৭ বছরের সাধনা, অসংখ্য নির্ঘুম রাত আর বুকভরা স্বপ্নের পর আমার প্রাপ্তি— ‘একটি নির্মম উপেক্ষা’
টানা তিন বিসিএসে ব্যর্থতার ৪৫তম বিসিএসে অডিট অ্যান্ড একাউন্টস ক্যাডারে (মেধাক্রম ১১) সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন সুমি আক্তার। তবে বুধবার (১৪ অক্টোবর) প্রকাশিত গেজেটে তার নাম আসেনি। তিনি ৪৬তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে ৬৭তম মেধাক্রমে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।
সুমি আক্তার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট সায়েন্স বিভাগে পড়াশোনা করেছেন। শিক্ষাজীবনে এসএসসি ও এইচএসসি—উভয় পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও তিনি মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। অনার্সে তার সিজিপিএ ছিল ৩.৮৮, আর মাস্টার্সে তিনি সিজিপিএ-৩.৯৯ অর্জন করেন।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরও কাঙ্ক্ষিত ক্যাডার পদে নিয়োগ না পাওয়ার কষ্ট তুলে ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দিয়েছেন তিনি।
দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের পাঠকদের জন্য সুমি আক্তারের দেওয়া ফেসবুক পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো:
গেজেট থেকে বাদ পড়েছে শুধু একটি নাম নয়, ভেঙে দেওয়া হয়েছে একটি পরিবারের সাত বছরের স্বপ্ন! ৪৫তম বিসিএসে অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও আজ আমি রাষ্ট্রের গেজেট থেকে বঞ্চিত। দীর্ঘ সাত বছরের সাধনা, অসংখ্য নির্ঘুম রাত, ব্যক্তিগত ত্যাগ আর বুকভরা স্বপ্নের পর রাষ্ট্রের কাছ থেকে আমার প্রাপ্তি—একটি নির্মম উপেক্ষা!
কিন্তু কেন? আমার অপরাধটা কী?
আমি কি কখনো এই রাষ্ট্রের ক্ষতি করেছি? আমি কি দেশের সেবা করার অযোগ্য? নাকি আমার সাত বছরের পরিশ্রম, মেধা, যোগ্যতা আর স্বপ্নের কোনো মূল্যই নেই এই রাষ্ট্রের কাছে?
একবারও কি ভেবে দেখেছেন, আমার বৃদ্ধ বাবা-মায়ের কথা? যে মা-বাবা নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সন্তানের সাফল্যের স্বপ্ন দেখেছেন, যে বাবা-মা বুকভরা আশা নিয়ে অপেক্ষা করেছেন তাঁদের সন্তানের প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দিনের জন্য—আজ তাঁদের চোখের জল আর ভাঙা স্বপ্নের দায় কে নেবে?
একজন সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীর নাম গেজেটে না থাকা হয়তো আপনাদের কাছে একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তমাত্র। কিন্তু আমার কাছে এটি সাত বছরের সাধনার অপমৃত্যু, আমার বাবা-মায়ের ত্যাগের অবমূল্যায়ন, আমার পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ এবং আমার নয় মাসের নিষ্পাপ শিশুটির ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা।
আমারও একটি পরিবার আছে। আমারও কিছু স্বপ্ন ছিল। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন ছিল, পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্ন ছিল, আর আমার ছোট্ট সন্তানটিকে সুন্দর একটি ভবিষ্যৎ উপহার দেওয়ার স্বপ্ন ছিল। রাষ্ট্রের সেবা করার মধ্য দিয়ে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দেওয়ার স্বপ্ন ছিল।
আজ নিজেকেই প্রশ্ন করি—আমি কি তবে এতটাই অযোগ্য? আমার সাত বছরের শ্রম কি এতটাই মূল্যহীন? আমার পরিবারের ত্যাগ কি এতটাই তুচ্ছ?
সবচেয়ে কষ্ট হয় এই ভেবে যে, আমি শুধু নিজের জন্য লড়িনি; লড়েছি আমার বাবা-মায়ের স্বপ্নের জন্য, পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য, আমার সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য। অথচ আজ তাদের সামনে দাঁড়িয়েও কোনো সান্ত্বনা দিতে পারছি না। একজন সন্তান হিসেবে, একজন পরিবারের সদস্য হিসেবে, একজন বাবা হিসেবে—এই অসহায়ত্ব আমাকে প্রতিনিয়ত ভেতর থেকে ক্ষতবিক্ষত করছে।
রাষ্ট্রের কাছে আমার প্রশ্ন—সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও যদি গেজেট থেকে বঞ্চিত হতে হয়, তবে একজন প্রার্থীর সাত বছরের পরিশ্রমের দায় কে নেবে? তাঁর পরিবারকে দেওয়া স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণার জবাব কে দেবে?
আমি করুণা চাই না। আমি চাই ন্যায়বিচার। আমি চাই আমার প্রতি নেওয়া সিদ্ধান্তের স্বচ্ছ ব্যাখ্যা। যদি কোনো অভিযোগ থাকে, তার ন্যায্য মূল্যায়ন হোক। আর যদি আমার প্রতি অন্যায় হয়ে থাকে, তবে সেই অন্যায়ের প্রতিকার হোক। আমি শুধু চাই, আমার মতো আর কোনো স্বপ্নবাজকে যেন এভাবে অসহায় হয়ে প্রশ্ন করতে না হয়—দেশের সেবা করতে চাওয়াটাই কি আমার অপরাধ?
আজ আমার হাতে কোনো উত্তর নেই। আছে শুধু বুকভরা কষ্ট, বাবা-মায়ের জন্য অপরাধবোধ, পরিবারের প্রতি অপার অসহায়ত্ব আর আমার ছোট্ট সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে বেঁচে থাকার দায়।
আমার চোখের জল হয়তো আপনাদের চোখে পড়বে না, আমার বাবা-মায়ের দীর্ঘশ্বাস হয়তো আপনাদের কানে পৌঁছাবে না। কিন্তু বিশ্বাস করি, ন্যায়বিচারের ঊর্ধ্বে কেউ নন।
মানুষের দরবারে আমার আকুতি রইল, আর চূড়ান্ত বিচার মহান আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিলাম। আল্লাহ যেন আমার বাবা-মায়ের চোখের জলের মর্যাদা দেন, আমার সন্তানের ভবিষ্যৎ রক্ষা করেন এবং আমাকে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়সংগতভাবে লড়াই করার শক্তি দেন।
আমি দয়া চাই না—আমি আমার ন্যায্য অধিকার চাই।