০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৬

বয়স-অভিজ্ঞতায় তরুণ, পিএসসির নতুন চেয়ারম্যান কে এই ঢাবি অধ্যাপক?

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নাজমুজ্জামান ভূঁইয়া  © টিডিসি সম্পাদিত

বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নাজমুজ্জামান ভূঁইয়া (ইমন)। আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার, গণমাধ্যম আইন ও দুর্যোগ আইনসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার একাডেমিক কাজ রয়েছে। যদিও নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগ বা বিভাগ সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ পদে কখনও দায়িত্ব পালন করেননি তিনি। 

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে নাজমুজ্জামান ভূঁইয়াকে পিএসসির চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এতে স্বাক্ষর করেন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. গোলাম রব্বানী।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৩৮ (১) অনুচ্ছেদে দেওয়া ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি জনস্বার্থে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নাজমুজ্জামান ভূঁইয়াকে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের সভাপতি পদে নিয়োগ দিয়েছেন। সংবিধানের ১৩৯(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দায়িত্ব গ্রহণের তারিখ থেকে পাঁচ বছর অথবা তার বয়স ৬৫ বছর পূর্ণ হওয়া—এর মধ্যে যেটি আগে ঘটবে, সেই সময় পর্যন্ত তিনি পিএসসির চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালন করবেন।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এআইইউবি-তে ২০০২ সালে নাজমুজ্জামান ভূঁইয়ার শিক্ষকজীবন শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন ২০০৩ সালের ২৯ অক্টোবরে। শিক্ষকতার পাশাপাশি তার একাডেমিক ও পেশাগত জীবনে বিভিন্ন দায়িত্ব যুক্ত হয়েছে। ২০০৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১১ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত লন্ডনে কমনওয়েলথ স্কলারশিপ কমিশন অব দ্য ইউনাইটেড কিংডমের আঞ্চলিক সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

জানা যায়, নাজমুজ্জামান ভূঁইয়ার শিক্ষকতা জীবনের শুরু আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশে (এআইইউবি)। ২০০২ সালের ১৪ জানুয়ারি থেকে ২০০৩ সালের ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি সেখানে শিক্ষকতা করেন। এরপর ২০০৩ সালের ২৯ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তার একাডেমিক ও পেশাগত জীবনে বিভিন্ন দায়িত্ব যুক্ত হয়েছে। ২০০৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১১ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত লন্ডনে কমনওয়েলথ স্কলারশিপ কমিশন অব দ্য ইউনাইটেড কিংডমের আঞ্চলিক সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

অধ্যাপক নাজমুজ্জামান ভূঁইয়া বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মুট কোর্ট সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা মডারেটর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ, বাংলাদেশের (আইউবি)-এর স্কুল অব ল-এর ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। 

যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ থেকে পিএইচডি করেছেন নাজমুজ্জামান ভূঁইয়া। ব্রিটিশ কমনওয়েলথ স্কলারশিপের আওতায় তিনি এই ডিগ্রি অর্জন করেন। তার পিএইচডির বিষয় ছিল মিডিয়া আইন। আন্তর্জাতিক আইন নিয়েও তার কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। নাজমুজ্জামান ভূঁইয়া এশিয়ান সোসাইটি অব ইন্টারন্যাশনাল ল-এর নির্বাহী পরিষদের সদস্য। একই সংগঠনের বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

তার গবেষণার প্রধান ক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন, গণমাধ্যম আইন, দুর্যোগ আইন এবং এশিয়া ও আফ্রিকার আইনব্যবস্থা। এসব বিষয়ে তার একাধিক বই ও গবেষণাপত্র রয়েছে। বিভিন্ন স্বনামধন্য জার্নালেও তার গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। গণমাধ্যম আইন নিয়েও কাজ করেছেন তিনি।

আরও পড়ুন: পিএসসির নতুন চেয়ারম্যান ঢাবি অধ্যাপক নাজমুজ্জামান ইমন

তবে পিএসসির চেয়ারম্যান হিসেবে তার নিয়োগের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তাদের কয়েকজনের দাবি, নাজমুজ্জামান ভূঁইয়া সাদা দলের সদস্য। কিন্তু বিগত সরকারের সময়ে তাকে কোনো আন্দোলন-সংগ্রামে দেখা যায়নি। এমনকি জুলাই আন্দোলনের ফ্রন্টলাইনেও তাকে দেখা যায়নি বলে তারা দাবি করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দলের নেতৃত্বস্থানীয় এক শিক্ষক ও স্বনামধন্য একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আমরা এই শিক্ষককে চিনি না। কখনো কোনো দায়িত্ব পালন করতে দেখিনি। কোথা থেকে হঠাৎ করে এনে বসিয়ে দিয়েছে। যারা আন্দোলন-সংগ্রামে সম্মুখসারিতে ছিল, তাদের মূল্যায়ন করা হয়নি। কিছু ব্যক্তি নিজেদের স্বার্থে নিয়োগের সুপারিশ করেছেন।’

শুধু শিক্ষকদের মধ্যেই নয়, শিক্ষার্থীদের মধ্যেও তাকে নিয়ে চলছে। পিএসসির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের কয়েকটি শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের অনেকেই নাজমুজ্জামান ভূঁইয়াকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না। কেউ কেউ জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তারা তার কোনো ক্লাসও করেননি। বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ কোনো দায়িত্ব পালন করতেও তাকে দেখেননি তারা।

আইন বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেও একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। তারা জানান, নাজমুজ্জামান ভূঁইয়ার সঙ্গে তাদের তেমন পরিচয় নেই। তাকে কখনো ক্লাসে পাননি। বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ কোনো দায়িত্ব পালন করতেও দেখেননি। এছাড়াও পিএসসির বিগত ৩ চেয়ারম্যানের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেম, মো. সোহরাব হোসাইন এবং ড. মোহাম্মদ সাদিক এদের কারো বয়সই ৬৫ বছরের নিচে ছিল না। সেই তুলনায় অধ্যাপক নাজমুজ্জামান তুলনামূলক তরুণ। একই তথ্য জানিয়েছেন বিভাগের কয়েকজন শিক্ষকও। 

২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের কয়েকজন শিক্ষার্থীও একই কথা জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তারা কখনো নাজমুজ্জামান ভূঁইয়ার ক্লাস করেননি। বিভাগের প্রোফাইল থেকে তার সম্পর্কে কিছু তথ্য জানতে পেরেছেন। তবে ব্যক্তিগতভাবে তাকে খুব একটা চেনেন না।

২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের কয়েকজন শিক্ষার্থীও জানিয়েছেন, নাজমুজ্জামান ভূঁইয়ার সঙ্গে বিভাগে তাদের কখনো দেখা হয়নি। তার একাডেমিক কার্যক্রম সম্পর্কেও তাদের তেমন কোনো ধারণা নেই।

নাজমুজ্জামান ভূঁইয়া একজন ভালো শিক্ষক। পড়াশোনাতেও চমৎকার ছিলেন। বয়স ও অভিজ্ঞতার দিক থেকে হয়তো জুনিয়র। তবে একাডেমিক প্রোফাইল ভালো। ছাত্র হিসেবেও অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। নাজমুজ্জামান ভূঁইয়া দীর্ঘদিন ধরে বিভাগে নেই। এ কারণে শিক্ষার্থীরা তাকে না-ও চিনতে পারেন। এছাড়া তিনি বেশ কিছুদিন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। তবে তিনি যথেষ্ট অভিজ্ঞ একজন ব্যক্তি।—ড. নকীব মোহাম্মদ নাসরুল্লাহ, অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাবি

তবে শিক্ষার্থীদের এই পরিচিতির ঘাটতির কারণ হিসেবে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন তার সহকর্মীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য সাবেক উপাচার্য ড. নকীব মোহাম্মদ নাসরুল্লাহ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, নাজমুজ্জামান ভূঁইয়া অত্যন্ত ভালো একজন শিক্ষক। পড়াশোনাতেও তিনি চমৎকার ছিলেন। বয়স ও অভিজ্ঞতার দিক থেকে হয়তো তিনি জুনিয়র। তবে তার একাডেমিক প্রোফাইল অত্যন্ত ভালো। ছাত্র হিসেবেও তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন।

শিক্ষার্থীরা তাকে কেন চেনেন না— এ বিষয়ে অধ্যাপক নকীব মোহাম্মদ নাসরুল্লাহ বলেন, নাজমুজ্জামান ভূঁইয়া দীর্ঘদিন ধরে বিভাগে নেই। এ কারণে শিক্ষার্থীরা তাকে না-ও চিনতে পারেন। এছাড়া তিনি বেশ কিছুদিন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। তবে তিনি যথেষ্ট অভিজ্ঞ একজন ব্যক্তি। তিনি বলেন, আমরা যারা সব-সময় আন্দোলন সংগ্রামে ছিলাম। তিনি হয়তো সেইভাবে আন্দোলনে ছিলেন না। তাই হয়তো সাদা দলের শিক্ষকদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া থাকতে পারে। তবে বিভিন্ন সময়ে সাদা দলের কার্যক্রমে আমরা তাকে দেখেছি। 

এর আগে অধ্যাপক মোবাশের মোনেম পিএসসির চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ২০২৪ সালের অক্টোবরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তাকে পিএসসির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তৎকালীন পিএসসি চেয়ারম্যান মো. সোহরাব হোসাইনসহ ১২ জন সদস্য পদত্যাগ করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মোবাশের মোনেমকে পিএসসির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার।