া, যা উপলব্ধি করতে ও আত্মস্থ করতে সময় প্রয়োজন। যখন সেটুকু সময় দেওয়া হয় না, তখন শিক্ষা তার গভীরতা হারায়।

গবেষণাধর্মী প্রজেক্ট বা বড় অ্যাসাইনমেন্টের জন্য পর্যাপ্ত সময় না পাওয়ায় শিক্ষার্থীরা সেগুলোতে আন্তরিক হতে পারে না। সময়ের অভাবে তারা ইন্টারনেট থেকে তথ্য চুরি করা বা অপরিকল্পিত কাজ জমা দেওয়ার মতো পথ বেছে নেয়, যা শিক্ষার মানকে আরও হ্রাস করে।

শিক্ষকদেরও একই সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ সিলেবাস শেষ করতে হয়। ফলে তারা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময়, তাদের দুর্বলতা চিহ্নিত করে সাহায্য করা বা ক্লাসে আলোচনার সুযোগ কম পান।

এই ত্বরিত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে বের হওয়া একজন শিক্ষার্থী কর্মক্ষেত্রে গিয়ে নানান সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন। কারণ অগভীর জ্ঞান বাস্তব সমস্যা সমাধানের দক্ষতা হ্রাস পাই।

গতিময় ডিগ্রির ভিড়ে শিক্ষাপদ্ধতি কেমন হওয়া উচিত?

শিক্ষাক্রমকে গতিশীল করা জরুরি, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে মান বিসর্জন দিয়ে শুধু গতিকে প্রাধান্য দেওয়া হবে।

শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য, গভীর জ্ঞান অর্জনের সুযোগ এবং সামগ্রিক দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়টি মাথায় রেখে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি গ্রহণ করার দাবি বিশ্লেষকদের।

ত্বরান্বিত ডিগ্রিতে আমরা হয়ত 'পাশ করা' শিক্ষার্থী পাব, কিন্তু 'শিক্ষিত' মানুষ পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। এই বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন, যাতে সঠিক শিক্ষার পথটি খুঁজে বের করা যায়।