১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:০১

১০ বছর পর ছাত্রত্ব ফিরে পাওয়ার আবেদন খুবির দুই শিক্ষার্থীর

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়   © ফাইল ছবি

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে (খুবি) ১০ বছর আগে বহিষ্কৃত দুই শিক্ষার্থী সীমা আক্তার ও মাইশা ইসলাম ছাত্রত্ব ফিরে পাওয়ার জন্য রেজিস্ট্রার বরাবর আবেদন করেছেন। ইসলামী ছাত্রী সংস্থার সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগে ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি তারা বহিষ্কার হন। আরও তিন ছাত্রীও তাদের সঙ্গে একই শাস্তি পেয়েছিলেন।

সে সময় তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০১৫ সালের ১৪ নভেম্বর অপরাজিতা হলের নামাজের কক্ষ থেকে সাত জন শিক্ষার্থীকে ইসলামি ছাত্রী সংস্থার সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগে প্রাথমিকভাবে অভিযুক্ত করা হয়। অভিযোগ পত্রে উল্লেখ করা হয়, ওই দিন তিন জন বহিরাগতসহ মোট সাত জন শিক্ষার্থী অপরাজিতা হলের নামাজের কক্ষে গোপন মিটিং করছিল। 

এ অবস্থায় হলের কেয়ারটেকার রোজিনা খানম হল প্রভোস্ট কে অবহিত করেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিষয়টি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচলিত নিয়মের পরিপন্থী হওয়ায় বহিরাগত তিন জনকে পুলিশে দেওয়া হয় ও সাত জন শিক্ষার্থীকে হল প্রভোস্টেরে তত্ত্বাবধানে রাখা হয়। ছাত্রীদের কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হয় ছাত্রবিষয়ক পরিচালকের পক্ষ থেকে। 

কারণ দর্শানো নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে সীমা আক্তার জানান, ঘটনা সংঘটনের মুহূর্তে তিনি ডিসিপ্লিনের সেশনাল ট্যুরে কক্সবাজারে ছিলেন এবং মায়িশা ইসলাম বলেন, সে সময় তিনি নামাজ কক্ষে গিয়েছিলেন নামাজ আদায় করতে। উক্ত সংস্থার সাথে তিনি জড়িত নন এবং কোন মিটিংয়ে তিনি অংশগ্রহণ করেননি।

ঘটনার প্রায় ১০ মাস পর ২০১৬ সালের ৮ আগস্ট তৎকালীন ছাত্রবিষয়ক পরিচালক ও স্থাপত্য ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. অনির্বাণ মোস্তফাকে সভাপতি করে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটির অন্যন সদস্যরা ছিলেন বাংলা ডিসিপ্লিনের সহকারী অধ্যাপক ও সহকারী ছাত্রবিষয়ক পরিচালক, মো. দুলাল হোসেন এবং নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা ডিসিপ্লিনের সহকারী অধ্যাপক ও অপরাজিতা হলের সহকারী প্রভোস্ট ড. শিল্পী রায়। 

তদন্ত কমিটি তিন দিন অভিযুক্তদের লিখিত সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে। একই বছর ২৯ ডিসেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ৫ জন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমানিত হওয়ায় তাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হলো। বহিষ্কৃত অন্য শিক্ষার্থীরা হলেন- ব্যবসায় প্রশাসন ডিসিপ্লিনের ১২ ব্যাচের রওশনারা খাতুুন ও ১৫ ব্যাচের ফারজানা আক্তার এবং গণিত ডিসিপ্লিনের ১২ ব্যাচের সানজানা আক্তার বনি। 

তদন্ত প্রতিবেদনের সম্পৃক্ততার ধরনে উল্লেখ করা হয় সীমা আক্তার ওই দিন সভায় উপস্থিত না থাকলেও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রী সংস্থার সাথে যুক্ত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। মায়িশা ইসলাম সভায় উপস্থিত থাকলেও তিনি ইসলামী ছাত্রী সংস্থার সাথে সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেলেও প্রত্যক্ষদশী ও অভিযুক্তদের (রওশানারা খাতুন) ভাষ্যে ইসলামী ছাত্রী সংস্থার সাথে সম্পৃক্ততার প্রমান পাওয়া যায় বলে উল্লেখ করা হয়। 

এর আগে, ২০১৪ সালে মায়িশা ইসলামের কাছ থেকে জিহাদি বই সন্দেহে পাঁচটি বই বাজেয়াপ্ত করা হয়। বইগুলো হলো- সাইমুম সিরিজের ৫০,৫১,৫২ ও ৫৩ খন্ড। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের পরিবর্তনের পর গত বছরের ১ জানুয়ারি সীমা আক্তার ও মাইশা ইসলাম খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বরাবর তাদের বহিষ্কার আদেশ প্রত্যাহার, বিএসসি সনদপত্র উত্তোলনর ব্যবস্থা, ক্ষতিপূরণ ও জড়িত শিক্ষক, কর্মচারীদের বিচারের আওতায় আনার জন্য আবেদন করেন। 

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের আবেদন আমলে নিয়ে লাইফ সায়েন্স স্কুলের ডিন অধ্যাপক ড. গোলাম হোসেনকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। 

সীমা আক্তারের কাছে তদন্তের বিষয়ে জানতে চায়লে তিনি বলেন, ‘তদন্ত কমিটির স্যারেরা আমাকে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, তারা আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ খারিজ করে দেবেন, কিন্তু শর্ত দেন যে তাদের নির্দেশমতো একটি কাগজে স্বাক্ষর করতে হবে। নিরুপায় হয়ে আমি তাদের কথা বিশ্বাস করি এবং তাদের কথামতো লিখে দেই যে আমি একটি নির্দিষ্ট সংগঠনের সদস্য। কিন্তু শিক্ষকরা তাদের সেই অঙ্গীকার রক্ষা করেননি; উল্টো সেই কাগজটিকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আমাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করেছেন।’

আরও পড়ুন: ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির প্রথম উপাচার্য হলেন বুয়েট অধ্যাপক আবদুল হাছিব

তিনি বলেন, ‘আমার বাবা খুলনা শহরের একটি বেকারিতে সামান্য বেতনে শ্রমিকের কাজ করতেন অনেক কষ্টে আমাকে পড়িয়েছেন। ​আমি সব সময় ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী ও পর্দানশীল ছিলাম এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিপন্থী কোনো কাজের সাথে কখনোই জড়িত ছিলাম না। স্রেফ ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের সন্দেহ থেকে আমার কোনো অপরাধ না থাকা সত্ত্বেও আমার ওপর এই অমানবিক শাস্তি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এক বছরের বেশি হয়ে গেছে আমরা আবেদন করেছি কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন এখনও আমাদের কিছু জানায়নি। আমরা অন্তত আমাদের অনার্সের সার্টিফিকেটটি চাই।’

তৎকালীন তদন্ত কমিটির প্রধান ড. অনির্বান মুস্তফার সঙ্গে পূর্ববর্তী তদন্ত কমিটির কার্যক্রম ও সিদ্ধান্ত নিয়ে কথা বলতে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, এ বিষয়ে কথা বলতে তিনি আগ্রহী নন।

​বর্তমান তদন্ত কমিটির প্রধান অধ্যাপক ড. গোলাম হোসেন বলেন, ‘আমরা ভুক্তভোগী দুই শিক্ষার্থীকে পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ডেকেছিলাম। তারা আমাদের কাছে তাদের বক্তব্য ও তারা প্রমান উপস্থাপন করেছে। আশা করি. খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে এই তদন্ত প্রতিবেদনটি সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।’