০১ মার্চ ২০২৬, ২২:৩৮

ক্লাস নিতে চাওয়ায় শিক্ষকের ক্লাস বর্জন ইবি শিক্ষার্থীদের

কমিউনিকেশন অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম বিভাগের শিক্ষার্থীরা  © টিডিসি সম্পাদিত

রুটিন অনুযায়ী ক্লাস নিতে চাওয়ায় শিক্ষকের প্রতি বিরাগভাজন হয়ে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে ক্লাস বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) কমিউনিকেশন অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম বিভাগের একটি ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। 

এ দাবিতে গত ২২ ফেব্রুয়ারি বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. রশিদুজ্জামানের কাছে ৩ দফা দাবিতে স্মারকলিপি দিয়েছে তারা। ক্লাস বর্জনকারী শিক্ষার্থীরা বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং উক্ত শিক্ষকের নাম সহকারী অধ্যাপক তন্ময় সাহা জয়। 

স্মারকলিপিতে জানানো দাবিগুলো হচ্ছে- তন্ময় সাহা জয় ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক চতুর্থ বর্ষের দ্বিতীয় সেমিস্টার থেকে স্নাতকোত্তরের ফলাফল প্রকাশ পর্যন্ত কোনো অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমে (ক্লাস, পরীক্ষা, মৌখিক পরীক্ষা, খাতা মূল্যায়ন, পুনর্মূল্যায়ন) অন্তর্ভুক্ত থাকবেন না; অ্যাকাডেমিক স্বার্থে আঘাত আসতে পারে এমন কোনো আশঙ্কা দেখা দিলে বিভাগ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং তার সভাপতিত্ব চলাকালে আমাদের ব্যাচের অ্যাকাডেমিক কোনো জটিলতা যেন সৃষ্টি না হয় সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ যথাযথ ভূমিকা পালন করবে। 

স্মারকলিপিতে তারা বলেন, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে তন্ময় সাহা জয় স্যারের ক্লাস করতে অনিচ্ছুক। ইতোমধ্যে আমরা এ বিষয়ে বিভাগীয় সভাপতির সাথে আলোচনা করেছি। আমাদের সাথে স্যারের কোনো ব্যক্তিগত সমস্যা কিংবা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নেই। স্যার আমাদের ক্লাস নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন, সেই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা তার ক্লাস বর্জন করেছি। পরবর্তী পরিস্থিতি বিবেচনায় আমরা আমাদের সিদ্ধান্তে স্থির আছি। এছাড়া স্যারের কোনো ক্ষতিসাধন কিংবা অনিষ্ট চিন্তায় আমাদের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি।

তবে উক্ত ব্যাচের কয়েকজন শিক্ষার্থী ও বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্বাচনের পরে এবং রোজার ছুটি শুরু হওয়ার আগের সপ্তাহে ১৪ ফেব্রুয়ারি ও ১৭ ফেব্রুয়ারি দুদিন ২০-২১ সেশনের রুটিন অনুযায়ী দুটি ক্লাস ছিলো। সে মোতাবেক শিক্ষক তন্ময় সাহা জয় সিআর কে ক্লাসের নোটিশ দেন। কিন্তু তারা ক্লাসে আসতে অস্বীকৃতি জানায় এবং সবাই বাড়ি চলে গেছে জানিয়ে শিক্ষককে ক্লাস না নিতে অনুরোধ করে। কিন্তু প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি দেয়নি বা ক্লাস বন্ধ থাকবে মর্মে কোন সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় তিনি ক্লাস নিবেন বলে জানান। তবে নির্ধারিত দিন ক্লাসে গিয়ে তিনি কাউকে পাননি। পরে তিনি ওই কোর্সের ক্লাস সমাপ্ত ঘোষণা করে নোটিশ টানিয়ে দেন এবং ভবিষ্যতে এই ব্যাচের আর কোন কোর্স তিনি নিতে চান না জানিয়ে বিভাগীয় সভাপতিকে লিখিতভাবে জানান।  

এ ব্যাপারে স্মারকলিপি জমাদানকারী ২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শাহানাজ মুন্নি বলেন, আমরা ক্লাসে যাব না সেটা আমাদের সবার সিদ্ধান্ত ছিলো, আমি একা কোন সিদ্ধান্ত নেই নাই। সবাই যেখানে আসতে পারবে না সেখানে আমি একা গিয়ে ক্লাস করবো কীভাবে, তাই আমি যাইনি। 
ক্লাস কর‍তে না এলেও রোজা থেকে স্মারকলিপি দিতে কেন চলে এলেন - এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, স্মারকলিপি দিতে আমি গিয়েছিলাম কারণ আমাদের কয়েকজনের বাসা কুষ্টিয়াতে, বাকিদের বাসা দূরে। আশপাশের এই কয়েকজন ১৪ তারিখে ক্লাস করতে কেন আসেননি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ৪/৫ জন নিয়ে ত ক্লাস করা যায় না। 

উক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে উঠে আসা নানান অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, আমাদের যা বক্তব্য তা স্মারকলিপিতেই বলা আছে। তবে বিভিন্ন নিউজের প্রথমদিকে যা বলেছে যে স্যার নাম্বার কম দেয় বা এটা ওটা করে - এগুলো আমরা বলি নাই, সব ফেক ভাবে দিয়েছে। দেখছি আমাদের ব্যক্তিগত অনেক কথাও সেসব নিউজে আছে, আমরা জানিও না নিউজ কীভাবে হয়েছে।   

এ-সময় শাহানাজ মুন্নি তাদের শিক্ষক যখন ক্লাস সমাপ্তের ঘোষণা দেন এবং বিভাগের সভাপতিকে লিখিত দেন, তখন ক্যাম্পাসের সাংবাদিকেরা কেন নিউজ করেনি আর এখন কেন করছে তা জানতে চেয়ে প্রতিবেদককে জেরা করতে থাকেন। 

স্মারকলিপি দিতে আসা অপর শিক্ষার্থী মাবিয়া বলেন, ব্যাচের সবাই যে সিদ্ধান্ত নেয় সেখানে আমি তো আলাদা কথা বলতে পারিনা। ক্লাস কর‍তে না আসার সিদ্ধান্ত আমাদের সবার। শিক্ষক ক্লাস নিবেন না এমন কোন নির্দেশনা তিনি দিয়েছিলেন কিনা জানতে চাইলে এমন কোন নির্দেশনা তাদের দেয়নি বলে জানান তিনি। নিজেরা নিজেরা সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্যাম্পাস খোলা থাকা সত্ত্বেও ক্লাস বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার শিক্ষার্থীদের আছে কিনা এমন প্রশ্নের কোন সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি। 

উক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের হুমকি দেওয়া, ইন্টার্নাল নাম্বার কম দেওয়া, ফলাফল নিয়ে ভয়ভীতি দেখানো সহ অন্যান্য কোন অভিযোগ রয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের যা বক্তব্য তা স্মারকলিপিতে লেখা আছে, আপনি সেটা পড়লে বুঝত পারবেন। এর বাইরে আমাদের ব্যাচের আর কোন বক্তব্য নেই। 

এ বিষয়ে সহকারী অধ্যাপক তন্ময় সাহা জয় বলেন, ক্লাস বন্ধের কোন সিদ্ধান্ত না থাকায় আমি ওদের ক্লাস নিতে চেয়েছিলাম কারণ একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ৩০শে মার্চ তাদের ক্লাস শেষ হবে আর ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ মার্চ পর্যন্ত ক্যাম্পাস বন্ধ থাকবে। তাদের সিলেবাস অনেকটা বাকি থাকায় ক্লাস নিতে চেয়েছিলাম, তাদের ক্লাস রিপ্রেজেনটেটিভকে জানিয়েও দিয়েছিলাম। কিন্তু ক্লাসে গিয়ে দেখি তারা একজনও আসেনি। যোগাযোগ করলে তারা সবাই মিলেই ক্লাস করবে না বলে ঠিক করেছে বলে জানায়। 

প্রশাসন, ডিন ও বিভাগীয় সভাপতির পক্ষ থেকে সেশনজট নিরসনে নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষা গ্রহণের নির্দেশনা থাকায় তিনি ছুটির আগে ক্লাস নিতে চেয়েছিলেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওদের ক্লাস নিব বলে আমি ভোটের পরদিন সকালেই চলে আসি। কিন্তু তারা কেউকেই আসেনি। তবে ওই ব্যাচ ব্যতীত বাকি চারটি ব্যাচের শিক্ষার্থীরা যথারীতি ক্লাস ও পরীক্ষা দিয়েছে।  তাই আমি তাদের ক্লাস সমাপ্ত ঘোষণা করে নোটিশ দিয়েছি। পাশাপাশি ভবিষ্যতেও তাদের আর কোন কোর্স পড়াবো না বলে বিভাগীয় সভাপতি বরাবর লিখিত দিয়েছিলাম। পরবর্তীতে তারা একটি স্মারকলিপি দিয়েছে বলে শুনেছি। ৩ মার্চ অ্যাকাডেমিক কমিটির সভায় বিষয়টা নিয়ে আলোচনা হবে। 

বিভাগীয় সভাপতি অধ্যাপক ড. রশিদুজ্জামান বলেন, শিক্ষার্থীদের একটি স্মারকলিপি পেয়েছি। এ বিষয়ে ৩ মার্চ আমাদের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের মিটিং অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। রমজানের ছুটির মধ্যে স্মারকলিপি দিতে আসলেও ক্যাম্পাস চলাকালীন রুটিন ক্লাসে তারা কেনো উপস্থিত হয়নি এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা আমাকে ক্লাস করতে চায়না বলে জানিয়েছিল, কিন্তু আমি তাদের বলেছিলাম এভাবে ক্লাস বন্ধ করার কোন এখতিয়ার বিভাগীয় সভাপতি হিসেবে আমার নেই। কোন শিক্ষক ক্লাস নিতে চাইলে আমি তাকে বিরত রাখতে পারি না। 

একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ৩০ মার্চের মধ্যে ক্লাস শেষ করার কথা জানিয়ে নতুন করে কোর্স বণ্টন ও সেশনজটের ব্যাপারে জানতে চাইলে বিভাগীয় সভাপতি বলেন, যেহেতু বিভাগে শিক্ষক সংকট রয়েছে, নতুন করে ক্লাস নিয়ে পরীক্ষা নিতে গেলে অবশ্যই কিছু সময় লাগবে এবং হ্যাঁ অবশ্যই এটা আমাদের বিভাগের উপর প্রভাব ফেলবে। তবে শিক্ষার্থীদের আবেদনের ব্যাপারটাও আমাকে দেখতে হবে। আমরা চাই বিষয়টি সুন্দরভাবে সমাধান হোক।