নিজ বিভাগে ইবি শিক্ষককে হত্যা, নেপথ্যে কী?
নিজ বিভাগে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদভুক্ত সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনাকে গলা কেটে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ইবির শিক্ষিকাকে হত্যার পরে ঐ কক্ষেই নিজেও আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন অভিযুক্ত কর্মচারী ফজলুর রহমান। নারী শিক্ষকের এই মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে চলছে আলোচনা। কেন একজন কর্মচারীর হাতে নিজের অফিস কক্ষেই প্রাণ হারালেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিকা, সেই প্রশ্ন এখন সবার মুখে মুখে।
বুধবার (৪ মার্চ) বিকেল ৪ টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদ ভবনের দ্বিতীয় তলায় সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি আসমা সাদিয়ার অফিস রুমে এ ঘটনা ঘটে। এসময় বিভাগের চেয়ারম্যানের রুম থেকে চিৎকার শুনতে পেয়ে ভবনের নীচে দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্য ও কয়েকজন শিক্ষার্থী এগিয়ে যান। তারা অফিস কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ দেখতে পান।
পরবর্তীতে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে তারা রুমের মেঝেতে আসমা সাদিয়া কে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। এসময় অভিযুক্ত কর্মচারী ফজলু নিজের গলায় ছুরি চালাচ্ছিলেন বলেও দেখতে পান তারা। খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি ও ইবি থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে উভয়ের রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার করে ইবি মেডিকেলে প্রেরণ করে। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাদের কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক আসমা সাদিয়া কে মৃত ঘোষণা করেন।
এসময় ভবনের নীচে কর্তব্যরত আনসার সদস্য আসমত আলী বলেন, আমরা এখানে ৪ জন মিলে গল্প করছিলাম। হঠাৎ করে আমরা বাঁচাও বাঁচাও শব্দ শুনি। তারপর একসঙ্গে ভবনের ওপরে উঠে চেয়ারম্যানের রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে ডাকাডাকি করি। পরে দরজা না খুললে ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করি। তারপর দেখি যে ম্যাডাম উপুড় হয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় শুয়ে আছেন। আর কর্মচারী নিজে নিজেই গলায় ছুরি চালাচ্ছেন। পরে আমরা প্রশাসনের কাছে ফোন দেই।
এই ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও থেকে আলামত সংগ্রহ করেছে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ, ডিবি পুলিশ, সিআইডি ও র্যাবের একটি টিম।
‘বিভাগীয় সভাপতির সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের কারণে এক দেড় মাস আগে বিভাগীয় কমিটির সিদ্ধান্তে তাকে সমাজকল্যাণ বিভাগ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলি করা হয়।’
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন যাবৎ বেতন ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি আসমা সাদিয়ার সঙ্গে রেষারেষি চলছিল কর্মচারী ফজলুর। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী কর্মচারী নয় বরং ডে-লেবার হিসেবে নিয়োগ পেলেও দীর্ঘদিন আগে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে বিভাগের সভাপতির সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডা করেছিলো ফজলু। মাস খানেক আগে নিহত শিক্ষকের সঙ্গে 'ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের কারণে' কর্মচারী ফজলুর রহমানকে সমাজকল্যাণ বিভাগ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলি করে দেওয়া হয়। কিন্তু সমাজকল্যাণ বিভাগের যাত্রার শুরু থেকে কর্মচারী হিসেবে কাজ করে আসা ফজলু এই বদলির আদেশ কে মেনে নিতে পারেননি। এর জেরে ক্ষিপ্ত হয়ে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটতে পারে বলে ধারণা করছেন বিভাগের শিক্ষক - শিক্ষার্থী ও অন্যান্যরা৷
এ বিষয়ে সমাজকল্যাণ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার জানান, বিভাগীয় সভাপতির সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের কারণে এক দেড় মাস আগে বিভাগীয় কমিটির সিদ্ধান্তে তাকে সমাজকল্যাণ বিভাগ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলি করা হয়। শুধুমাত্র বদলির কারণে হত্যার মতো ঘটনা ঘটবে এটি আমরা ভাবতেও পারছি না।
অপর শিক্ষক সহকারী অধ্যাপক হাবিবুর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, প্রায় ৮ বছর আগে ফজলু এই ডিপার্টমেন্টে থোক বরাদ্দের অস্থায়ী ভিত্তিতে যোগদান করেন। তারপর থেকেই বিভিন্ন কারণে সবার সঙ্গেই মাঝেমধ্যে খারাপ আচরণ করতো। নোট ফেলে দিত, অকারণেই চিল্লাচিল্লি করত। এজন্য আমরা সবাই তাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলি করি। তবে ফজলু আমাদের কাছে এসে দীর্ঘদিনের কর্মজীবনের কথা বলে সমাজকল্যাণ বিভাগেই থাকতে চাইতো, তাকে বিভাগের রাখার জন্য আবদার করত। আমরা তাকে বলি, এত সুযোগ দেওয়ার পরেও তুমি যেহেতু এখনো তোমার আচার-আচরণ, কথাবার্তা সংযত করতে পারোনি সেহেতু তুমি ওই ডিপার্টমেন্টে থাকো। পরে বিচার বিবেচনা করে দেখা যাবে।
বিভাগের শিক্ষার্থী মাহমুদ জানান, ফজলুকে পলিটিক্যাল সায়েন্সে বদলি করা হয় আজ থেকে প্রায় ২ থেকে ১ মাস আগে। তবে উনি এটা মেনে নিতে পারছিলেন না। কারণ উনি প্রতিষ্ঠাকালীন কর্মচারী ছিলেন। এটা নিয়ে অনেক রেষারেষিও হচ্ছিল। তবে এরকম যে পর্যায়ে যাবে এটা আমরা ভাবতেও পারিনি।
‘‘ঘটনার সময় আমরা একটা প্রোগ্রাম নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। ডিপার্টমেন্টে হাবিব স্যার ছিলেন। তবে উনি ঘটনার ৩০ মিনিট আগে ডরমেটরিতে চলে যান। আমাদের ৫টায় প্রোগ্রাম শুরু হওয়ার কথা ছিল। এর মাঝে ডিপার্টমেন্টে কোনো কর্মচারী, কর্মকর্তা কেউ ছিলেন না। আমরা ছিলাম ঐ রুমে। এই সুযোগে উনি এই আত্মঘাতী ঘটনাটি ঘটালেন। ম্যামের রুম আগে থেকে লক করা ছিল না। কর্মচারী ঢুকে লক করে দেন।’’
ইবি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাসুদ রানা বলেন, ঘটনা জানতে পেরে আমরা দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে তাদেরকে উদ্ধার করে সদর হাসপাতালে পাঠাই। সেখানের কর্তব্যরত চিকিৎসক শিক্ষিকাকে মৃত ঘোষণা করেন। অপরজন অপারেশন থিয়েটারে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে পুলিশ কাজ শুরু করেছে। ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। এছাড়া আশপাশে থাকা সিসি ক্যামেরার ফুটেজও সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান বলেন, আমরা খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হই। এসময় শিক্ষক রুনাকে নিথর অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে প্রক্টরিয়াল বডি ও ইবি থানা পুলিশের উপস্থিতিতে রক্তাক্ত দুজনকে উদ্ধার করে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। কর্মচারী ছেলেটা স্থানীয় এবং সে নাকি খুব বদমেজাজি। নানা অভিযোগ থাকায় তাকে এই বিভাগ থেকে সরিয়ে অন্য বিভাগে দেওয়া হয়েছিল বলে শুনেছি।"
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা তার রুম পরিদর্শন করেছি। পুলিশ ও পিবিআই পর্যবেক্ষণ করেছে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করবো এবং এটার কারণ আমরা বের করার চেষ্টা করবো। সে দীর্ঘদিন যাবৎ বিভাগে চাকরি করতো। কেন এমনটা ঘটলো তা তদন্ত করা ছাড়া বা পারিপার্শ্বিক অবস্থা জানা ব্যতীত নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছেনা। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা জোরদার করেছি।
কুষ্টিয়া জেলা পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন বলেন, এহেন হত্যার ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক। আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। যারা উদ্ধার করেছে আমরা সকলের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি যে ঘটনাটি বিকেল ৪টার দিকের। ঘটনার সময় রুমের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। রুমের ভেতর থেকে চিৎকারের শব্দে তারা ওপরে যেয়ে দরজাটি ভেতর থেকে বন্ধ পান। তারা দরজাটি ভেঙেই ভেতরে প্রবেশ করেছেন এবং দুজনকেই ভেতরে পেয়েছেন। এতে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা যায় যে, ভেতরের দুজনের একজন ই অপরজনকে হত্যা করেছে। ঘটনাটি অধিকতর তদন্ত করলে বিস্তারিত জানা যাবে।