৪৯তম বিসিএসের ভেরিফিকেশনে বাদ সেই ছয়জনের প্রশ্ন—‘আমাদের অপরাধ কী?’
বিসিএসের মতো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নিয়োগের সুপারিশ পেয়েছিলেন তারা। স্বপ্ন ছিল সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করবেন, বদলাবে নিজের ও পরিবারের জীবন। কিন্তু পুলিশ ভেরিফিকেশন শেষে নিয়োগের গেজেটে নাম না আসায় সেই স্বপ্নে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে ৪৯তম বিসিএস (বিশেষ) পরীক্ষায় সুপারিশপ্রাপ্ত ছয় প্রার্থীর। প্রথম দফায় বাদ পড়া ৪৬ জনের মধ্যে ৪০ জনকে দ্বিতীয় দফায় নিয়োগ দিয়ে গেজেট প্রকাশ করা হলেও বাকি ছয়জনের নাম সেখানে আসেনি। কেন বাদ পড়েছেন, সেই প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তরও তারা পাননি বলে অভিযোগ করেছেন।
বাদ পড়া এই ছয়জনের মধ্যে ৩ জনের সঙ্গে কথা হয়েছে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের প্রতিবেদকের। তাদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ইমরুল হাসান ইমন, অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী শরিফুল ইসলাম এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী নিরঞ্জন রায়। তাদের ভাষ্য, কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ না জানিয়ে নিয়োগ থেকে বাদ দেওয়ায় তারা ও তাদের পরিবার চরম হতাশার মধ্যে পড়েছেন। কেউ জানতে চান, তার অপরাধ কী? ভুল তথ্যের ভিত্তিতে যাচাই হয়েছে কি না, তা পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন তারা। অভিযোগ থাকলেও তা স্পষ্ট করে জানানো এবং কোনো সমস্যা না থাকলে দ্রুত গেজেটে নাম অন্তর্ভুক্ত করার দাবিও তাদের।
এ বিষয়ে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে ইমরুল হাসান ইমন বলেন, ‘প্রথম বিষয় হচ্ছে বিসিএসের মতো পরীক্ষায় তো সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়া খুবই কঠিন। আমাদের ৪৯তম বিসিএস এ ৩ লাখের বেশি প্রার্থী পরীক্ষা দিয়েছিল। সেখান থেকে মাত্র ৬৬৮ জনকে চূড়ান্তভাবে মনোনীত করা হয়েছিল। এত কঠিন একটা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে আসার পর যখন কোনো ধরনের কারণ না দেখিয়ে, কোনো ধরনের ব্যাখ্যা না দিয়ে এভাবে বাদ দেয়া হচ্ছে—সেটা আমাদের জন্য কষ্টকর। শুধু আমি একক কোনো ব্যক্তি তো না, এটার সঙ্গে তো আমার পরিবার আছে, আমার বাবা-মা আছে, তারাও তো একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি আমার অবস্থান থেকে শুধু এটা বলতে চাই যে, আসলে কোন কারণে বাদ দেয়া হলো? একটা ভ্যালিড গ্রাউন্ড তো লাগবে, যে কারণে বাদ দেয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে কাউকেই বাদ দেয়া হবে না, ৪৬ জনের সবাইকেই দিয়ে দেয়া হবে। কিন্তু তাহলে আমাদের ৬ জনকে কেন বাদ দেয়া হলো? মানে আমাদের অপরাধটা কি সেটা তো আমরা আসলে জানি না। আমরা এটার কারণটা জানতে চাই।’
বাদ পড়া আরেক প্রার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী শরিফুল ইসলাম। তিনি জানান, একসময় ছাত্রলীগের একটি হল শাখায় পদে থাকলেও সেটি তাকে জোর করে দেওয়া হয়েছিল বলে তার দাবি। পরে তিনি সংগঠন থেকে পদত্যাগ করেন। জুলাইয়ের আন্দোলন-সংগ্রামেও সম্মুখসারিতে ছিলেন বলে জানান তিনি।
শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘প্রথমবার যখন আমাকে বাদ দেওয়া হলো, তখন কারণটি আমার সম্পূর্ণ অজানা ছিল। আমি জানি আমি ছাত্রলীগের একটি হলের পদে ছিলাম। যেটা আমাকে জোর করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২৪ সালের ১৫ জুন সে সংগঠন থেকে পদত্যাগ করেছিলাম। জুলাইয়ের আন্দোলন-সংগ্রামে সম্মুখসারির একজন যোদ্ধা ছিলাম এবং এগুলোর সব প্রমাণও রয়েছে।’
দ্বিতীয় দফায় নিয়োগের প্রজ্ঞাপন প্রকাশের আগে আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন শরিফুল ও তার পরিবার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে বাদ পড়া প্রার্থীদের অন্তর্ভুক্তির আশ্বাস পাওয়ার পর তার ধারণা হয়েছিল, এবার হয়তো নিয়োগ পাবেন। তবে দ্বিতীয় দফার গেজেটেও নিজের নাম না দেখে হতাশ হন তিনি।
শরিফুল বলেন, ‘আমাদের নিয়োগ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন বললেন দ্বিতীয় ধাপে সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, তখন আমি এবং আমার পরিবার অনেক আশাবাদী ছিলাম। আমাদের আশা ছিল, আমি অবশ্যই সুযোগ পেয়ে যাচ্ছি। আমি মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম, কারণ আমার নামে কোনো মামলা বা অন্য কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু দেখা গেল, দ্বিতীয়বারও ৬ জনকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং সেই ৬ জনের মধ্যে আমিও ছিলাম। সেক্ষেত্রে আমি, আমার পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন এবং গ্রামবাসী সবাই অত্যন্ত মর্মাহত ও আশাহত হয়েছেন। ঠিক কোন কারণে যে আমাকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট কারণ আমি জানি না।’
সরকারের কাছে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করে তিনি বলেন, ‘আমরা জুলাই মাসে সরকার পতন আন্দোলন করেছিলাম মেধার ভিত্তিতে সবার চাকরি পাওয়া এবং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু সেই আন্দোলন করার পরও একের পর এক ভেরিফিকেশনের জন্য এভাবে বাদ পড়তে হলো, তখন আমার ও আমার পরিবারের মানসিক অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে পড়েছে। তা সত্ত্বেও আমি আশা রাখি, সরকার আমাদের ওপর সুবিচার ও ন্যায়বিচার করবেন। আমাদের যদি কোনো ঝামেলা বা সমস্যা থেকে থাকে, সেটাও যেন স্পষ্ট করে বলা হয়। আর যদি আমার বা আমার পরিবারের কোনো সমস্যা না থাকে, তবে যেন দ্রুত গ্যাজেট প্রকাশ করে আমাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়।’
একই পরিস্থিতিতে পড়েছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী নিরঞ্জন রায়। তিনি জানান, এসএসসি পরীক্ষার সময় মাকে হারানোর পর নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। কঠিন পরিস্থিতি পেরিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পান। পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবনের নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও পড়াশোনায় মনোযোগী ছিলেন বলে জানান তিনি।
নিরঞ্জন রায়ের দাবি, তিনি কখনো ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলাও নেই। অথচ কেন তাকে নিয়োগের গেজেট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে নির্দিষ্ট কোনো কারণ জানানো হয়নি।
তিনি বলেন, ‘কেন আমাদের বাদ দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নির্দিষ্ট করে কোনো কারণ বলেনি বা আমাদের সাথে কথা বলেনি। আমি জীবনে কখনো ছাত্রলীগ করিনি। কিন্তু আমাকে যদি ভুল ট্যাগ দেওয়া হয়, তাহলে কেমনে? ভুল ভেরিফিকেশন বা অনুমাননির্ভর তথ্যের ভিত্তিতে আমার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ থাকতে পারে। কিন্তু সেটা তো আমার জানতে হবে।’
নিজের পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয় এবং অতীতের চাকরির অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন নিরঞ্জন। তিনি বলেন, ‘আমি কোনো সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলাম না এবং আমার নামে কোনো ফৌজদারি মামলা নেই। আমার পরিবার বিএনপির সমর্থক। তৎকালীন হাসিনা সরকারের আমলে বিএনপি পরিবারের সন্তান হওয়ার কারণে আমি তিনবার সাব-ইনস্পেক্টরের ভাইভা দিয়ে ভেরিফিকেশন থেকে বাদ পড়েছিলাম। গ্রামের ঠিকানায় যখন পুলিশ ভেরিফিকেশন আসে, বিএনপি করার কারণে আর সুপারিশপ্রাপ্ত হই না। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসেও অজানা কোনো ভুল তথ্যের কারণে আমাকে বাদ পড়তে হলো।’
বিসিএসে যোগ দেওয়ার আশায় অন্য একটি সরকারি চাকরিতে যোগ দেননি বলেও জানান তিনি। নিরঞ্জন বলেন, তার আরও একটি সরকারি চাকরি হয়েছিল। বিসিএসে যোগ দেওয়ার প্রত্যাশায় সেখানে যোগ দেননি। এ ছাড়া কয়েকটি চাকরির মৌখিক পরীক্ষাতেও অংশ নেননি।
এ অবস্থায় সরকার ও পিএসসির কাছে নিজের বাদ পড়ার কারণ যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন নিরঞ্জন রায়। তিনি বলেন, ‘যে কারণেই বাদ দেওয়া হোক না কেন, কোনো তদন্ত ও প্রমাণনির্ভর তথ্যের ভিত্তিতে সেটি পুনরায় যাচাই করা হোক। আমাদের ন্যায্য অধিকার আমাদের ফিরিয়ে দেওয়া হোক এবং অতি দ্রুত গ্যাজেটে আমাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হোক।’
প্রার্থীরা বলছেন, কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তা জানানো হোক। আর ভুল তথ্য বা অনুমাননির্ভর যাচাইয়ের কারণে বাদ পড়ে থাকলে তা পুনর্বিবেচনা করা হোক। তাদের দাবি, নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে বিষয়টি যাচাই করে দ্রুত সিদ্ধান্ত জানাতে হবে।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) ৪৯তম বিসিএস বিশেষ পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলে ৬৬৮ জনকে শিক্ষা ক্যাডারে নিয়োগের জন্য সাময়িকভাবে সুপারিশ করেছিল। ৬৮৩টি শূন্য পদের বিপরীতে এ সুপারিশ করা হয়। পরে গত ৩০ সেপ্টেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত গেজেটে ৬১১ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে সুপারিশপ্রাপ্ত ৫৭ জনের নাম না থাকায় প্রশ্ন ওঠে নিয়োগপ্রক্রিয়ার যাচাই-বাছাই নিয়ে।
বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে গত ১ অক্টোবর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, যাচাই-বাছাই ও পুলিশ ভেরিফিকেশন সাপেক্ষে বাদ পড়া প্রার্থীদের বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি বলেছিলেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে নিয়োগ থেকে বঞ্চিত করা হবে না। পরে ৫ অক্টোবর রাতে আরও ৪০ জনকে নিয়োগ দিয়ে দ্বিতীয় দফায় প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ফলে প্রথম দফায় বাদ পড়া ৪৬ জনের মধ্যে ৪০ জনের নাম গেজেটে অন্তর্ভুক্ত হলেও বাকি ছয়জন নিয়োগবঞ্চিতই থাকেন।