জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন পেছনে ফেলে আমিন খান এখন পুলিশ ক্যাডার
ক্রিকেট ছিল প্রথম প্রেম, বিসিএস হলো নতুন গন্তব্য; জাতীয় দলের জার্সি গায়ে না জড়াতে পারার আক্ষেপকে শক্তিতে রূপ দিয়ে ৪৭তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থী মো. আমিন খান। সংগ্রাম, শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব আর আত্মবিশ্বাসের গল্পে উঠে এসেছে তার সাফল্যের পথচলা।
একসময় যার সকাল শুরু হতো ক্রিকেট মাঠে, আর দিন শেষ হতো পরের দিনের খেলার পরিকল্পনায়। ব্যাট-বলই ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। বয়সভিত্তিক ক্রিকেট, ঢাকা লিগ, বিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট প্রতিটি ধাপেই নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন। স্বপ্ন ছিল একদিন লাল-সবুজের জার্সি গায়ে জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামবেন। কিন্তু জীবন সব সময় পরিকল্পনা মেনে চলে না। ইনজুরি, প্রতিযোগিতা আর সময়ের বাস্তবতা তাকে বুঝিয়ে দেয়, নতুন করে নিজের গন্তব্য ঠিক করতে হবে।
সেই নতুন গন্তব্যই তাকে নিয়ে এসেছে দেশের অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মঞ্চে। অবশেষে ৪৭তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে শুরু করতে যাচ্ছেন জীবনের নতুন অধ্যায়। তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থী মো. আমিন খান।
দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন তার শৈশব, ক্রিকেট ক্যারিয়ার, বিশ্ববিদ্যালয় জীবন, ব্যর্থতা, ঘুরে দাঁড়ানো, বিসিএস প্রস্তুতি এবং তরুণদের জন্য নিজের উপলব্ধির কথা।
নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকেই স্বপ্নের শুরু
আমিন খানের বেড়ে ওঠা খুলনায়। বাবা ছিলেন একজন সরকারি চাকরিজীবী। সীমিত আয়ের সংসারে বিলাসিতার সুযোগ না থাকলেও ছিল সততা, শৃঙ্খলা এবং মূল্যবোধের শিক্ষা। ছোটবেলা থেকেই পরিবারের সংগ্রাম খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। সেই সংগ্রামই তাকে বাস্তববাদী হতে শিখিয়েছে।
আমিন বলেন, ‘আমরা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার। ছোটবেলা থেকেই দেখেছি সীমিত আয়ের মধ্যে কীভাবে পরিবার চলে। কিন্তু আমার বাবা-মা কখনো আমাদের মূল্যবোধের জায়গায় আপস করতে শেখাননি। তাদের কাছ থেকেই সততা, দায়িত্ববোধ আর মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা শেখা।
তিনি জিলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং সরকারি এমএম সিটি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করেন। এরপর ভর্তি হন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ডিসিপ্লিনে।
ক্রিকেটই ছিল প্রথম পরিচয়
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগেই ক্রিকেট অঙ্গনে পরিচিত মুখ ছিলেন আমিন। প্রায় এক যুগ প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট খেলেছেন। বয়সভিত্তিক পর্যায় থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্লাব ক্রিকেটেও ছিলেন নিয়মিত। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরও ক্রিকেটই ছিল তার সবচেয়ে বড় পরিচয়।
তিনি জানান, জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন নিয়েই দীর্ঘদিন এগিয়েছেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারেন, সব স্বপ্ন বাস্তব হয় না। সেই অপূর্ণতাকে তিনি দুর্বলতা নয়, বরং শক্তিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছেন। জাতীয় দলে খেলতে না পারার আক্ষেপ আজও আছে। তবে আমি নিজেকে বলেছি, যদি এখানে সফল না হই, তাহলে অন্য জায়গায় এমন কিছু করতে হবে, যাতে নিজেকে নিয়ে গর্ব করতে পারি। সেই চিন্তা থেকেই বিসিএসের দিকে মনোযোগ দেওয়া।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তার ক্রিকেট সাফল্যও কম নয়। আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় 'ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট' নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি নেতৃত্ব দিয়েছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট দলকে। মাঠে তার নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন শিক্ষক ও সতীর্থরা।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার গল্প
উচ্চমাধ্যমিকের পর ভর্তি যুদ্ধের সময়ও ক্রিকেট ছিল তার প্রধান ব্যস্ততা। ফলে প্রথমবার কাঙ্ক্ষিত জায়গায় সুযোগ হয়নি। তবে হাল ছাড়েননি। দ্বিতীয়বার প্রস্তুতি নিয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে শুরুতে পড়াশোনার চেয়ে ক্রিকেট আর ক্যাম্পাস জীবনই তাকে বেশি টানত। দিনের বড় একটা সময় কাটত মাঠে, অনুশীলনে কিংবা সিনিয়রদের সঙ্গে আড্ডায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিকে প্রায়ই ঢাকায় ক্রিকেট খেলতে যেতে হতো। ফলে ক্লাসে উপস্থিতি হতেন খুবই কম, পরীক্ষার আগে নোট সংগ্রহ করে প্রস্তুতি নিতে হতো।
হাসতে হাসতে আমিন বলেন, "অনেক কোর্সে ইনকোর্স নম্বর ছিল পাঁচ-ছয়। উপস্থিতি প্রায় থাকত না বললেই চলে। তবে শিক্ষক আর সহপাঠীরা অনেক সহযোগিতা করেছেন।"
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিনের স্মৃতিও তার কাছে এখনও জীবন্ত। সিনিয়রদের সামনে পরিচয় দিতে গিয়ে নার্ভাস হয়ে পড়েছিলেন। তখন 'ইন্ট্রো' কী, সেটাও ভালোভাবে জানতেন না। পরে সেই সিনিয়রদের সঙ্গেই গড়ে ওঠে আন্তরিক সম্পর্ক। তার মতে, শুরুতে যে ভয় ছিল, সময়ের সঙ্গে সেটিই পরিণত হয় পারিবারিক বন্ধনে।
ক্রিকেট থেকে বিসিএস: বদলে যাওয়ার গল্প
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুটা ছিল একেবারেই অন্যরকম। ক্লাসরুমের চেয়ে ক্রিকেট মাঠেই বেশি সময় কাটত তার। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরও পেশাদার ক্রিকেটের ব্যস্ততা কমেনি। ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে খেলতে নিয়মিত যেতে হতো। কখনো টুর্নামেন্ট, কখনো অনুশীলন সব মিলিয়ে বছরের বড় একটি সময় ক্যাম্পাসের বাইরে কাটত।
এই ব্যস্ততার সরাসরি প্রভাব পড়ে একাডেমিক জীবনেও। নিয়মিত ক্লাস করা সম্ভব হতো না, ইনকোর্স পরীক্ষায় নম্বরও আশানুরূপ থাকত না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ফলাফল নিয়ে আজও তার কিছুটা আক্ষেপ রয়েছে।
আমিন বলেন, “আমার উপস্থিতি খুবই কম ছিল। অনেক কোর্সে ইনকোর্স নম্বর পাঁচ, ছয় বা আট নিয়েই পরীক্ষা দিতে হয়েছে। আমি অন্তত সিজিপিএ ৩.০০ রাখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সেটা হয়নি। এটা আমার একটা আফসোস।”
তবে এই আফসোসকে তিনি ব্যর্থতা হিসেবে দেখেন না। বরং তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয় তাকে শুধু একটি ডিগ্রি দেয়নি; দিয়েছে মানুষ চেনার অভিজ্ঞতা, নেতৃত্বের শিক্ষা এবং সংকট সামাল দেওয়ার মানসিকতা।
মাঠের নেতৃত্বই গড়ে দিয়েছে মানুষটিকে
ক্রিকেট শুধু একটি খেলা ছিল না, ছিল তার নেতৃত্ব শেখার সবচেয়ে বড় বিদ্যালয়। মাঠে অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি বুঝেছেন, একজন ভালো নেতা কখনো শুধু নির্দেশ দেন না; বরং মানুষকে বিশ্বাস করাতে শেখেন।
আমিনের ভাষায়, “আমি সব সময় লিডারের চেয়ে লিডারশিপকে বেশি গুরুত্ব দিই। লিডারশিপ মানে কাউকে জোর করে কাজ করানো নয়। বরং এমনভাবে বোঝানো, যাতে সে নিজেই কাজটা করতে আগ্রহী হয়। মানুষকে মোটিভেট করতে পারাটাই আসল নেতৃত্ব।”
এই দর্শন তিনি শুধু ক্রিকেটে নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও অনুসরণ করেন। তার বিশ্বাস, সম্পর্ক, সংগঠন কিংবা কর্মক্ষেত্র সব জায়গাতেই নেতৃত্বের মূল ভিত্তি হলো আস্থা ও সম্মান।
ক্যাম্পাসের স্মৃতিতে সিনিয়রদের প্রভাব
বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম আসার অভিজ্ঞতা এখনও তার কাছে স্মরণীয়। নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ সবকিছুই ছিল অচেনা। বিশেষ করে সিনিয়রদের সামনে দাঁড়াতে ভয় লাগত।
তিনি বলেন, “প্রথম দিকে সিনিয়রদের সঙ্গে কথা বলতে গেলেই কলিজা কেঁপে উঠত। একদিন আমাকে ক্যাফেটেরিয়ায় নিয়ে গিয়ে ইন্ট্রো দিতে বলা হলো। তখন তো আমি জানিই না ইন্ট্রো কী! খুব ভয় পেয়েছিলাম।”
তবে সময়ের সঙ্গে সেই ভয় কেটে যায়। যাদের সামনে প্রথম দিন অস্বস্তি ছিল, পরে তারাই হয়ে ওঠেন সবচেয়ে আপন মানুষ। ক্যাম্পাসজীবনের সবচেয়ে মূল্যবান অর্জন হিসেবে তিনি এই সম্পর্কগুলোকেই মনে করেন।
ক্রিকেট ছেড়ে নতুন স্বপ্ন
দীর্ঘদিন ক্রিকেট খেলার পর জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল তাকে। জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন তখনও বেঁচে ছিল। কিন্তু বাস্তবতা ধীরে ধীরে অন্য কথা বলছিল।
তিনি উপলব্ধি করেন, একজন ক্রীড়াবিদের ক্যারিয়ার সব সময় দীর্ঘ হয় না। তাই বিকল্প একটি লক্ষ্য ঠিক করা প্রয়োজন। তখনই বিসিএসকে নিজের নতুন স্বপ্ন হিসেবে বেছে নেন।
আমিন বলেন, “জাতীয় দলে খেলতে না পারার কষ্ট আমি কখনো অস্বীকার করি না। কিন্তু আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, এই আক্ষেপকে সারাজীবনের হতাশা বানাব না। বরং এটাকেই শক্তি বানাব। আমি নিজেকে বলেছিলাম, ক্রিকেটে না পারলে অন্য কোনো জায়গায় অবশ্যই সফল হতে হবে।”
এই মানসিক পরিবর্তনই তার জীবনের সবচেয়ে বড় মোড় ঘুরিয়ে দেয়। মাঠের অনুশীলনের জায়গা দখল করে নেয় বই, নোট আর দীর্ঘ সময়ের পড়াশোনা। একটি স্বপ্নের সমাপ্তিই আরেকটি স্বপ্নের সূচনা হয়ে দাঁড়ায়।
বিসিএসের পথে: একটি ব্যর্থতা, তারপর প্রত্যাবর্তন
ক্রিকেট থেকে ধীরে ধীরে সরে এসে যখন বিসিএস প্রস্তুতিতে মনোযোগ দেন, তখনও সামনে পথটা খুব সহজ ছিল না। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার দীর্ঘ যাত্রায় যেমন পরিশ্রম ছিল, তেমনি ছিল অনিশ্চয়তা। লিখিত পরীক্ষা, ভাইভা প্রতিটি ধাপ পেরিয়েও শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে কি না, সেই দুশ্চিন্তা সব সময়ই কাজ করত।
আমিন খান বলেন, বিসিএস এমন একটি পরীক্ষা যেখানে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কেউ নিশ্চিত হতে পারেন না। লিখিত পরীক্ষা কিংবা ভাইভা ভালো হলেও চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগে আত্মবিশ্বাসের পাশাপাশি অনিশ্চয়তাও থাকে।
তিনি জানান, ৪৬তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা নিয়ে তিনি আশাবাদী ছিলেন। নিজের প্রত্যাশা অনুযায়ী উত্তর দিতে পেরেছিলেন। এমনকি যে গণিতকে তিনি নিজের দুর্বল জায়গা মনে করতেন, সেখানেও ভালো করেছেন। ভাইভাও তার কাছে মোটামুটি সন্তোষজনক মনে হয়েছিল। তাই ফলাফল নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই আশাবাদী ছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।
ফল প্রকাশের দিন প্রত্যাশিত কোনো ক্যাডারে নিজের নাম খুঁজে না পেয়ে কিছু সময়ের জন্য হতাশ হয়ে পড়েন। সেই মুহূর্তের অনুভূতি স্মরণ করে তিনি বলেন, “আমি অন্তত কোনো না কোনো ক্যাডারে সুপারিশ পাব এমন একটা বিশ্বাস ছিল। কিন্তু যখন দেখলাম নাম নেই, তখন কিছুক্ষণ যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না।”
ফলাফল দেখার পর তিনি একা মোটরসাইকেল নিয়ে শহরের রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন। নিজের সঙ্গে নিজেই কথা বলেছেন, ভাবছিলেন কোথায় ভুল হলো। তবে সেই হতাশা খুব বেশি দিন তাকে আটকে রাখতে পারেনি।
“আমি সব সময় একটা জিনিস বিশ্বাস করি যে, একটা ব্যর্থতা কখনো জীবনের শেষ হতে পারে না। যদি একটা দরজা বন্ধ হয়, তবে আরেকটা দরজা খুলে যাবেই। তাই আমি আবার নতুন করে শুরু করেছি।”
শৃঙ্খলাকেই বানিয়েছেন সবচেয়ে বড় শক্তি
বিসিএস প্রস্তুতির পুরো সময়জুড়ে তিনি একটি বিষয় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন শৃঙ্খলাবোধ। তার বিশ্বাস, বড় কোনো লক্ষ্য অর্জন করতে চাইলে আগে নিজের জীবনকে নিয়মের মধ্যে আনতে হয়।
আমিন বলেন, “আমার কাছে রুটিন্ড লাইফ লিড করা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো ঘুমাতে, সময়মতো উঠতে এবং পুরো দিনটা পরিকল্পনা করে চলতে আমার বেশ ভালো লাগে।”
তিনি জানান, বিসিএসের ভাইভা বোর্ডেও এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। বোর্ড জানতে চেয়েছিল, পুলিশ ক্যাডারের মতো একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ পেশার জন্য তিনি নিজেকে কতটা প্রস্তুত মনে করেন।
জবাবে তিনি বলেন, “আমি বোর্ডকে বলেছিলাম, আমি রুটিন্ড লাইফ লিড করি। এই অভ্যাসই আমাকে নিয়ম মেনে চলতে শিখিয়েছে। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ডিসিপ্লিন এখান থেকেই এসেছে।”
তার মতে, শৃঙ্খলা শুধু পরীক্ষায় সফল হওয়ার জন্য নয়; একজন ভালো মানুষ এবং ভালো কর্মকর্তা হওয়ার জন্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কেন প্রথম পছন্দ পুলিশ ক্যাডার?
অনেকেই বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারকে প্রথম পছন্দ হিসেবে রাখেন। কিন্তু আমিন খানের প্রথম পছন্দ ছিল পুলিশ ক্যাডার। এর পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, মানুষের সঙ্গে সরাসরি কাজ করার সুযোগ, নেতৃত্ব দেওয়ার পরিবেশ এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানে মাঠপর্যায়ে ভূমিকা রাখার সুযোগ তাকে এই ক্যাডারের প্রতি আকৃষ্ট করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবন, ক্রিকেট মাঠ এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম সব জায়গায় নেতৃত্ব দেওয়ার যে অভিজ্ঞতা তিনি অর্জন করেছেন, সেটিকে ভবিষ্যতের পেশাগত জীবনেও কাজে লাগাতে চান। তার ভাষায়, “আমি সব সময় মানুষকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করি। দায়িত্ব নিতে ভালো লাগে। তাই পুলিশ ক্যাডারকে নিজের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মানানসই মনে হয়েছে।”
জীবনদর্শন: পদ নয়, মানুষ হয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন
আমিন খানের কথায় বারবার ফিরে আসে একটি বিষয় সফলতা শুধু একটি চাকরি বা পদবির নাম নয়। তার কাছে সফলতার অর্থ হলো একজন ভালো মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা এবং যেখানেই দায়িত্ব পালন করবেন, সেখানে মানুষের জন্য ইতিবাচক কিছু করে যাওয়া।
তিনি বলেন, “আমি কখনো শুধু একটা চাকরির জন্য প্রস্তুতি নিইনি। আমি নিজেকে এমনভাবে তৈরি করতে চেয়েছি, যাতে যেকোনো দায়িত্ব সৎভাবে পালন করতে পারি। চাকরি মানুষকে পরিচয় দেয়, কিন্তু চরিত্র মানুষকে সম্মান এনে দেয়।”
পরিবার থেকে পাওয়া সততা, শৃঙ্খলা এবং নৈতিক শিক্ষাকেই তিনি নিজের সবচেয়ে বড় পুঁজি বলে মনে করেন। তাঁর বিশ্বাস, জীবনের যেকোনো অর্জনের পেছনে মেধার পাশাপাশি মূল্যবোধেরও সমান গুরুত্ব রয়েছে।
নেতৃত্ব মানে আদেশ নয়, আস্থা তৈরি
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ক্রিকেট দলের অধিনায়কত্ব করতে গিয়ে নেতৃত্ব সম্পর্কে আলাদা একটি উপলব্ধি তৈরি হয়েছে তাঁর। তিনি মনে করেন, একজন নেতা কখনো ক্ষমতার জোরে দল পরিচালনা করেন না; বরং বিশ্বাস, সম্মান এবং অনুপ্রেরণার মাধ্যমে মানুষকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যান।
আমিন বলেন, “আমি সব সময় বলি, লিডারের চেয়ে লিডারশিপ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কাউকে আদেশ করে কাজ করানো সহজ, কিন্তু কাউকে বোঝানো যে এই কাজটা তার নিজের জন্যও ভালো এটাই প্রকৃত নেতৃত্ব।”
তাঁর মতে, একজন নেতার সবচেয়ে বড় গুণ হলো মানুষের কথা শোনা এবং তাদের সামর্থ্যের ওপর বিশ্বাস রাখা। এই দর্শন তিনি ভবিষ্যতের কর্মজীবনেও অনুসরণ করতে চান।
তরুণদের প্রতি বার্তা
বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই অল্প বয়সেই ব্যর্থতায় ভেঙে পড়েন। তবে আমিন খান মনে করেন, জীবনের প্রতিটি ব্যর্থতা নতুন কিছু শেখার সুযোগ তৈরি করে। তিনি বলেন, “নিজেকে কখনো অন্যের সঙ্গে তুলনা করবে না। প্রত্যেক মানুষের সময় আলাদা, যাত্রাপথও আলাদা। তুমি যদি আজ ব্যর্থ হও, তার মানে এই নয় যে আগামীকালও ব্যর্থ হবে।”
তার পরামর্শ, কোনো লক্ষ্য ঠিক করলে সেটির জন্য নিয়মিত পরিশ্রম করতে হবে। শর্টকাটে সফল হওয়ার চিন্তা না করে ধৈর্য ধরে নিজের প্রস্তুতি চালিয়ে যেতে হবে। তিনি আরও বলেন, “সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যের সাফল্য দেখে হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। নিজের উন্নতির সঙ্গে নিজেরই প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত। প্রতিদিন যদি আগের দিনের চেয়ে একটু ভালো হওয়া যায়, সেটাই সবচেয়ে বড় অর্জন।”
একটি অপূর্ণ স্বপ্ন, একটি নতুন পরিচয়
জাতীয় দলের জার্সি গায়ে না জড়াতে পারার আক্ষেপ হয়তো আমিন খানের মনে সব সময়ই থাকবে। তবে সেই অপূর্ণতাকে তিনি কখনো নিজের দুর্বলতা হতে দেননি। বরং একটি স্বপ্ন পূরণ না হওয়ার বেদনা থেকেই জন্ম নিয়েছে আরেকটি স্বপ্ন।
ক্রিকেট মাঠে যে শৃঙ্খলা, অধ্যবসায় এবং নেতৃত্বের শিক্ষা তিনি পেয়েছেন, সেটিকেই কাজে লাগিয়েছেন বিসিএসের দীর্ঘ প্রস্তুতির পথে। আর সেই পথের শেষেই এসেছে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য ৪৭তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশ।
একজন ক্রিকেটারের অসমাপ্ত স্বপ্ন থেকে একজন ভবিষ্যৎ পুলিশ কর্মকর্তার যাত্রা তাই শুধু পেশা বদলের গল্প নয়; এটি নিজের ওপর বিশ্বাস রাখা, ব্যর্থতাকে শক্তিতে রূপ দেওয়া এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও লক্ষ্য বদলে নতুনভাবে এগিয়ে যাওয়ার এক অনুপ্রেরণার গল্প।