১৪ বছরের শিক্ষাজীবনে একদিনও ক্লাস মিস করেননি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী তাসমিয়া
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০২০–২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তাসমিয়া আক্তার নুরী দীর্ঘ চার বছরের অনার্স জীবনে একটি দিনও ক্লাস মিস না করে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তার এই অসাধারণ উপস্থিতির স্বীকৃতি হিসেবে বিভাগ থেকে তাকে “Award of Excellence” সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। পড়াশোনাতেও তিনি কৃতিত্বের পরিচয় দিয়ে মেধাতালিকায় চতুর্থ স্থান অর্জন করেছেন।
শুধু অনার্স জীবনেই নয়, তাসমিয়া আক্তার নুরীর পুরো শিক্ষাজীবনই নিয়মিত উপস্থিতির এক বিরল উদাহরণ। কিন্ডারগার্টেন থেকে শুরু করে হাইস্কুল পর্যন্ত টানা প্রায় ১০ বছর তিনি শতভাগ উপস্থিত ছিলেন। কলেজ জীবনে হাতেগোনা কয়েকদিন অনুপস্থিত থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের চার বছরের অনার্স জীবনে একদিনও ক্লাস মিস করেননি।
এ বিষয়ে তাসমিয়া আক্তার নুরী বলেন, ‘অনার্সে এসে আমার মূল প্রেরণা এসেছে আগের সময়ানুবর্তিতার রেকর্ড থেকেই। আমি পড়াশোনা করতে এবং নতুন কিছু শিখতে ভালোবাসি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অনেক জ্ঞানী মনে হয়, প্রতিদিন তাদের লেকচার থেকে নতুন কিছু জানার আগ্রহ থেকেই নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকতাম।’
তিনি বলেন, ‘শৈশব থেকেই সময়ানুবর্তিতা তার জীবনের অংশ হয়ে গেছে। কিন্ডারগার্টেন থেকেই আমি নিয়মিত ছিলাম। বাসা থেকেও সবসময় উৎসাহ দেওয়া হতো। এমনকি আত্মীয়দের বাসায় বা কোনো অনুষ্ঠানে ছুটির দিন ছাড়া যেতাম না।’
তসলিমা আরও জানান, হাইস্কুলে শতভাগ উপস্থিতির জন্য তিনি একটি দেয়ালঘড়ি উপহার পেয়েছিলেন। সেই সময় প্রতিদিন প্রায় দুই কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা হেঁটে একাই স্কুলে যেতেন। ঝড়-বৃষ্টি বা অসুস্থতার মধ্যেও ক্লাসে উপস্থিত থাকার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন।
অনার্সে জীবন নিয়ে তিনি বলেন, ‘এই চার বছরে অনেকবার অসুস্থ হয়েছি, জ্বর নিয়েও ক্লাস করেছি। ঝড়-বৃষ্টির দিনও গেছে। কাদামাটির পথে দুই কিলোমিটার হাঁটা সহজ ছিল না। তবুও আল্লাহর রহমতে বড় কোনো অসুস্থতা না থাকায় নিয়মিত থাকতে পেরেছি এবং পরিশেষে আল্লাহর রহমতে চতুর্থ স্থান অধিকার করে অনার্স জীবন শেষ করতে পেরেছি।’
পারিবারিক অনুপ্রেরণার কথাও তুলে ধরেন তিনি বলেন, ‘আমার পরিবার শিক্ষিত না হলেও পড়াশোনার ব্যাপারে তারা খুব উৎসাহ দিয়েছেন। আমি আমার গোষ্ঠী এমনকি গ্রামের একমাত্র মেয়ে যে ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। আমার কৃষক পরিবারই আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ও গর্ব।’
‘হাইস্কুলে শতভাগ উপস্থিতির জন্য আমি একটি দেয়ালঘড়ি উপহার পেয়েছিলাম। সেই সময় প্রতিদিন প্রায় দুই কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা হেঁটে একাই স্কুলে যেতাম। ঝড়-বৃষ্টি বা অসুস্থতার মধ্যেও ক্লাসে উপস্থিত থাকার চেষ্টা চালিয়ে গেছি।’—তাসমিয়া আক্তার নুরী
নিজের পড়াশোনার অভ্যাস সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি সময়ের কাজ সময়ে করার চেষ্টা করি। ছোটবেলা থেকেই খাওয়া-দাওয়া, নামাজ ও পড়াশোনা নির্দিষ্ট সময় মেনে করার ফলে একটা বায়োলজিক্যাল ক্লক তৈরি হয়েছে।’
সম্মাননা পাওয়ার অনুভূতি প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘পরিশ্রমের স্বীকৃতি হিসেবে সম্মাননা পাওয়া অবশ্যই আনন্দের। ‘Award of Excellence’ দেওয়ার জন্য ডিপার্টমেন্টের প্রতি কৃতজ্ঞ। এ ছাড়াও ব্যাচমেটদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।’
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে পরামর্শ দিতে গিয়ে তাসমিয়া বলেন, ‘অনেকে মনে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা সময়ের অপচয়, কারণ অনেক কিছু ইন্টারনেটে পাওয়া যায়। কিন্তু শিক্ষকরা যেভাবে গভীরভাবে বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করেন তা অসাধারণ। আমরা যদি স্বীকার করতে পারি যে আমরা কম জানি এবং শিক্ষকদের কাছ থেকে শেখার সুযোগ আছে, তাহলে নিয়মিত ক্লাসে আসার প্রেরণা তৈরি হবে।’
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আল্লাহ সহায় হলে একটি ভালো সরকারি চাকরি করতে চাই এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী দেশের কাজে অবদান রাখতে চাই এবং সবার কাছে দোয়া প্রত্যাশী।’